ইস্টবেঙ্গল ১(বিলাল) মোহনবাগান ১(মনবীর)
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: ছেলেবেলায় ডেভিড ও গোলিয়াথের গল্প সকলেই পড়েছেন। এখনও পড়ে। ছোট ডেভিডের কাছে দৈত্য গোলিয়াথের হারের কথা তাই কারও অজানা নয়। তবে চোখের সামনে যদি সেটা ঘটতে দেখা যায়, তাহলে অনুভূতিটা অন্যরকম হতে বাধ্য। সোমবার বারাসত স্টেডিয়ামের মাঠে কলকাতা ফুটবল লিগের ডার্বিতে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের সিনিয়র ব্রিগেড বলা ভাল আইএসএলে খেলা বাঘা বাঘা ফুটবলারদের বিরুদ্ধে যেভাবে ৯০ মিনিটে সমানে সমানে লড়ে ম্যাচ ১-১ ড্র রেখে মাথা উঁচু করে মাঠ ছাড়লেন ইস্টবেঙ্গলের রিজার্ভ বেঞ্চের ফুটবলাররা, তাতে ডেভিড ও গোলিয়াথ দ্বৈরথের কথাই বেশি করে মনে এল। ম্যাচটা না জিতলেও, লাল হলুদ বাহিনীর পক্ষে এটা নৈতিক জয় বলতে কোনও দ্বিধা নেই। সেখানে মোহনবাগানের জন্য এই ড্র নিতান্তই মানহানির সমান। এই ড্রয়ের ফলে ১১ ম্যাচে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ শীর্ষে উঠল ইস্টবেঙ্গল। তারপরেই থাকল ভবানীপুর দ্বিতীয় স্থানে সমসংখ্যক ২৭ পয়েন্ট নিয়ে গোলপার্থক্যে পিছিয়ে পড়ে। আর ২৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে মোহনবাগান এসজি।
ইস্টবেঙ্গলের রিজার্ভ দলের কোচ অর্চিস্মান বিশ্বাসকে কৃতিত্ব দিতেই হবে মোহনবাগানের তারকা ফুটবলারদের কোনওরকম দাপট দেখানোর সুযোগ না দিয়ে গর্বের সঙ্গে ড্র করায়। অনেকেই হয়ত বলবেন, ড্রয়ে আবার এত কী উচ্ছ্বাস, ম্যাচ শেষে ইস্টবেঙ্গল ফুটবলাররা কেনই বা বিজয়োল্লাসে মেতে উঠেছিলেন বারাসাত স্টেডিয়ামে উপস্থিত লাল হলুদ সমর্থকদের সঙ্গে?
উত্তরটা খুব সহজ। মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের কোচ বাস্তব রায় কলকাতা ফুটবল লিগের নিয়মরক্ষার একটা ডার্বি জতার জন্য আইএসএলে নিয়মিত খেলা ৮ ফুটবলারকে প্রথম একাদশে রেখেছিলেন। কে ছিলেন না সেই দলে। রক্ষণে শুভাশিস , বেকে, মেহতাব, মাঝমাঠে আপুইয়া, আক্রমণে সাহাল, মনবীর, কিয়ান, সায়ন। আইএসএলে খেলেন না এমন ফুটবলার ছিলেন তিনজন, রাজ বাসফোর, তন্ময় ঘোষ, ও গোলকিপার দীপপ্রভাত ঘোষ।
সেখানে ইস্টবেঙ্গল কোচ অর্চিস্মান ভরসা রেখেছিলেন তাঁর রিজার্ভ টিমের ফুটবলারদের ওপরেই। যাঁরা ইস্টবেঙ্গলকে এতদিন লড়ে সুপার সিক্সে তুলেছিলেন। আর শুধু তাই নয়, লাল হলুদ কোচ অর্চিস্মানের সাহসী মনোভাবের প্রশংসা করতে হয়, মোহনবাগানের তারকা খচিত দলের বিরুদ্ধে প্রথম একাদশে ১১ জন বাঙালি ফুটবলারকে রেখে শুরু করায়। ইস্টবেঙ্গলের মনোতাষ মাঝি, আকাশ হেমব্রম, বিজয় মুর্মু, অঙ্কন ভট্টাচার্য, বিক্রম প্রধান, জয় বাজ ও পরে বদলি হিসেবে নামা মহম্মদ বিলাল প্রথমার্ধের জড়তা কাটিয়ে উঠে যেভাবে দ্বিতীয়ার্ধে বারবার আক্রমণ শানিয়ে মোহনবাগান রক্ষণকে চাপে ফেলে দিয়ে গোল তুলে নেয়, তাতে বলতে দ্বিধা নেই, এই ফুটবলারদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল। এমন একটা দিনে ইস্টবেঙ্গল কোচের গভীর চিন্তা মনোতোষ মাঝির গুরুতর চোট নিয়ে। বাকি ম্যাচে আর পাবেন কিনা জানেন না।
ইস্টবেঙ্গল ফুটবলাররা একটা অর্ধ প্রতিপক্ষকে একটু বাড়তি সমীহ করে খেলার বুঝে যান, মোহনবাগান আসলে কাগুজে বাঘ। কাদা মাঠে হাতি পাঁকে পড়লে যেমন অসহায় হয়ে যায়, বাগান ফুটবলারদের অবস্থাও তেমনই। বরং ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলারদের এই খেলতে কোনও সমস্যা হয়নি। কারণ তাঁরা এর থেকেও খারাপ মাঠে খেলে আগের ম্যাচগুলো বের করেছেন। এদিনও করলেন। ৬৫ মিনিটে বিজয় মুর্মুর কর্নারে হেডে কেরলের ত্রিবানদ্রমের ফুটবলার মহম্মদ বিলালের দর্শনীয় গোল ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরাই শুধু নন, বহুকাল মনে রাখবেন বাগানের সমর্থকরাও বুকে একরাশ যন্ত্রণা নিয়ে। বিজয় মুর্মুর মিস আর জয় বাজের প্রচেষ্টা পোস্টে প্রতিহত না হলে, ইস্টবেঙ্গল কলকাতা ফুটবল লিগের ডার্বিও জিতত। কোচ অর্চিমান তাঁর ফুটবলারদের উজ্জীবিত করতে পেরেছিলেন এটা বলে, উল্টোদিকে কত বড় নামের ফুটবলার আছে, তা দেখার দরকার নেই। বরং ভাব নিজেদের খেলা নিয়ে। মাঠে নেমে সেরা দাও। নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার এমন মঞ্চ আর পাবে না। ভাল খেললে অনেকের কাছে সিনিয়র দল ও আইএসএলে খেলার দরজা খুলে যাবে।
আসলে ডুরান্ড কাপ ফাইনালে ১-৪ গোলে হারের জুজু এখনও মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। সেটা টিম ম্যানেজমেন্টই হোক আর কোচ-ফুটবলাররাই হোন। তাঁদের মাথায় একটা ভাবনাই ছিল, কলকাতা ফুটবল লিগের ডার্বিতে যেন কোনওভাবেই হারের মুখ দেখতে না হয়। আর সেটা করতে গিয়ে আইএসএলে খেলা সিনিয়র ফুটবলারদের তাঁরা নামিয়ে দেন বারাসতের মাঠে। কিন্তু তাঁদের এটা বোঝা উচিত ছিল, দুপুরের অঝোরধারার বৃষ্টিতে বারাসত স্টেডিয়ামের মাঠ প্রবল ভারী হয়ে যায়, ঘন মোটা ঘাসের নীচে জলের সঙ্গে কাদা আটকে থাকায়। বল গড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না মোহনবাগানের তথাকথিত তারকা ফুটবলারদের পক্ষে। ফলে পাসিং ফুটবল মাঠে মারা যায়। তুলে তুলে ফুটবল খেলতে গিয়ে বাগানের ফুটবলাররা লাল হলুদের রক্ষণের ফুটবলারদের জমাট ভাব ভেঙে গোল করার মতো বেশি পরিস্থিতি তৈরিই করতে পারেননি। ৩৮ মিনিটে আপুইয়ার থেকে বল পেয়ে ইস্টবেঙ্গলের অঙ্কন ভট্টাচার্যের পাশ দিয়ে শট নিয়ে গোলকিপার গৌরব শ’কে হার মানান মনবীর। কিন্তু তারপর বাকি ম্যাচে শেষমুহূর্তে সায়নের একটি গোলের প্রচেষ্টা ছাড়া মোহনবাগানের ওপেন চান্স কোথায়? সায়নের টোকাটা অবশ্য গোলে চলে যেত, গোলকিপার গৌরব সময়মতো ফিস্ট করে বের না করলে। আর সেকারণে ও গোটা ম্যাচে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলার জন্য গৌরবই হলেন ম্যাচের সেরা।
বহুকাল পর বারাসাত স্টেডিয়ামে বড়মাপের ম্যাচ হল আইএফএর উদ্যোগে। তাও আবার কলকাতা ডার্বি। কোনওরকম অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াও নির্বিঘ্নে ম্যাচ হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন আইএফএ সচিব অনির্বান দত্ত। তবে ম্যাচ শেষে সাজঘর ছেড়ে টিম বাস ও নিজেদের গাড়িতে ওঠার সময় কিছু সমর্থক ভিড়ের মাঝে মোহনবাগান ফুটবলারদের মাথায় চড় চাপড় মারায় বেশ ক্ষুব্ধ টিম ও মিডিয়া ম্যানেজার। তাঁরা গোটা বিষয়টি আইএফএ সচিবের গোচরে আনবেন বলে জানিয়েছেন ফুটবলারদের নিরাপত্তায় পুলিসের শিথিলতা থাকার কারণে।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
