মোহনবাগান ৩( ড্রাজিচ-২, এরউইন) ওড়িশা ২( মামুদ, এভার্টন)
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: কথায় আছে যার শেষ ভাল, তার সব ভাল। চলতি মরশুমের সেরা ফুটবল খেলেও গোল নষ্টের কারণে আর প্রতিপক্ষ গোলকিপার ঋত্বিক তিওয়ারির হার না মনোভাবের কারণে বৃহস্পতিবার যুবভারতীতে ঘরের মাঠে ওড়িশা এফসির কাছে পয়েন্ট খোয়তে বসেছিল মোহনবাগান সুপার জায়েন্ট। ২বার ডেজান ড্রাজিচের গোলে এগিয়ে গিয়েও ২বার গোল হজম করে। শেষপর্যন্ত ৮৭ মিনিটে লি এরউইনের গোলে ৩-২ ফলে জেতায় মোহনবাগান সমর্থকদের দীপাবলীর আনন্দটা দ্বিগুন হল। স্বস্তি পেলেন মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট কোচ পানোসও। পরপর ৪ ম্যাচ জিতে।
গত ম্যাচে আইএসএলে জয়ের হ্যাটট্রিক করলেও মোহনবাগানের খেলায় মন ভরেনি প্রিয় সমর্থকদের। আসলে গত কয়েক মরশুম ধরে দাপুটে ফুটবল খেলে জয় পাওয়া যে মোহনবাগানকে তাঁরা দেখতে অভ্যস্ত, সেটা বর্তমান দলের খেলায় না দেখতে পেয়ে। বাগান কোচ পানোস সবুজ মেরুনকে একটা বাড়তি উচ্চতায় নিয়ে যাবেন এই প্রত্যাশা রয়েছে সদস্য-সমর্থকরা ছাড়াও টিম ম্যানেজমেন্টের মধ্যেও। কিন্তু সেই সাবলীল ছন্দটা ঠিক আসছে না দলের খেলায়। বারবার দলে এনেও পানোস সেরা খেলাটা বের করে আনার চেষ্টা করেছেন। দল যে খারাপ খেলছে এমন নয়। কিন্তু ফিনিশিংয়ের দুর্বলতা দলকে ভোগাচ্ছে। যেমন ভুগতে বসেছিল মোহনবাগান বৃহস্পতিবার
গত ম্যাচগুলোয় গোলের সুযোগ তৈরি হচ্ছিল কম। আর সেটা বুঝেই বাগান কোচ পানোস মাঝমাঠে সচল ভাব আনতে ও আক্রমণের বল সরবরাহ বাড়াতে ওড়িশার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সমীর জেলকোভিচের সঙ্গে অনিরুদ্ধ থাপাকে ব্যবহারের পথে হাঁটেন। আক্রমণের ঝাঁজ বাড়াতে দুই উইংয়ে মনবীর ও লিস্টনকে রেখে সামনে লি এরউইনের সঙ্গে ড্রাজিচকে জুড়ে দেন। আর তাতেই আক্রমণের সুনামি বয়ে যায় ওড়িশা রক্ষণে। গোলের অসংখ্য সুযোগ তৈরি করেছিল বাগান ব্রিগেড। কিন্তু গোল করতে না পারলে কোচ পানোস আর কী করবেন? তিনি তো আর মাঠে নেমে গোল করবেন না। গোলের সুযোগ নষ্ট না করলে, প্রথমার্ধেই ৫ গোলে এগিয়ে যেত মোহনবাগান। অবশ্য একইসঙ্গে গোল পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর জন্য ওড়িশা গোলকিপার ঋত্বিক তেওয়ারির কৃতিত্ব কিছু কম নয়।
খেলা শুরুর বাঁশি বাজার ১৯ সেকেন্ডের মধ্যে গোল করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল মোহনবাগান। সেন্টার সার্কেলের কাছে বল পেয়ে মুভ তুলে এনেছিল সবুজ মেরুন। বক্সের ডানদিকে ড্রাজিচ বল পেয়ে ভেতরে ফাঁকায় দাঁড়ানো লি এরউইনকে বাড়ান। সামনে ওড়িশা গোলকিপার হৃত্বিক তিওয়ারি ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। এরউইন বল ধরে হাফটার্নে ডানপায়ে শট নিলে, তা তিওয়ারি রুখে দিলে কর্নার হয়। নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট।
১২ মিনিটে আবার পরিত্রাতার ভূমিকা নিলেন ওড়িশার গোলকিপার ঋত্বিক তিওয়ারি। ডানপ্রান্তে বল ধরে তীব্র গতিতে ওড়িশা বক্সের ধারে পৌঁছে ভেতরে পাস বাড়ালে পেছন থেকে ছুটে এসে সেই বলে গোলার মতো শট নিয়েছিলেন সমীর জেলকোভিচ। সেই বল ততোধিক তৎপরতায় শূণ্যে শরীর ছুঁড়ে দিয়ে বের করেন ঋত্বিক। ১৮ মিনিটে একক প্রচেষ্টায় পায়ের জাদুতে ওড়িশা ডিফেন্ডারদের টলিয়ে দিয়ে লিস্টন গোলের সামনে পৌঁছেও বল গোলের ভেতর রাখতে পারেননি। বলা ভাল গোলকিপার ঋত্বিক তিওয়ারি এবারও গোলের কোন ছোট করে লিস্টনের পুশ ব্লক করে দেন কর্নারের বিনিময়ে। আক্রমণের চাপ বজায় রেখেছিল বাগান। ২৩ মিনিটে বক্সের মাথা থেকে নেওয়া এরউইনের শট আবার রোখেন গোলকিপার ঋত্বিক।
খেলার গতির বিরুদ্ধে ২৭ মিনিটে গোল করার পরিস্থিতি তৈরি করেছিল ওড়িশা। পুটিয়ার কর্নারে এজে হেড নিলে তা বক্সের মাঝে এভার্টনের মাথায় পড়ে। তাঁর নেওয়া হেড বাগান গোলকিপার বিশাল কাইথ রুখে দিয়ে নিশ্চিত পতন রোখেন দলের। আর একবার এভার্টনের হেড সেভ করেন গোলকিপার বিশাল।
এরপরও একাধিকবার আক্রমণ তুলে এনেছিল মোহনবাগান। ওড়িশা রক্ষণে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছিল। মনে হচ্ছিল যে কোনও সময় গোল খাবে ওড়িশা। কিন্তু ঋত্বিক পণ করে নেমেছিলেন যেন এই ম্যাচে, কোনওমতে গোল খাবেন না। একের পর এক প্রচেষ্টা রুখে ওড়িশাকে প্রথমার্ধে গোলশূণ্য অবস্থায় সাজঘরে ফেরার সুযোগ করে দেন। দুর্ভাগ্য মোহনবাগানের প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে লিস্টনের শট পোস্টে লেগে ফেরে।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলায় ভিন্ন ছবি। দু’দলের গোলে বল ঢুকলো একাধিকবার। তবে শেষ হাসিটা হাসল মোহনবাগানই। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ড্রাজিচের গোলে গাঁট ছাড়লো মোহনবাগানের। ৪৬ মিনিটে ওড়িশা মাঝমাঠে মনবীর বল ধরে দেন অনিরুদ্ধ থাপাকে। তিনি সামনে রাখেন ড্রাজিচের উদ্দেশ্য। ড্রাজিচ সেই বল ধরে বক্সের ভেতর কাট করে ঢুকে এসে বাঁপায়ের কোনাকুনি শটে হার মানান গোলকিপার ঋত্বিককে। ম্যাচে প্রথমবার।
৫২ মিনিটে আচমকাই গোল খেয়ে যায় মোহনবাগান। অতীতে বহুবার দেখা গেছে গোল করে এগিয়ে যাওয়ার পর অনেক দলের মধ্যে অল্পসময়ের জন্য শিথিলতা আসে। আর সেসুযোগ প্রতিপক্ষ গোল করে বসে। বাগানের ক্ষেত্রেও তাই হল। প্রতিআক্রমণে বল পেয়ে নিহাল সুদেশ গড়ানো মাইনাস রেখেছিলেন বাগান বক্সে। সবুজ মেরুনের ডিফেন্ডার আলবার্তো সেই বল ক্লিয়ার করার আগেই গোলকিপার বিশাল কাইথের হাতের সামনে দিয়ে গোলের ভেতর পাঠান মামুদ ইদ।
৬৭ মিনিটে বক্সের মাথা থেকে এরউইনের নেওয়া ফ্রিকিক পোস্টের ধার ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। এরপরই লিস্টনকে তুলে ছাংতেকে নামিয়েছিলেন কোচ পানোস। তার সুফল মিলল। ডানপ্রান্তে বল পেয়ে বক্সে ঢুকে ছাংতে মাইনাস রাখলে ওড়িশা ডিফেন্ডারদের জটলার মাঝেই পায়ের টোকায় বল গোলের ভেতর ঠেলে মোহনবাগানকে দ্বিতীয়বার এগিয়ে দেন ৭৪ মিনিটে।
আবার সেই এক গল্প। গোল করে এগিয়ে যাওয়ার পর খানিকক্ষণের জন্য খেলা থেকে হারিয়ে যাওয়া। আর তাতেই ৭৯ মিনিটে আবার গোল হজম মোহনবাগানের।
জয়ের গোল পেতে পানোস ৮৫ মিনিটে মনবীরের জায়গায় নামান জেমি ম্যাকলারেনকে। আইএসএলে এই মরশুমে চোট সারিয়ে প্রথমবার। ম্যাকলারেন গোল না পেলেও জয়ের গোলটা করলেন এরউইন ৮৭ মিনিটে। বাঁপ্রান্ত থেকে শুভাশিসের ক্রশ বক্সের মাঝে পড়লে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের গায়ে লেগে সেই বল এরউইনের কাছে এলে তিনি গড়ানো শটে গোলকিপার ঋত্বিককে হার মানান। এর থেকে ভাল দীপাবলীর উপহার আর কী হতে পারে মোহনবাগান সমর্থকদের জন্য।
মোহনবাগানঃ বিশাল, অভিষেক, মেহতাব, আলবার্তো, শুভাশিস, মনবীর(ম্যাকলারেন), জেলকোভিচ(টাংরি), অনিরুদ্ধ, লিস্টন(ছাংতে), ড্রাজিচ, এরউইন।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
