অলস্পের্ট ডেস্ক: ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনে সভাপতি পদে শুরুর বছরগুলো স্বস্তিতে কাটালেও গতবছর থেকে বেশ চাপে রয়েছেন কল্যান চৌবে। বিশেষ করে রিলায়েন্সের সঙ্গে মনোমালিন্য বাড়িয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করে আইএসএল আয়োজন ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে কল্যানের কোনঠাসা হওয়া শুরু হয়। এমনিতেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া ফেডারেশনের নয়া সংশোধিত সংবিধানের ভিত্তিতে জাতীয় ক্রীড়ানীতি মেনে নির্বাচন করার ব্যাপারে সরব হন কার্যকরী কমিটির সদস্যরা। এই দাবিটা উঠেছিল, কল্যান সকলের আস্থা হরিয়েছেন এই যুক্তি দেখিয়ে। কিন্তু ফেডারেশন সভাপতি কল্যান সহজে নিজের পদ যে ছাড়বেন না, সেটা জানাই ছিল। তিনি ফিফা ও এএফসির কাছে চিঠি লিখে পুরো মেয়াদ পর্যন্ত তাঁর সভাপতি পদে থাকার অনুমতি আদায় করে নেন। জাতীয় ক্রীড়ানীতি মেনে নির্বাচন সেরে নতুন কমিটি গঠনের জন্য ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেন কল্যানকে।
কল্যান ক্লাব জোটের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে আইএসএল আয়োজন করতে সমর্থ হলেও নিজের অবস্থান ভাল একেবারেই করতে পারেননি ফেডারশনের অন্দরমহলে। ফেডারেশনের নয়া সংশোধিত সংবিধান ও জাতীয় ক্রীড়ানীতি মেনে সভাপতি পদে ও কার্যকরী কমিটির সদ্যদের বাছাই করতে নির্বাচনের দিন ধার্য হয় ২০ ডিসেম্বর। গত বার্ষিক সাধারন সভায়। জাতীয় ক্রীড়ানীতি মেনে বিভিন্ন ক্রীড়াসংস্থার নির্বাচন ৪ নভেম্বরের মধ্যে সেরে ফেলার নির্দেশ এসেছিল।
ফেডারেশনের নির্বাচনে কল্যান যে ভাল অবস্থায় নেই, তাঁর আসন যে টলমল, এটা বিলক্ষণ জানতেন, বা জানেন তিনি। ফেডারেশনের তহবিলের অবস্থাও ভাল ছিল না। এখনও নেই। তার জন্য কল্যানের ভূমিকা কম নয়। রিলায়েন্স ও এফএসডিএলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় অন্তত আইএসএল সহ ভারতীয় দলের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া, শিবির করা, ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালানোর খরচটা মিলছিল। কিন্তু যেদিন থেকে রিলায়েন্স-এফএসডিএল সরে দাঁড়িয়েছে, সেদিন থেকে ফেডারেশনের ভাঁড়ে মা ভবানী। কল্যানের ক্ষমতায় কুলোয়নি নতুন কোনও স্পনসর জোগাড় করে সেই শূণ্য তহবিল ভরাট করার। ক্লাব জোটের উদ্যোগে গতবার ও এবার স্পনসর এনে আইএসএল চলেছে, এবার চলছে।
ফেডারেশনের ভাঁড়ারের যেখানে হাঁড়ির হাল, সেখানে হঠাৎ করে ভারতীয় ফুটবল দলের সঙ্গে পানামা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ে ম্যাচ খেলানোর উদ্যোগ নেওয়াটা খুব একটা যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি অনেকেরই। ফিফা অনুমোদিত আশিয়ান কাপে অংশ না নিয়ে এই ম্যাচগুলো খেলে ভারতীয় ফুটবলের কতটা উন্নতি হয়েছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠে গেছে। রাজ্য সরকার ও ক্রীড়ামন্ত্রক চাইতেই পারে ব্রাজিল ও উরুগুয়ের মতো বিশ্বকাপে অংশগ্রহনকারী দল কলকাতায় খেলে শহর ও রাজ্যের সম্মান বাড়াক। কিন্তু তাতে ভারতীয় ফুটবলের কতটা লাভ? অনেকে সমর্থনের সুরে বলতে চেয়েছেন, আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে ভারত, তা জানতে এই হায়ার র্যাঙ্কিং দলের বিরুদ্ধে খেলা উচিত? তাঁদের জন্য একটাই উত্তর, হায়ার র্যাঙ্কিং দল বলতে কি ব্রাজিল, স্পেন, আর্জেনটিনা, উরুগুয়েই শুধু বোঝায়? এশিয়ার প্রথম সারির দলের সঙ্গে খেললে কি নিজেদের ক্ষমতা বোঝা সম্ভব নয়? আগে তো এশিয়ার গন্ডি পার করি, তারপর না হয়, ব্রাজিল, উরুগুয়ের মতো দলের বিরুদ্ধে খেলার কথা ভাবা যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, ব্রাজিল, উরুগুয়ে বা পানামার মতো দলগুলোর সঙ্গে খেলা আয়োজন করতে যে বিপুল পরিমান টাকার প্রয়োজন ছিল, বা এখনও যে বিপুল পরিমান অর্থ ম্যাচগুলো আয়োজনের জন্য মেটাতে পারেনি ফেডারেশন, সেটা কোথা থেকে আসবে, সেটা কি ভেবেচিন্তে নেমেছিলেন কল্যান? তিনি কী ভেবেছিলেন বোঝা দায়? ব্রাজিল ও উরুগুয়েকে কলকাতায় খেলিয়ে কোটি কোটি টাকার কামিয়ে নেবেন এমন দুঃসাহসিক ভাবনা তাঁর মাথায় কীভাবে এল, সেটা তিনিই ভাল বলতে পারবেন। এই তিন ম্যাচ আয়োজনে ১০০ কোটির ওপর খরচ হয়েছে। অথচ টিকিট বিক্রি, স্পনসরপিশের অর্থ থেকে এই খরচের অর্ধেকের সামান্যই বেশি তুলতে পেরেছে ফেডারেশন। বাকি টাকাটা এখনও জোগাড় করতে পারেননি কল্যান বড় মুখ করে আগে সেকথা বললেও।
তাহলে এই বকেয়া অর্থ আসবে কোথা থেকে? কার্যকরী কমিটির সভায় এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ আয়োজনের আগে কল্যানের সামনেই ঠিক হয়েছিল, কোনওমতেই ফেডারেশনের ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙা যাবে না আর্থিক সমস্যা যাই থাক। সামনে নির্বাচন , সভাপতি পদে থেকে যাওয়ার বাসনায় ব্রাজিল, উরুগুয়ে, পানামা ম্যাচের আয়োজন করে নিজের জায়গাটা শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন কল্যান। অর্থের জোগান শেষপর্যন্ত কোথা থেকে আসবে, তা না নিশ্চিত করেই। নিজের রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগানোর একটা চেষ্টা ছিল স্পনসর জোগাড়ে। তাতে অংশিক সফল হলেও, পুরোটা সম্ভব হয়নি। আর তাতেই ম্যাচ আয়োজনের খরচের বকেয়া মেটাতে ফেডারেশনের এফ ডি ভাঙার প্রস্তাব রেখেছেন কল্যান স্পেশাল জেনারেল মিটিংয়ে।
কিন্তু ফেডারেশনের এই প্রস্তাবে সম্মতি দেননি কার্যকরী কমিটির সদস্যরা। প্রাক্তন সভাপতি প্রফুল প্যাটেল ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এন এ হ্যারিস মনে করিয়ে দেন, আগেই কথা হয়েছিল কোনও পরিস্থিতিতে ফেডারেশনের এফ ডি ভাঙা যাবে না। কল্যান বলতে চেয়েছিলেন, আগের কথা ভুলে গিয়ে ব্রাজিল, উরুগুয়ে, পানামা ম্যাচের বিপুল খরচের কথা মাথায় রেখে এফ ডি ভাঙার অনুমতি দেওয়া হোক। আসলে কল্যান বেশ বুঝেছেন, এই বকেয়া না মেটালে, ভারতে খেলে যাওয়া দল ও এই ম্যাচের আয়োজনের সঙ্গে জড়িত সংস্থা ফিফা দরবারে চলে যাবে বা আইনি ব্যবস্থা নেবে। তাতে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন সমস্যায় পড়বে, সঙ্গে তিনি নিজেও। যদিও বারবার জানতে চাওয়া সত্ত্বেও কল্যান বকেয়ার পরিমান কত, তা জানাননি। এখন যা অবস্থা তাতে ডিসেম্বরের নির্বাচনে রাজনৈতিক ক্ষমতার সমর্থন ও প্রভাব ছাড়া তাঁর কোনওমতেই সভাপতি পদে পুনর্নির্বাচিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই এফ ডি ভেঙে বকেয়া মিটিয়ে পদ হারালেও, তাঁর ওপর কোনও আঁচ এসে পড়বে না। যাঁরা নতুন ক্ষমতায় আসবেন, তাঁরা ভুগবেন।
এটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি প্রফুল প্যাটেল, এন এ হ্যারিসদের। আর তাই এফ ডি ভাঙার পক্ষে কোনও মত দেননি। বরং এন এ হ্যারিসের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি তৈরি হয়েছে। তারা খতিয়ে দেখবে কত বকেয়া রয়েছে ঠিকঠাক। প্রফুলরা ভালই জানেন, কল্যান সভাপতি পদ হারিয়ে বেরিয়ে গেলে যাবতীয় আর্থিক সংকট সামলাতে হবে নতুন কমিটিকে এফ ডি ভাঙার ফলে। পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে এটা বলা যেতেই পারে, কল্যান যেখানে ক্রমশ নিজের জায়গা হারাচ্ছেন ফেডারেশনে, সেখানে প্রফুল প্যাটেল , এন এ হ্যারিস ও তাঁর অনুগামীদের জায়গা শক্ত হচ্ছে। পরবর্তী সভাপতি পদে প্রফুল প্যাটেলের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা বাড়ছে। ডিসেম্বেরর নির্বাচনে কল্যান আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে মনে হয় না। বরং মানে মানে সরে পড়লে সম্মানটুকু বাঁচবে। তবে একটা ইফস অ্যান্ড বাটস সবসময়ই থাকে, সেটা হল দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বরা কী চাইছেন, সেটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। একমাত্র তাঁদের হাতই কল্যানের কল্যান করতে পারে।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
