অলস্পোর্ট ডেস্ক: গ্লাসগো ২০২৬ কমনওয়েলথ গেমসে মহিলা জুডো বিভাগে প্রথমবার সোনা জিতে ইতিহাস গড়েছেন ভারতের জুডোকা অস্মিতা দে। কিন্তু তারঁ এই সাফল্যের পেছনে যে যন্ত্রণা,অধ্যাবসায় ও দারিদ্রের সঙ্গে লড়াইয়ের কাহিনী রয়েছে, তা জানলে সকলের চোখ জলে ভরবে। যেমন পুরস্কার মঞ্চে পদক নেওয়ার সময় ত্রিপুরার মেয়ে অস্মিতার চোখে নেমেছিল জলের ধারা। আসলে অস্মিতার তখন মনে পড়ে গিয়েছিল, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাবাকে হারানোর ব্যথাটা। অস্মিতার বাবা অর্জুন আকস্মিক আক্রান্ত হয়ে মারা যান কমনওয়েলথ গেমসে মেয়ের সিলেকশন পাওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে। আর তাই অস্মিতা পদক হাতে পাওয়ার পর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। প্রয়াত বাবার কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। বাবা অর্জুন দেখে যেতে পারলেন না তাঁর মেয়ে অস্মিতা কী অসাধ্যসাধনই করেছেন ভারতের হয়ে জুডোয়ে প্রথম সোনা জিতে, তবে তাঁর আশীর্বাদ যে সঙ্গে ছিল, অস্মিতার লড়াইয়ের জেদ যে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল, ঐতিহাসিক পদকপ্রাপ্তি তাঁর বড় প্রমাণ।
কানাডার হেইদি কুয়াচকে ২-১ ফলে মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে সোনা জিতে দীর্ঘদিনের সোনা জয়ের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছেন অস্মিতা। অথচ বাবাকে হারানোর পর সাময়িক ভেঙে পড়েছিলেন অস্মিতা। মনে হয়েছিল চোখের সামনে গোটা পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে গেছে। ২০০৩ সালে দক্ষিণ ত্রিপুরার বেলোনিয়া গ্রামের হত দরিদ্র পরিবারের মেয়ে অস্মিতার জন্ম। বাবার একটা সামান্য সাইকেল সারানোর দোকান। বাবা, মা, ভাই ও তাঁর সংসারে উপার্জনকারী ওই মাত্র একজন ছিলেন বাবা। দিনে খুব বেশি হলে ৩০০ টাকা রোজগার। মাটির কাঁচা বাড়তি কোনওরকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই। তবু নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থাতেও মেয়ের খেলাধুলোর প্রতি আগ্রহ দেখে প্রতিযোগিতামূলক অস্মিতাকে এগিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি বাবা অর্জুন। মহাভারতের অর্জুনের মতো তিনিও পাখির চোখে লক্ষ্য রাখার মতে অস্মিতাকে সফল প্রতিযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে দিন রাত এক করে ফেলেছিলেন। আজ তাঁর সেই প্রাণপাত পরিশ্রম সফল। অস্মিতার হাতে সোনার পদক, কিন্তু তিনি সেটা দেখে যেতে পারলেন না। এটাই বড় কষ্ট দিচ্ছে অস্মিতাকে।
পদকপ্রাপ্তি অনুষ্ঠানের পর নিজেকে সামলে নিয়ে অস্মিতার প্রতিক্রিয়া, ‘ ত্রিপুরার একটা ছোট গ্রামে আমাদের বাস। বাবা নেই। যখন ছিলেন, তখন মা আর ভাইকে নিয়ে কোনওরকমে দিনগুজরান। নিজেদের বাড়ি নেই। ভাড়া বাড়িতে বাস। তাও বাবা আমাকে সবসময় প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। খেলা চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন। এমনিতেই সংসার চালানো ছিল দায়, তাও আমার যখন গুরুতর হাঁটুর সমস্যা হয় চোটের কারণে, কেরিয়ার শেষ হতে বসেছিল, বাবা আমাকে নিয়ে দিল্লি যান চিকিৎসার জন্য, ওষুধের ব্যবস্থা কেন, ধার দেনা করে। ২০২৩য়ে উত্তরপ্রদেশে পুলিশে চাকরি পাওয়ার পর সংসাকে কিছুটা সুরাহা হয়। তবে সেটাও সামান্যই।
তাই বাবার মৃত্যুর পরে মনে হয়েছিল, সবকিছু শেষ হয়ে গেল। আর বুঝি খেলা চালিয়ে যেতে পারব না। মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তখন একটা কথাই মনে হয়েছিল, উত্তরপ্রদেশ পুলিশের চাকরির টাকায় মা, ভাইকে ভাল রাখতে হবে। সেসময় আমাকে উজ্জীবিত করতে এগিয়ে আসেন মা। বাবার পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম মেটার ১০ দিনের মাথায় মা আমাকে বলেন, অস্মিতা এখানে থেমে গেলে চলবে না। যদি থেমে যাস, তাহলে তোর বাবা স্বর্গে গিয়েও শান্তি পাবে না। ভাববে আমি তোর স্বপ্নপূরণ করতে পারলাম না। তাই যা তোর স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে ট্রেণিং শুরু করে দে। সেটাই করেছিলাম। মায়ের সেই মনের জোর বাড়ানো মন্ত্রটাই আজ আমাকে সাফল্য, সোনা এনে দিয়েছে।’
অস্মিতা বাবার কাজের পরদিনই ভুপালের সাইয়ে ট্রেণিং করতে চলে যান ত্রিপুরার বাড়ি ছেড়ে। বাকিটা তো এখন ইতিহাস। কমনওয়েলথ গেমসের আগে বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছেন অস্মিতা। বলেন, ‘ আমি কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে গিয়েছিলাম। পদক জয়ের আগের রাতে ঘুমোতেই পারিনি দুশ্চিন্তা ও উত্তেজনায়। শুধু ফাইনালের লড়াইয়ের কথা ভাবছিলাম। আমার শরীর তাতে আরও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তবু সকাল সাড়ে ৫টায় উঠে ট্রেণিংয়ে নেমে পড়ি। তবে ভেতরে ভেতরে একটা জোস কাজ করছিল। বারবার বাবা ও মায়ের কথা মনে পড়ছিল। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম কোনওমতো হার মানব না। বাবা ও মায়ের এতদিনের কষ্টের প্রতিদান দেবই। সেটা করতে পেরে খুব খুশি।’
অনেকেই জানেন না অস্মিতার ভাই তাঁর জন্য ফ্রিজে একটা প্রিয় মিস্টি লবঙ্গ লতিকা এনে রেখেছিল। বাড়িতে থাকার সময় সেটা খাবার খুব লোভ হয়েছিল অস্মিতার গ্লাসগো আসার আগে। কিন্তু সেই লোভ সংবরণ করেন অস্মিতা। এবার বাড়ি ফিরে ভাই আর মায়ের হাত থেকে সেই মিস্টি খাবেন অস্মিতা।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
