ছবি: ফিফা ২০২৬ ওয়ার্ল্ড কাপ মিডিয়া
আর্জেন্টিনা ৩(মেসি-৩) আলজিরিয়া ০
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: মেসি, মেসি আর মেসি। গোটাটাই মেসিময় আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে কানসাস সিটির মাঠে আর্জেন্টনার ৩-০ গোলের আধিপত্যের জয়। ফুটবলের রাজপুত্র মেসি ম্যানিয়ায় মজে গেল গোটা দুনিয়া আরও একবার। দোহার লুসেইল স্টেডিয়ামে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল জেতার দিনে যেখানে শেষ করেছিলেন, সেখানে থেকেই যেন আবার যেন শুরু মেসির ম্যাজিকের আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে কানসাসের মাঠে। মেসির শ্রেষ্ঠত্ব অনেক আগেই প্রশ্নাতীত ও প্রমাণিত। আলজিরিয়া ম্যাচে তাঁর হ্যাটট্রিক যেন কোনও এক শিল্পীর তুলির টানে কানসাসের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা মন কাড়া মোনালিসার ছবি। ভাগ্যিস, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে অবসর নিয়ে ফেলেননি মেসি। নিলে মেসির এই মনোরম হ্যাটট্রিক দেখার সুযোগ তো হত না। একটা সময় পর্যন্ত মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলা নিয়ে ধোঁয়াশা রেখে গিয়েছিলেন। বারবার বলেছিলেন, শরীর ও মন কেমন থাকে বুঝে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন আমেরিকার মাটিতে খেলার। বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি কিন্তু ভেতরে ভেতরে মেসির কাছে ষষ্ঠবার বিশ্বকাপে খেলার জন্য আবদার চালিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ তিনি বুঝেছিলন, ৩৮ বছরের মেসির মধ্যে এখনও অনেক স্পার্ক বাকি আছে। ৩৯ বছর হতে ঠিক ১৯ দিন বাকি থাকতে, আর্জৈন্টিনার জার্সিতে ২০০ তম ম্যাচে ১২০ নম্বর গোল করে বোঝালেন বয়স একটা সংখ্যা মাত্র।
স্কালোনির ধারনা সঠিক। মেসি খেললেন শুধু নয়। ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে দলের প্রথম ম্যাচে মেসির ভিনি, ভিডি, ভিসি। এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। এটাই তো মেসি। বিশ্বকাপে মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক। কিলিয়ান এমবাপে ও আর্লিং হালান্ডের দু’গোল করার দিনে মেসির জবাব তিনটি ছবির মতো গোলে। বলতে গেলে একপ্রকার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন এমবাপে ছাড়াও তাঁর সঙ্গে যাঁর সবচেয়ে তুলনা টেনে বিতর্ক চলে, সেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে। বিশ্বকাপে ১৬ নম্বর গোল করার সুবাদে মেসি ছুঁয়ে ফেললেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজের রেকর্ড। চলতি বিশ্বকাপে সেই রেকর্ড মেসি ভেঙে দেবেন, এমন আশা করা ভুল হবে না। ক্লোজে নিজেই তো বিশ্বকাপ শুরুর আগে বলেছিলেন, মেসি খেললে তাঁর সর্বাধিক গোল করার রেকর্ড অক্ষত থাকবে না।
মেসি যেদিন ছন্দে ও গোল করার মেজাজে থাকেন, তখন মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকা ছাড়া আরও কোনও কাজ থাকে না। আলজিরিয়া ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছিলেন, মেসিরা ধীর স্থির, একইসঙ্গে ফোকাসড প্রথম ম্যাচ খেলতে নামার আগে। সেটাই দেখা গেল ম্যাচে। স্কালোনির একটা বড় সুবিধা ছিল। ২০২২য়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দলটাইকে তিনি মূলত ধরে রাখতে পেরেছেন। এক দু’জায়গায় বদল ছাড়া তাঁকে বিশেষ কিছু করতে হয়নি। এতে নতুন করে দলের ফুটবলারদের কৌশল বোঝাতে বা বোঝাপড়া গড়ে তোলার প্রয়োজন হয়নি। আর যাঁর হাতে মেসির মতো মসীহা, তাঁর আর ভাবনা কী?
৫ মিনিটে প্রথম টাচেই মেসি আলজিরিয়ার জালে বল জড়িয়েছিলেন। কিন্তু সেই গোল গ্রাহ্য হয়নি অফসাইডের কারণে। তাতে কী? মেসি যখন ছন্দে, তখন তাঁর গোল পাওয়া ছিল সময়ের অপেক্ষা। ১৭ মিনিটে তাঁর করা প্রথম গোল যেন পটে আঁকা একটা ছবি। মাঝমাঠে বল পেয়ে সতীর্থের সঙ্গে আলতো পাস খেলে গতি বাড়িয়ে আলজিরিয়া বক্সের সামনে পৌঁছে ফাঁকা জায়গা বেছে নিয়ে মেসি বাঁপায়ের জাদু মেশানো বাঁকখাওয়া শটে গোলকিপার লুকা জিদানের হাতের নাগাল এড়িয়ে জড়িয়ে দিলেন জালে। এককথায় অসাধারন গোল।
আর্জেন্টিনার আধিপত্য ও মেসির গোল বাড়ানোর চেষ্টা বারেবারেই নজর কেড়েছে এরপর। আলমাদা, মেসি, ফার্নান্ডেজ, লওতারোর মিলিত আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল আলজিরিয়া রক্ষণ। মেসির খেলার ধরনটা সবসময় অন্যরকম। তিনি গোটা ম্যাচ জুড়ে গোলের জন্য হাঁকপাক করেন না। ভিড় থেকে সরিয়ে রাখেন কড়া মার্কিং এড়াতে। হঠাৎ হঠাৎ স্বমেজাজে খেলায় অংশ নেন, আর তাতেই বাজিমাত। ৬০ মিনিটে মেসির দ্বিতীয় গোলটা তেমনই। গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজের লম্বা বল বাড়িয়েছিলেন বাঁ প্রান্তে দাঁড়ানো মেসির পায়ে। মেসি সেই বল ধরে আলজিরিয়া বক্সের বাইরে ম্যাক অ্যালিস্টারের সঙ্গে ওয়ান টু পাস খেলে নেন। বল ঠেলে দেন অ্যালিস্টারকে । তিনি মাটি ঘেঁষা জোরালো শট নিলে গোলকিপার লুকা জিদান সেই বল হাতে ধরে রাখতে পারেননি। বুকে লেগে ছিটকে সামনে চলে যায়। মেসি শিকারি চিতার মতো ওত পেতে ছিলেন গোলের সন্ধানে। আলগা বলটা অনায়াস ভঙ্গিতে গোলে ঠেলে দেন। কানসাস সিটির স্টেডিয়ামের ভিভিআইপি বক্সে নিজের ছেলের লুকার গোলকিপিংয়ে যতটা হতাশ হয়েছেন জিদান, ততটাই মুগ্ধতায় মজেছেন তিনি মেসির গোলখিদে দেখে। জিদান নিজেও ফ্রান্সের হয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরের বিশ্বকাপ এমন দক্ষতা তুলে ধরতে পারেননি।
মেসি যে সকলের থেকে আলাদা, তিনি যে সর্বকালের সেরা ফুটবলার, এমনকি মারাদোনা ও পেলেও যে পেছনে ফেলে শ্রেষ্ঠত্বের সম্রাটের মুকুট যে মাথায় পরার জন্য তৈরি, তা প্রমাণ করে দিলেন ৭৬ মিনিটের হ্যাটট্রিক গোলে। মেসি বল ধরলেন, তারপর সতীর্থ নিকো গঞ্জালেসের সঙ্গে পাস খেলে বলটা ফেরত নিলেন। গতির ঝড় তুলে আলজিরিয়া বক্সের ২০ হাত বাইরে থেকে কেউটের বিষাক্ত ছোবলের মতো মেসির বাঁপায়ের একটা বিদ্যুতের ঝলকের স্পর্শের শট। মাটি ঘেঁষা সেই শট গোলকিপার লুকা জিদানের বাড়ানো হাতের নাগাল এড়িয়ে জালের ভেতর কাঁপিয়ে দিল।
কাজ শেষ। আর্জেন্টিনা কোচ স্কালোনি আর মেসিকে মাঠে রেখে তাঁর ক্লান্তি বাড়াতে চাননি। ৭৮ মিনিটে মাঠ ছাড়লেন মেসি তুমুল জয়ধ্বনির মাঝে। গোটা মাঠের সমর্থকরা ফুটবল রাজপুত্রকে কুর্নিশ জানালেন উঠে দাঁড়িয়ে। এখন এটা বলে দেওয়া অপেক্ষা রাখে না, কেন ২০২২ বিশ্বকাপ জেতার পর মিয়ামিতে খেলতে চলে এসেছিলেন মেসি। নিজেকে চার বছরে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিয়ে আরও একবার বিশ্বকাপের আসরে ঝাঁপিয়ে পড়তে, বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুটটা মাথায় ধরে রাখতে। সেটা তিনি শেষপর্যন্ত পারবেন কিনা, সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু এটা বলাই যায়, যেভাবে শুরটা করলেন, তাতে সে আশা করাটা ভুল হবে না। মেসি হ্যায় তো সবকুছ মোমকিন হ্যায়।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
