Cart Total Items (0)

Cart

All Sports India

মুনাল চট্টোপাধ্যয়:‌ ‘‌সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল।’‌ ধন্যি মেয়ে সিনেমায় মান্না দের গলায় গাওয়া গান আজও অমর হয়ে রয়েছে। প্রতিটি ফুটবল প্রেমী মানুষের মনে দোলা দেয় এই গান। ক্রিকেটের রমরমার মাঝে বাঙালির মন থেকে ফুটবলের প্রতি অগাধ প্রেমকে উপড়ে ফেলা যায়নি। কারণ বাঙালির মনপ্রাণ জুড়ে আছে দুই ক্লাব মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল। শুধু বাংলা বা ভারতে নয়, বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে আছে লাল হলুদ আর সবুজ মেরুনের অগনিত ভক্ত। শতবর্ষ পেরিয়েও দুই ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে দু’‌দলের খেলা ঘিরে উৎসাহ বা উন্মাদনায় কখনও ভাটা পড়েনি। আগামী দিনেও পড়বে না।

আর দু’‌দল যখন মর্যাদার লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়, তখন সেটা অন্য এক মাত্রার রূপ পায়। বাঙাল ও ঘটি হিসেবে গোটা বিশ্বে বেশি পরিচিত সদস্য-‌সমর্থকদের কাছে তখন সেটা শুধু একটা ম্যাচ থাকে না, যেন হাল্লা চলছে যুদ্ধে এমন একটা ভাব দেখা যায় সকলের মধ্যে। বাঙালির বারোমাসে তেরো পার্বনের সঙ্গে জুড়ে গেছে ডার্বি উৎসবের রেষারেষি। ইলিশ-‌চিংড়ির মহারণে শামিল হন আবাল-‌বৃদ্ধ-‌বনিতা। আর এখন সোসাল মিডিয়ার যুগে জেন জি-‌রা তো আরও এগিয়ে। মেগা ডার্বির দিন মাঠে তাদের দলকে প্রেরণা জোগানোর আয়োজন তো তাক লাগায়। ডার্বিতে কেউ জেতে, কেউ হারে। প্রিয় দলের প্রতীক ও জার্সির রংয়ে রাঙিয়ে নেওয়া মুখগুলো কখনও আরও রঙিন হয় দলের সাফল্যে, আবার ব্যর্থতায় সেই মুখের রং গলে গড়িয়ে পড়ে চিবুক দিয়ে অশ্রুভরা জলে।

কত গ্রীষ্ণ, বর্ষা, শীত, বসন্ত পার করেছেন ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের জার্সি গায়ে দেওয়া ফুটবলাররা। বাংলার মাটি থেকে এঁদের অনেকের যেমন উত্থান, তেমন ভিন রাজ্য থেকে এসেও বাংলার হৃদয়ের মনিকোঠায় স্থান করে নিয়েছেন বহু ফুটবলার। ভাষা, পরিধান, খাদ্য কোনটাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি তাঁদের কাছে মোহনবাগান বা ইস্টবেঙ্গলের জার্সিতে স্থানীয় ফুটবলারদের সঙ্গে মাঠে নেমে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে লড়তে। বরং অনেকেই হয়ে উঠেছিলেন বাংলার ঘরের ছেলে ভিন রাজ্যের হয়েও। শুধু কী তাই, অনেক বিদেশি ফুটবলারের গায়ে মোহনবাগানের বা ইস্টবেঙ্গলের ঘরের ছেলে ট্যাগ লেগে গেছে সারাজীবনের জন্য।

সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল যদি হয়, তাহলে সব উৎসবের সেরা বাঙালির দুর্গা পুজো। বঙ্গজীবনের অঙ্গ জুড়ে রয়েছেন মা দুর্গা। বছরের এই চারটে দিন বাঙালি মেতে ওঠে নির্মল আনন্দে। ক্ষনিকের জন্য হলেও সব দুঃখ, কষ্ট, ভুলে। গোটা বাংলা এমনকি ভিন রাজ্য ও বিদেশের মাটিতে থাকা বাঙালিরা দেবী দুর্গার আরাধনায় সঁপে দিয়েছেন। গোটা কলকাতা, দক্ষিণ থেকে উত্তর, পূর্ব থেকে পশ্চিম সেজেছে বিভিন্ন রূপে। ভাসছে আলোর জোয়ারে। দুর্গা প্রতিমার কত যে মৃ্ন্ময়ী রূপ। সঙ্গে চোখ ধাঁধানো মন্ডপ সজ্জা।

তার মাঝে নজর কেড়েছে এক অন্য ধাঁচের মন্ডপ সজ্জা, দুর্গার মনভোলানো মাতৃরূপের সঙ্গে। দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া স্টেশন সংলগ্ন অঞ্চল পেরিয়ে যাদবগড় আশুতোষ কলোনীতে একটি ছোট খেলার মাঠ আছে। যেটা শ্রীমার মাঠ বলেই স্থানীয় মানুষ জনের কাছে পরিচিত। ওই মাঠের অদূরেই আছে অসীম মেমোরিয়াল মাঠ। যাদবপুর থানা দিয়ে গাঙ্গুলিপুকুরের মোড় দিয়ে ভেতর দিকে আধা কিলোমিটার ভেতরে গেলেও দেখা মিলবে এই মাঠের। শ্রীমার মাঠ ও অসীম মেমোরিয়াল মাঠের মাটি গায়ে মেখে কত যে ফুটবলার ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের জার্সি গায়ে চাপিয়েছে, তা হাতে গুনে শেষ করা যাবে না। শ্রীমার মাঠের পুজো উদ্যোক্তারা প্রতিবছরই কোনও না কোনও বিশেষ থিমের মন্ডপ গড়েন, সাবেকি প্রতিমার সাজসজ্জা বজায় রেখে।

এবার তাঁদের থিম মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের মেলবন্ধন। আর সেই থিম অনুসরণ করেই তাঁরা সাজিয়েছেন মন্ডপকে। কেন এমন থিম?‌ শ্রীমার মাঠ পুজো উদ্যোক্তা কমিটির প্রধান-‌সভাপতি দেবাশিস ঘোষ, যিনি আপাদমস্তক কলকাতা ময়দানের মানুষ, একসময় আইএফএর সঙ্গেও ওতপ্রেত জড়িয়ে ছিলেন, তিনি জানালেন, ‘‌বাঙালির মাছ ভাত , দুর্গা পুজোর মতোই ফুটবল আর ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, সকলের রক্তে ও মজ্জায় মজে আছে। যতই যে খেলাধুলো নিয়ে মাতামাতি হোক না কেন, মোহনবাগান-‌ইস্টবেঙ্গলের লড়াইয়ের আবেগ কোনওদিনও কমেনি, আগামী দিনেও কমবে না। দুর্গা পুজোর থিমে সেটা তুলে ধরেছি আমরা। এই অভিনব থিমের ভাবনা ও মন্ডপ সজ্জার কারীগর প্রদীপ দে।’‌

মন্ডপের সজ্জায় স্থান পেয়েছে একদিকে লাল হলুদ রং, অন্যদিকে সবুজ মেরুন। মাথার ওপর জ্বলজ্বল করছে বিরাট এক ফুটবলের প্রতীক। আর মন্ডপের বাঁদিকে ইস্টবেঙ্গলের প্রাণপুরুষ জ্যোতিষ চন্দ্র গুহর প্রতিকৃতি। তাঁর নীচে ইস্টবেঙ্গলের প্রতিষ্ঠার মূল কারণ, ইতিহাস ও বানী। ডানদিকে আছে মোহনবাগানের গ্ল্যামার পার্সন বলে জনপ্রিয় ধীরেন দের ছবি। সঙ্গে মোহনবাগান সম্পর্কে তাঁর অবদান, অনুভূতির কথা। আর বাঁদিকে যেখানে মন্ডপের তোরণের পাশে লাগানো রয়েছে প্রবাদপ্রতিম ফুটবলার-‌কোচ পিকে ব্যানার্জির ছবি, সেখানে ডানদিকে আছেন ইস্ট-‌মোহনের লড়াইয়ের রসদ জোগানো আর এক কিংবদন্তী ফুটবলার-‌কোচ অমল দত্ত। একদা কলকাতার মেগা ডার্বিতে এঁদের বাক যুদ্ধ আজও মিথ হয়ে আছে।

মন্ডপের ভেতরে দিকের দেওয়ালেও দুটো ভাগে ভাগ করা আছে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলে। সেই দেওয়াল জুড়ে একশবছর ধরে দুই প্রধানে খেলে যাওয়া ফুটবলার, ট্রফি জয় থেকে শুরু করে নানা স্মরণীয় মুহূর্তের ছবি। বর্তমান প্রজন্ম জানে না, চেনে না এমন অনেক ফুটলারের প্রতিকৃতি। আর দুই দেওয়ালের মাঝে ঠিক ওপরে রয়েছে একটি ছবি। যা জানান দেয় সৌভাতৃত্বের। রেষারেষির শেষে ফুটবলের মিলনমেলায় বন্ধুত্বের আলিঙ্গনে। লাল হলুদ ও সবুজ মেরুন দুই ফুটবলারদের পরস্পরের বুকে জড়িয়ে ধরার এক অবিস্মরণীয় মানবিক মুহূর্ত।

সত্যি এমন একটা থিমের উপস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা না করে উপায় নেই।

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Captcha loading...