উরুগুয়ে ৬( নুনেস-পেনাল্টি, আরাউজো-২, জালাজার, সানাব্রিয়া, আগুইরে ) ভারত ১(অনিরুদ্ধ)
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: বেঙ্গালুরুর কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে পানামার সঙ্গে ১-১ ড্র করার পর ভারতীয় ফুটবল দলকে ঘিরে এদেশের ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটা উচ্চাকাঙ্খার জন্ম দিয়েছিল। যুবভারতীর মাঠে দ্বিতীয় ফিফা ফ্রেন্ডলিতে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৬ নম্বরে থাকা কার্লেস আনসেলোত্তি ও ভিনিসিয়াসের ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ০-৪ গোলে হারটা ভারতকে ততটা অসম্মানের জায়গায় ফেলেনি, যতটা পড়তে হল ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ২০ নম্বরে থাকা উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ১-৬ গোলে হেরে। ৮২তে নেহরু কাপে এই কলকাতার মাঠে উরুগুয়ের কাছে ভারত হেরেছিল ১-৩ গোলে। ২০০১য়ে কোচির মাঠে মিলেনিয়াম কাপে ভারত হেরেছিল ০-৩ গোলে উরুগুয়ের কাছে। আর এবার লজ্জা আরও বাড়লো ১-৬ গোলের হারে।
উরুগুয়ে দুরমুশ করে ভারতকে হারিয়ে বোঝালো কেন তারা ভারতর থেকে ১১৮ ধাপ এগিয়ে। বলতে গেলে এককথায় দিয়োগো ফোরলানোর কোচিংয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা উরুগুয়ে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনলো ভারতকে। বুঝিয়ে দিল বিশ্ব ফুটবলে ভারত এখনও নাবালক। অনিরুদ্ধ থাপার করা একটি গোলে সামযিক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা ছাড়া খুশি থাকার মতো কিছু করতে পারেননি ভারতীয় ফুটবলাররা ম্যাচের বাকি সময়। ভারতীয় দলের চিফ কোচ খালিদ জামিল অবশ্য তিনটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচ মিলিয়ে ১১ গোল হজমের পর আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন, তাঁর ফুটবলাররা ২ গোল দিয়েছে বলে। কিন্তু এতে ভারতীয় ফুটবল তার আগের জায়গা থেকে একচুলও এগিয়েছে বলে মনে করছি না। ভারতীয় ফুটবল যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থাকল।
উরুগুয়ে দলের শুরুর একাদশে কোচ দিয়েগো ফোরলান রেখেছিলেন ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের দলে থাকা মিডফিল্ডার এমিলিয়ানো, জালাজার, বেনটাকুর, আরাউজো, ও ফরোয়ার্ড নুনেস, ভিনাসি। উরুগুয়ে ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের একটা ম্যাচও জেতেনি মার্সেলো বিয়েলসার কোচিংয়ে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ২০ নম্বরে থাকা উরুগুয়ের দলের সময়টা ভাল যাচ্ছে না। শেষ ৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের মধ্যে একটিতে মাত্র জয় পেয়েছে তারা। তাও সেটা কলকাতায় খেলতে আসার আগে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে ৪-১ গোলে। তাই উরুগুয়ে কোচ ফোরলান নতুন করে দলটা গোছানোয় মন দিয়েছেন। তাঁর উদ্দেশ্য উরুগুয়ের হৃত সম্মান ফিরিয়ে আনা। সেই লক্ষ্যেই ভারতের বিরুদ্ধে জয়ের জোস নিয়ে ফুটবলারদের ঝাঁপাতে বলেছিলেন। তার সুফলও পেলেন।
অথচ শুরুতে ভারতের খেলা দেখে মনে হয়নি ভারত ৬ গোল হজম করবে। বরং প্রথম ১০ মিনিটে ভারতের খেলায় একটা চনমনে ভাব ছিল। ভারতীয় দলের প্রথম কর্নারে ভেসে আসা বলে ৬ মিনিটের মাথায় বক্সের মাথা থেকে নেওয়া আনোয়ারের শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় ক্রশপিসের সামান্য ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ায়। ৯ মিনিটে এডমুন্ড গোলের সহজ সুযোগ উরুগুয়ে গোলকিপার কার্ডোজোর হাতে না মারলে ভারত তখনই এগিয়ে যেত।
কিন্তু পরের মিনিটে নিজেদের ভুলে গোল খেয়ে যায় ভারত। ১০ মিনিটে বক্সের মাঝে নুনেস বল পেয়ে বক্সে ঢুকে পড়ে শট নিতে গেলে তাঁকে ট্রিপ করে ফেলে দেন ভারতীয় ডিফেন্ডার প্রমবীর। রেফারি পেনাল্টি দিতে দ্বিধা করেননি। এটাই অনভিজ্ঞতা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই ধরনের ভুল ভারতীয় ফুটবলারদের নতুন নয়। এর আগেও এই ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে। নুনেস পেনাল্টি থেকে গোল করে উরুগুয়েকে এগিয়ে দেন। ১৬ মিনিটে পিছন থেকে মুভ তুলে এনে, দেওয়া নেওয়া করে খেলে নুনেসের পা ঘুরে আসা বল পেয়ে আরাউজো বক্সের মাথা থেকে গড়ানো শট নিলে, তা গোলকিপার গুরপ্রীতের বাড়ানো হাতের নাগাল এড়িয়ে ডানদিকের পোস্টের নীচে লেগে বেরিয়ে যায়।
২৩ মিনিটে রায়ানের শট উরুগুয়ে গোলকিপার কারডোজো আংশিক প্রতিহত করলে অনিরুদ্ধ থাপা ফিরতি বলে শট নিয়ে গোল করে ভারতের পক্ষে সমতা ফেরান(১-১)। ২৫ মিনিটের মাথায় ভারত এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এডমুন্ডের দখলে থাকা বল বক্সের মাঝে উরুগুয়ের ডিফেন্ডার ট্যাকল করলে, তা ছিটকে পিছনে চলে যায় অভিষেক সিংয়ের পায়ে। অভিষেক গড়ানো শট নিলে তা তৎপরতার সঙ্গে ধরে ফেলেন উরুগুয়ে গোলকিপার।
ভারতীয় ফুটবলাররা যখন উরুগুয়েকে চেপে ধরেছিলেন, তখনই প্রকৃতি বাদ সাধে ভারতের সেই আধিপত্যে। ২৭ মিনিটের মাথায় খেলা থামিয়ে দেন ম্যাচ কমিশনার। রেফারিকে নির্দেশ দেন মাঠ থেকে ফুটবলারদের নিয়ে বেরিয়ে আসার জন্য। যুবভারতীর আকাশে প্রবল বজ্রপাত হওয়ার কারণে। সঙ্গে বৃষ্টি। তবে মূলত বাজ পড়ার কারণেই মাঠে উপস্থিত ফুটবলার, কোচ সহ সকল মানুষকে মাঠ ছেড়ে ভেতরে চলে যেতে বলেন। বৃষ্টি ও বাজের হাত থেকে বাঁচতে দর্শকরাও গ্যালারির ভেতর দিকে চলে যান।
৩৫ মিনিট বন্ধ থাকার পর খেলা শুরু হয়। এক মিনিটের মধ্যে অর্থাৎ ২৮ মিনিটে গোল হজম করে ভারত। খেলা বন্ধ হওয়ার কারণে মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটা অস্বাভাবিক নয়। উরুগুয়ের ফুটবলারদের সঙ্গে পেশাদারি মনোভাবের এখানেই তফাৎ ভারতীয় ফুটবলারদের। উরুগুয়ের ফুটবলাররা মাঠে ঢুকে বলতে গেলে গা না ঘামিয়েই দ্বিতীয় গোল তুলে নিলেন ভারতীয় ডিফেন্ডাররা নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার আগেই। ডানপ্রান্তে বল ধরে দ্রুত গতি বাড়িয়ে বক্সের ধারে পৌঁছে নানদেজ মাইনাস রাখলে ডানপায়ের গড়ানো শটে গুরপ্রীতকে হার মানান আরাউজো। সেসময় তাঁকে বাধা দেওয়ার জন্য ভারতীয় কোনও ডিফেন্ডার জায়গায় ছিলেন না।
৩৭ মিনিটে পিছন থেকে আসা থ্রু যখন ভারতের মাঝমাঠে পান নুনেস, তখন সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। অসহায়ভাবে বক্সে দাঁড়িয়ে গোলকিপার গুরপ্রীত। নুনেস বক্সে ঢুকে শট নিলে তা গুরপ্রীতের মাথায় লেগে ফিরলে তৃতীয় গোল খাওয়ার হাত থেকে বাঁচে ভারত।
বিরতিতে খেলার ফল ছিল ২-১। দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে কোচ ফোরলান যখন দুটি বদল আনেন দলে, তখন এডমুন্ডকে তুলে সাহাল ও স্টপারে প্রমবীরের জায়গায় বিজয় ভার্গিসকে নামান ভারতীয় দলের কোচ খালিদ জামিল। নতুন ফুটবলারের সংযোজনে ভারতের খেলায় আরও জোস আসবে মনে হলেও, তা ঘটেনি। বরং দলের ছন্দটা নষ্ট হয়ে যায়। তার পুরো সদ্ব্যবহার করলেন উরুগুয়ের ফুটবলাররা।
৫৩ মিনিটে নুনেস মাথা দিয়ে নামিয়ে দিলে শট নিয়ে জালাজার গোল করে উরুগুয়েকে ৩-১য়ের লিড দেন। এরপর থেকে ভারতীয় দলকে রীতিমতো দিশেহারা লেগেছে। মাঝমাঠ ও রক্ষণের মাঝে কোনও বোঝাপড়াই আর নজরে আসেনি। ভারতীয় দলের এই ছন্নছাড়া খেলার সুযোগে ৫৯ মিনিটে ৪ নম্বর গোল চাপিয়ে দেয় উরুগুয়ে। নুনেসের বাড়ানো পাস ধরে জোরালো শটে গুরপ্রীতকে হার মানান আরাউজো। এটা তাঁর ম্যাচে দ্বিতীয় গোল।
৭০ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা ভারতের সানানের গোলার মতো শট উরুগুয়ে গোলকিপার ফিস্ট করে উড়িয়ে দেন। পরের মুহূর্তে পাল্টা আক্রমণ তুলে এনে পরিবর্ত হিসেবে নামা ফাকুন্দোর মাইনাস ভারতীয় ডিফেন্ডারের গায়ে ছিটকে বেরুলে তা গোলে পাঠান আর এক বদলি খেলোয়াড় সানাব্রিয়া। বল গুরপ্রীতের মাথার ওপর দিয়ে উঁচু হয়ে গোলে ঢোকে(৫-১)। ফাকুন্দো ও সানাব্রিয়া দু’জনেই গত বিশ্বকাপের স্কোয়াডে ছিলেন। বোঝালেন কেন তাঁরা বিশ্বকাপার।
ভারতের কোচ খালিদ জামিল গোলকিপার গুরপ্রীতকে আর গোল না খাওয়ার লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে তাঁকে তুলে নামান আলবিনো গোমসকে। ভাগ্যিস তুলে নিয়েছিলেন, নইলে গুরপ্রীতকে ৬ গোল খাওয়ার লজ্জা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হত। ৬ নম্বর গোল হজমটা করলেন আলবিনো ৮৭ মিনিটে। আগুইরে বক্সের মাথায় বল পেয়ে ঠান্ডা মাথায় বাঁ পায়ের মাখন কাটা ছুরির মতো শটে জালের ভেতর কাঁপিয়ে দিয়ে ৬-১ গোলের জয়ে ভারতের ওপর রোলার চালানো শেষ করলেন।
পানামার সঙ্গে ১-১ ড্র করার পর ভারতীয় ফুটবলকে ঘিরে যেটুকু আশার সঞ্চার হয়েছিল, ব্রাজিলের কাছে ৪ গোলে হারের পর উরুগুয়ের কাছে ১-৬ গোলের হারে তা নিমেষে উধাও। ব্রাজিল ম্যাচে হারের পর কোচ খালিদ জামিলের অকপট স্বাকীরোক্তি ছিল, তিনি নিজেকে ১০য়ের মধ্যে শূণ্য দিচ্ছেন। উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ১-৬ গোলে হারের পর বলতে হয় গোটা ভারতীয় দলটাই শূণ্য পেয়ে ডাহা ফেল করেছে।
ভারত: গুরপ্রীত(আলবিনো), অভিষেক(ভালপুইয়া), আনোয়ার, প্রমবীর(বিজয়), আকাশ, মনবীর(রহিম) আপুইয়া, অনিরুদ্ধ, আশিক(সানান), রায়ান, এডমুন্ড(সাহাল)।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
