মোহনবাগান ৬(ছাংতে-৩, সূর্যবংশী, এরউইন, সন্দীপ) শ্রীনিধি ডেকান ০
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: বারাসতের মাঠে কলকাতা লিগ জয়ের চারদিন বাদেই নিজেদের মাঠে শ্রীনিধি ডেকানকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শিল্ড অভিযান শুরু করল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। তিন দলের গ্রুপের প্রথম ম্যাচ বড় ব্যবধানে জেতায় মোহনবাগান কার্যত সেমিফাইনালে। ২৯ সেপ্টেম্বর নর্থ ইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে গ্রুপের দ্বিতীয় ও শেষ ম্যাচ খেলবে তারা। সবুজ মেরুন জার্সিতে বারাসতের মাঠে লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ নির্ধারণের মহমেডান ম্যাচে প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল ছাংতের। বুধবার শিল্ডে শ্রীনিধি ডেকানের বিরুদ্ধে ছাংতের মোহনবাগানের হয়ে ছিল এটা দ্বিতীয় ম্যাচ। দলে নিজের অন্তর্ভুক্তির প্রমাণ দিলেন ছাংতে বর্ষণসিক্ত মাঠে হ্যাটট্রিক করে। ম্যাচ শেষে ছাংতে জানান, এটা বড় কোনও মঞ্চে তাঁর প্রথম হ্যাটট্রিক। বাকি ৩ গোল এসেছে অভিষেক সূর্যবংশী, লি হ্যারি এরউইন ও সন্দীপ মালিকের সৌজন্যে।
লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উৎসব পালনের মেজাজ নিয়ে মোহনবাগান মাঠে ঘোর বর্ষা সত্ত্বেও মাঠে হাজির হয়েছিলেন সাত থেকে আট হাজার সবুজ মেরুন সমর্থক। শিল্ডের ম্যাচ শুরুর আগে ক্লাব লনে লিগ জয়ের পতাকা তোলেন সচিব সৃঞ্জয় বসু ও সভাপতি দেবাশিস দত্ত। মোহনবাগান সমর্থকরাও গ্যালারি সাজিয়ে তুলেছিলেন লিগ জয়ের উল্লেখ করা পোস্টার ও ব্যানারে। গ্যালারিতে নজর কেড়েছে সবুজ মেরুন রংমশাল আর আতসবাজির রোশনাই। বিরতিতে মোহনবাগান ২-০ গোলে এগিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধের খেলার শুরু হওয়ার ফাঁকে লিগ জয়ের আলাদা উৎসবের আয়োজন করেছিলেন আইএফএ সচিব অনির্বান দত্ত। লিগের ট্রফি নিয়ে গোটা মাঠ প্রদক্ষিণ করেন তাঁর নিয়োগ করা বাঙালি সাজের স্বেচ্ছাসেবকরা ও পরীর সাজে সুন্দরী বালিকারা নৃত্যের তালে তালে। সিনিয়র ফুটবলাররা খেলতে ব্যস্ত থাকায় লিগ জয়ের অন্যতম কান্ডারী সায়ন ব্যানার্জি সহ রিজার্ভ টিমের ফুটবলাররা রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁর হাত থেকে ট্রফি নেন।
খেলার শুরু থেকেই আইলিগের দল শ্রীনিধি ডেকানের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল বাগান ব্রিগেড। মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট চিফ কোচ পানাগয়টিস ডিমপেরিস দুই উইংয়ে লিস্টন ও ছাংতে, সামনে দ্রাজিচ ও ম্যাকলারেনকে রেখে আক্রমণাত্মক দল সাজিয়েছিলেন। অ্যাটাকিং মিডফিল্ড পজিশনে মিগুয়েলকে রাখেন প্রতিপক্ষের ওপর চাপ বাড়াতে। কোচ পনোসের কৌশল সফল। ৮ মিনিটেই দ্রাজিচের থেকে বল পেয়ে জোরালো গড়ানো শটে গোল করে মোহনবাগানকে এগিয়ে দেন অভিষেক সূর্যবংশী।
ম্যাচের মাঝে বারবার জোরে বৃষ্টি নামায়, মাটিতে বল রেখে খেলা খুব কঠিন ছিল। শুরুতে তাতেই বল পাস করে খেলতে সমস্যায় পড়েন ম্যাকলারেন, মিগুয়েলরা। গোলের সামনে সুবিধাজনক অবস্থায় বল পেয়েও গোল ঠেলতে ব্যর্থ হন তাঁরা। কয়েকটি ক্ষেত্রে বল কাদায় আটকেও যায়। প্রতিপক্ষ শ্রীনিধি ডেকানের খেলায় কোনও ঝাঁজ ছিল না। তবু ৪০ মিনিটে গোল করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল তারা। মিডিয়া বক্স থেকে যেটুকু দেখা গেছে, তাতে মনে হয়েছে ডেভিড কাস্তানাকে রুখতে গিয়ে মোহনবাগান বক্সের মধ্যে ফাউল করেছেন দীপক টাংরি। শ্রীনিধি পেনাল্টির দাবি জানায়। কিন্তু লাইন্সম্যানের সঙ্গে পরামর্শ করে রেফারি পেনান্টির বদলে বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রিকিক দেন। ওইসময় শ্রীনিধি পেনাল্টি পেলে বা গোল করে খেলায় সমতা ফেরালে ফল অন্যরকম হতে পারত।
তবে এরপরই বাগান বাহিনী আক্রমণের ঝাঁজ আরও বাড়ায়। ৪৪ মিনিটে লিস্টন ও মিগুয়েলের পা ঘুরে আসা বল বাঁপায়ের চকিত শটে গোলে পাঠিয়ে দলের পক্ষে ফল ২-০ করেন। ৫২ মিনিটে ম্যাকলারেনের সেন্টারে ছাংতের দ্বিতীয় ও দলের তৃতীয় গোল। ৫৭ মিনিটে মিগুয়েলের পাস থেকে ছাংতে তিন নম্বর গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ করেন। ৮০ মিনিটে ছাংতে ও কিয়ানের মিলিত বোঝাপড়া থেকে বল পেয়ে দলের পঞ্চম গোল করেন পরিবর্ত হিসেবে নামা সন্দীপ মালিক। ৫২ মিনিটে জেমি ম্যাকলারেনের বদলি হিসেবে খেলতে নেমে নজর কেড়েছিলেন নবাগত বিদেশি লি হ্যারি এরউইন। তাঁর গোল খিদেটা প্রশংসনীয়। তার ফল মেলে ৮২ মিনিটে ম্যাচের সেরা ছাংতের নিখুঁত ক্রশে এরউইন হেডে গোল করে বাগানের হাফডজন জয়ের অঙ্ক পূরণ করায়।
বড় ব্যবধানে শিল্ডের প্রথম ম্যাচে জয় পাওয়ায় খুশি মোহনবাগান কোচ পানোস। বলেন, ‘ সমীর জালকোভিচ ও আশিস রাই এখনও ফিট নয়। তাছাড়া জাতীয় দলে খেলতে গেছে স্টপার মেহতাব, চার ফুটবলার। তাই নিয়মিত ডিফেন্ডারের পাশাপাশি অন্যান্য পজিশনেও কিছুটা অদলবদল ঘটাতে হয়েছে দলে শিল্ডে খেলতে। তারওপর বর্ষার কাদা মাঠে ভাল খেলার সমস্যা থাকেই। চোট লাগার আশঙ্কাও। সেটা বাঁচিয়ে ফুটবলাররা বড় ব্যবধানে ম্যাচ জিতিয়েছে। এটা প্রশংসনীয়। পরের নর্থ ইস্ট ম্যাচের আগে ৬ দিন সময় পাব। তার মধ্যে দলটাকে আরও ভালভাবে গোছাতে হবে।’
ম্যাচের সেরা ছাংতের মুখে মোহনবাগান জার্সিতে হ্যাটট্রিক করার বাড়তি আবেগ। বলেই দিলেন, এতদিন উল্টোদিকে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে খেলেছি। এবার সবুজ মেরুন জার্সি নিজের সমর্থকদের সামনে খেলার তৃপ্তি ও জয় পাওয়ার অনুভূতি সম্পূর্ণ অন্যরকম। ছাংতে আরও বলেন, মোহনবাগানে খেলে যাওয়া জেজে তাঁর ছেলেবেলার প্রেরণা। একসময় তাঁর থেকে উৎসাহ পেয়েছেন। এখন জেজে বিধায়ক হওয়ার পর ব্যস্ত। তাই সেভাবে যোগাযোগ হয় না। ছাংতে এদিন তাঁর করা জীবনের প্রথম হ্যাটট্রিকের জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
মোহনবাগান: বিশাল, রাহুল, আলবার্তো, শুভাশিস, ছাংতে, টাংরি, মিগুয়েল(সুহেল), সূর্যবংশী(সন্দীপ), লিস্টন, দ্রাজিচ(কিয়ান), ম্যাকলাকরেন(এরউইন)।
