মোহনবাগান ২(এরউইন, ড্রাজিচ) পাঞ্জাব ১(আলফ্রেড)
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: শনিবার যুবভারতীতে ৩ মিনিটে গোল হজম করেও পাঞ্জাব এফসিকে ২-১ গোলে হারিয়ে আইএসএলে জয়ের হ্যাটট্রিক সেরে ফেলল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। অনেকদিন পর মোহনবাগানের খেলায় চেনা ছন্দটা দেখা গেল। প্রথম ম্যাচে নর্থ ইস্ট ইউনাইটেডের কাছে হেরেছিল সবুজ মেরুন। তিন ম্যাচ অপরাজিত থাকার পর হারের মুখ দেখল পাঞ্জাব। ৪ ম্যাচ থেকে মোহনবাগানের সংগ্রহ এখন ৯ পয়েন্ট। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন বাগান কোচ পানোস পাঞ্জাবের মতো কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জিতে। আর সমর্থকরা ম্যাচ জেতার আনন্দে প্রাক দীপাবলীর বাজিও ফাটিয়ে ফেললেন ম্যাচ শেষে।
চেন্নাইন এফসির বিরুদ্ধে হতশ্রী ফুটবল খেলে জেতার পর মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট কোচ পানোস বলেছিলেন , তিনি দলের খেলায় অখুশি। পরের ম্যাচে অর্থাৎ পাঞ্জাব এফসির বিরুদ্ধে সেই খারাপ খেলার পুনরাবৃত্তি চান না। চেন্নাইন ম্যাচে মাঝমাঠে থই পাননি বাগান ফুটবলাররা। চেন্নাইনের দুই ফুটবলার মাদি তালাল ও নিকোলা মাঝমাঠে মস্তানি দেখানোয়। অনিরুদ্ধ থাপার মতো ফুটবলার হাতে থাকা সত্ত্বেও দীপক টাংরিকে ব্যবহার করে বাগানের হেড স্যার পানোস নিজের রক্ষণাত্মক মনোভাবকেই ব্যক্ত করেছিলেন। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষমতা ধ্বংসাত্মক ফুটবলার বলে পরিচিত টাংরির কোনওকালেই নেই। তারওপর বিদেশি মিডফিল্ডার সমীর জেলকোভিচ ছন্দে না থাকায় বাগান ব্রিগেডকে চাপে থাকতে হয়েছিল। পরে গোল আসছে না দেখে অনিরুদ্ধকে নামান। সঙ্গে সাহালকে। তাতে আক্রমণের ঝাঁজ বেড়েছিল। যদিও ৮৫ মিনিটে জয়ের গোল আসে বদলি হিসেবে নামা লিস্টনের ক্রশে মনবীরের গোলে।
স্বাভাবিক বুদ্ধি বলে, চেন্নাইন ম্যাচ থেকে শিক্ষা নিয়ে মোহনবাগান কোচ পানোসের উচিত ছিল পাঞ্জাব ম্যাচে শুরু থেকেই অনিরুদ্ধ থাপাকে খেলানো। কারণ অসুস্থতার কারণে আপুইয়া না থাকায় গঠনমূলক আক্রমণ গড়ে তোলা ঘাটতিটা রয়েছে বাগানের খেলায়। কিন্তু পানোসের মধ্যে সেই সাহসী মানসিকতার বড়ই অভাব। আর তাই অনিরুদ্ধ নন, পানোস পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে ডিফেন্সিভ ব্লকার পজিশনে টাংরিকেই ব্যবহার করার পথে হাঁটলেন। ঘরের মাঠে জেতার জন্য আগের কোচ হুয়ান ফেরান্দো, সের্জিও লোবেরা বা হোসে মোলিনার মধ্যে আগে ঘর বাঁচিয়ে গোল পাওয়ার এই গুটিয়ে থাকা মনোভাব দেখা যায়নি। বরং তাঁরা ঘরের মাঠে ৩ পয়েন্ট পেতে আক্রমণাত্মক ছকই সাজাতেন। পানোসের মধ্যে সেই মানসিকতা না আসার একটাই কারণ হতে পারে। সম্ভবত ডুরান্ড ফাইনালের ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলের কাছে ৪ গোল হজমের আতঙ্কটা এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি।
তাও এর মধ্যে দুটো ভাল বদল চোখে পড়েছে পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে প্রথম একাদশে। মেহতাব প্রীতি ছেড়ে পানোস লেফট ব্যাকে ফেরান অভিজ্ঞ শুভাশিস বসুকে। শুভাশিসের খেলার বড় গুন, তিনি রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি ওভারল্যাপে উঠে আক্রমণ শানানোর পাশাপাশি গোলও করেন। শুভাশিস লেফট ব্যাকে ফেরায় রাইটব্যাকে অভিষেক তাঁর পছন্দের পজিশনে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন। আক্রমণে কিছুটা হলেও জোস বেড়েছে।
মিগুয়েলের চোট, দলের প্রধান স্ট্রাইকার জেমি ম্যাকলারেন পুরো ফিট নন। এই অবস্থায় আক্রমণভাগে পানোস এতদিন মূলত নির্ভর করছিলেন ছাংতে, মনবীর, ড্রাজিচ, এরউইনের ওপর। কিন্তু চেন্নাইন ম্যাচে ছাংতে একেবারেই ছন্দে ছিলেন না। সেকারণে ছাংতের জায়গায় কোচ পানোস যে সাহালকে দিয়ে শুরু করবেন, এমন আভাস ম্যাচের আগের দিনের প্রিভিউতে দিয়েছিলাম। সাহাল শুরু করলেন বটে, তবে ১২ মিনিটে চোট পেয়ে উঠেও যান। তাঁর জায়গায় মাঠে নেমে অনিরুদ্ধ থাপা দলের হাল ধরেন।
মোহনবাগান অবশ্য নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার আগেই গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ে। বাগান রক্ষণের অগোছালো ও ‘ঘুমিয়ে’ থাকা মনোভাব কাজে লাগিয়ে ৩ মিনিটে গোল করে এগিয়ে যায় পাঞ্জাব। বাগান মাঝমাঠে স্পেনের আলফ্রেড প্লানাস মোয়া ডানদিকে লম্বা বল বাড়িয়েছিলেন কোনসাম সানাথোই সিংকে। তিনি বল ধরে ভেতরে ঢুকে এসে তা রাখেন আলফ্রেডের উদ্দেশ্যে। আলফ্রেড সেই বল নিয়ন্ত্রণে এনে পায়ের জাদুতে বাগান ডিফেন্ডারদের টলিয়ে দিয়ে ডান পায়ে হাঁটু সমান শট নিলে , তা গোলকিপার বিশালের হাতে লেগে গোলে যায়। বিস্ময়ের ব্যাপার এটাই, আলফ্রেডের বল ধরা থেকে গোলে শট নেওয়া পর্যন্ত বক্সের মাঝে বাগানের চারজন ফুটবলার ছিলেন। তাঁরা কেউ কোনও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি।
সাহাল চোট পেয়ে বেরিয়ে যেতে ১২ মিনিটে নামলেন অনিরুদ্ধ থাপা। বলতে গেলে শাপে বর হল। পানোসের পরিত্রাতার ভূমিকায় ১৮ মিনিটে সমতা ফেরানোর মুভটা তৈরি হল থাপার থেকেই। যেটা নিয়ে আগেই বলেছি ম্যাচ রিপোর্টের শুরুতে। আপুইয়া যেখানে নেই, সেখানে থাপার মতো গেমমেকারকে বসিয়ে রাখাটা কোনওমতেই মানা যায় না। সেটা প্রমাণ হল আবার। শুভাশিস বল কেড়ে দিয়েছিলেন সামনে থাপাকে। সেই বল ধরে থাপা পাস দেন এরউইনকে। তিনি জোরালো কোনাকুনি শটে পাঞ্জাবের গোলকিপার আর্শদীপ সিংয়ের পাশ দিয়ে বল জালের ভেতর পাঠান। বাগান কোচ পানোসকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেখা যায় ওই গোলের পর ধড়ে প্রাণ আনার জন্য।
সমতা ফেরানোর গোল পেয়ে বাগান আরও চেপে ধরে আক্রমণে বৈচিত্র এনে। ৪২ মিনিটে ড্রাজিচের একক কৃতিত্বের গোলে এগিয়েও যায়। বিজয় বল বের করেছিলেন থ্রো ইনের বিনিময়ে। সেই থ্রো থেকে এরউইন বল বাড়ান ড্রাজিচকে। তিনি বল ধরে ভেতরে ঢুকে এসে পাঞ্জাব বক্সের বাইরে ২০ গজ দূর থেকে ডানপায়ে জোরালো শট নিলে ডিফেন্ডার বিজয়ের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে গোলকিপার আরশদীপের হাতের নাগাল এড়িয়ে জালে জড়ায়। বাগান সদস্য-সমর্থকদের এই গোলটা যেমন আনন্দ দিয়েছে, তার থেকেও বেশি খুশি করেছে কোচ পানোসকে। তাঁর চাকরি বাঁচানোর গোল আর জয় বললে ভুল হবে না।
৪৪ মিনিটে ম্যাচটা পুরোপুরি পকেটে পুরে ফেলার সুযোগ পেয়েছিল মোহনবাগান। মাঝমাঠ থেকে সমীর জেলকোভিচের তীব্র গতির শট পাঞ্জাব গোলকিপার আরশদীপ আংশিক প্রতিহত করলে, আলগা বল চলে এসেছিল এরউইনের পায়ে। তবে তাঁর নেওয়া শট গোলকিপার আরশদীপের হাতে চলে যায়।
বিরতির পর খেলা টেমপোটা অনেকটাই পড়ে যায়। খেলাটা মূলত মাঝমাঠে আটকে থাকে। এই ঝিমুনি ভাবটা চলে ৭০ মিনিটে পর্যন্ত। ৭২ মিনিটে ড্রাডিচের জায়গায় লিস্টন নামার পরই মোহনবাগানের আক্রমণ অন্য মাত্রা পায়। পরপর গোলের সুযোগ চলে আসে বাগানের সামনে। ৭৪ মিনিটে লিস্টনের পাস থেকে এরউইন সুবিধাজনক অবস্থায় বল পেয়ে শট নিলে তা গোলকিপার আরশদীপের পায়ে লেগে ফেরে। সেই বল ডিফেন্ডাররা ক্লিয়ার করেন। এরপরই মনবীর একের বিপক্ষে এক পজিশনে বল পেয়েও গোলকিপার আরশদীপকে হার মানাতে পারেননি। ৮১ মিনিটে লিস্টনের কোনাকুনি গড়ানো শট আরশদীপ দুরন্ত দক্ষতায় বের করে দেন।
শুরুতে পিছিয়ে পড়েও পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে কঠিন ম্যাচ জেতার কারণে মোহনবাগান শিবির যে ৫ নভেম্বর ঘরের মাঠে অনুষ্ঠেয় ওড়িশা ম্যাচের জন্য আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নিল, এটা বললে ভুল হবে না।
মোহনবাগান: বিশাল, অভিষেক, আলবার্তো, বেকে, শুভাশিস, মনবীর, টাংরি, জেলকোভিচ, ড্রাজিচ(লিস্টন), সাহাল(অনিরুদ্ধ), এরউইন(ছাংতে)।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
