ভারত ১(রায়ান) পানামা ১(ওমর)
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: ইচ্ছাশক্তি,মনের জোর ও লড়াই দিয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে টক্কর দেওয়া যায়। সেটা দেখাল ভারতীয় ফুটবল দল শুক্রবার বেঙ্গালুরুর কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে। ২০১৮ ও ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে খেলা ও ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৪৪ নম্বরে থাকা পানামার বিরুদ্ধে শুরুতে রায়ান উইলিয়ামসের করা গোলে এগিয়ে থেকে শেষপর্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ ১-১ ড্র করে। ৯৪ স্থান পিছনে থাকা ভারত সমানে সমানে পাল্লা দিয়েছে পানামার সঙ্গে, বলা ভাল পানামাকে চাপে রেখেছিল সারা খেলায়। ম্যাচটা জেতার মতোই খেলেছেন ভারতীয় ফুটবলাররা কোনওরকম হীনম্যতায় না ভুগে। তাতে ৩ অক্টোবর যুবভারতীতে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৫ নম্বরে থাকা ৫ বার বিশ্বকাপ জয়ী ব্রাজিল দলের মুখোমুখি হওয়ার আগে ভারতীয় দলের ফুটবলররা বাড়তি আত্মবিশ্বাস পেয়ে গেলেন,সেটা বলাই বাহল্য।
শেষ ৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারত কোনও জয় পায়নি। শেষ জয় এসেছিল হংকংয়ের বিরুদ্ধে এএফসি এশিয়ান কাপ কোয়ালিফায়ারের নিয়মরক্ষার ম্যাচে। রায়ান উইলিয়ামসের গোলে। তবু ভারতীয় দলের কোচ খালিদ জামিল পানামার মুখোমুখি হওয়ার আগে বলেছিলেন, প্রতিপক্ষ শক্তিশালী। বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে পানামার ফুটবলারদের। তাদের কোচও নামী। সেটা মাথায় রেখে খেলতে বললেও, তাঁর ফুটবলারদের গোল বাঁচানোর জন্য শুধু রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলার নির্দেশ দেবেন না। কারণ শুধু রক্ষণাত্মক খেলে পানামার মতো দলকে রোখা সম্ভব নয়। বরং তিনি চান তাঁর ফুটবলাররা অ্যাটাক ও ডিফেন্সের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সংগঠিত ফুটবল তুলে ধরুক পানামা যাতে ঘাড়ে চেপে বসতে না পারে।
শুক্রবার বেঙ্গালুরুর কান্তিরাভা স্টেডিয়ামের অতীত ঐতিহ্য ও সাফল্যকে সামনে রেখে ও প্রিয় সমর্থকদের প্রেরণায় ভর করে খালিদ জামিলের ফুটবলারদের শুরু থেকেই সেই উজ্জীবিত ফুটবল খেলতে দেখা যায়। ভারতীয় কোচ মূলত নবীন ফুটবলারদের ওপরই বেশি ভরসা রেখে দল সাজিয়েছিলেন বিশ্বকাপে খেলা পানামার বিরুদ্ধে। গোলের নীচে অভিজ্ঞ গুরপ্রীত, স্টপারে আনোয়ার, মাঝমাঠে আপুইয়া ও সামনে রায়ান উইলিয়ামসের মতো ফরোয়ার্ড থাকলে ভারতীয় দলের বাকি ফুটবলারদের মধ্যে যে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জন্মায়, সেটা ধরা পড়ে ইতিবাচক মনোভাবে।
বহু যুদ্ধের নায়ক ডিফেন্ডার সন্দেশ ঝিঙ্গান, রাহুল বেকেকে দলে না রাখায়, খালিদের ফুটবলার নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে খালিদ সেটা কানে তোলেননি। তাঁর সাফ যুক্তি ছিল, ভারতীয় দলকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করতে ঢেলে সাজানো জরুরি। আর তার জন্য নতুনদের বেশি করে সুযোগ দিতে হবে, তুলে আনতে হবে। খালিদ ভারতের রক্ষণ সামলানোর জন্য স্টপারে অভিজ্ঞ আনোয়ারের পাশে বিজয় ভার্গিসকে বাছেন। দুই সাইডব্যাকে অভিষেক ও আকাশ মিশ্রকে। পানামার আক্রমণ যাতে দানা বাঁধতে না পারে, তার জন্য ডাবল ডিফেন্সিভ স্ক্রীণে আপুইয়ার সঙ্গে রিকি শাবংকে খেলানোর খালিদের সিদ্ধান্তও সঠিক। একসময় ভারতের নামী কোচ অমল দত্ত ও সুভাষ ভৌমিক কাগজে কলমে এগিয়ে থাকা প্রতিপক্ষকে বক্সের বাইরে থামিয়ে দিতে এই কৌশল নিয়ে সফল হয়েছেন বহুবার। খালিদেই সেই কৌশলেই পানামার আক্রমণাত্মক ফুটবলাররা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেননি প্রথমার্ধে। বরং পানামার ফুটবলাররা বল ধরলেই প্রেসিং ফুটবল খেলে তাড়া করে বল ছিনিয়ে নেন ভারতীয় ফুটবলাররা বারবার। সদ্য বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া পানামা ফুটবলারদের খেলায় তেমন কোনও ঝাঁজ নজরে আসেনি।
বরং শুরু থেকে পানামা অর্ধে আক্রমণ তুলে এনে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের অস্বস্তিতে রাখেন রায়ান উইলিয়ামস,মনবীর, আশিক কুরুনিয়ানরা। তাঁদের মিলিত আক্রমণের মুখে পানামা গোলকিপারকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। তাতে মনেই হচ্ছিল ভারত গোল পেতে পারে যেকোনওসময়। ৪১ মিনিটে ভারতের কাঙ্খিত গোলটা এল রায়ান উইলিয়ামসের পা থেকে। পানামা অর্ধের ঠিক ভেতরে বাঁ প্রান্তে বল ধরে আকাশ মিশ্র উঁচু করে সামনের দিকে লব ভাসিয়ে দেন রায়ান উইলিয়ামসকে লক্ষ্য করে। পানামার দুই ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে ছিটকে বেরোন রায়ান। পানামা মাঝমাঠের জায়গায় বল যখন পান, তখন তাঁর সামনে অনেকটা ফাঁকা জমি। পানামার কোনও ডিফেন্ডারই জায়গা ছিলেন না। সম্ভবত তাঁরা রায়ানকে অফসাইডের ফাঁদে ফেলতে গিয়েছিলেন। তাতেই বোকা বনে যান। রায়ান বল পেয়ে গতি বাড়িয়ে বক্সের মাথায় পৌঁছে যান। সামনে শুধুই পানামার গোলকিপার মার্কোস রেইস। বক্সের ভেতর ঢুকে রায়ান ঠান্ডা মাথায় পানামা গোলকিপারের পাশ দিয়ে বল জালের ভেতর পাঠান। ভারতীয় বংশদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলার রায়ানকে ভারতের নাগরিকত্ব দিয়ে জাতীয় দলে খেলানোর সিদ্ধান্তটা কতটা সঠিক ছিল, সেটা প্রমাণ হল পানামা ম্যাচে। ভুটান ও হংকংয়ের পর পানামা ম্যাচে ভারতের জার্সিতে রায়ানের এটা তিন নম্বর গোল।
বিরতিতে ১-০ গোলে এগিয়ে থাকার তৃপ্তি নিয়ে সাজঘরে ফিরেছিলেন ভারতীয় ফুটবলাররা। খালিদ দ্বিতীয়ার্ধেও নিজের দলের খেলার ধরন বদলাননি। আক্রমণাত্মক খেলা বজায় রেখেছিল তাঁর ফুটবলাররা। অন্যদিকে, ভারতের কাছে গোল খেয়ে পানামা কোচ টমাস ক্রিস্টিয়ানসেনের জাত্যাভিমানে আঘাত লাগাটা স্বাভাবিক। তিনি বিরতিতে পানামা ফুটবলারদের গোল শোধের কিছু টিপস দিয়ে থাকতেই পারেন। কারণ দ্বিতীয়ার্ধে পানামাকে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ঝাঁজ বাড়িয়ে খেলতে দেখা যায়। তাও তারা ভারতের জমাট রক্ষণ ভেঙে সমতা ফেরানোর গোল পাচ্ছিল না। বরং ভারতের রায়ান, মনবীররা দু’টি ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গোল পাওয়ার জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। অল্পের জন্য তাঁদের লক্ষ্যপূরণ হয়নি।
খেলার গতির বিরুদ্ধে ভারতীয় ফুটবলারদের মুহূর্তের অসতর্কতায় আচমকা গোল পেয়ে যায় পানামা ৬৮ মিনিটে। ভারতের অর্ধে ডানপ্রান্তে বল পেয়ে এডুয়ার্ডো আন্তোনিও বাড়িয়ে দেন মাঝমাঠের জায়গায় বদলি হিসেবে নামা ওমর ভ্যালেন্সিয়াকে। তিনি বল ধরেই সামান্য বাঁদিকে সরে গিয়ে ৩০ গজ দূর থেকে চকিতে বাঁপায়ে উঁচু শট নিলে, তা গোলকিপার গুরপ্রীতকে দাঁড় করিয়ে রেখে গোলে ঢোকে। আপুইয়া শট নেওয়ার সময় বাধা দেওয়ার কোনও সুযোগও পাননি।
পানামা সমতা ফেরানোর পর জয়ের গোল পেতে বাড়তি তাগিদ দেখালেও ভারতীয় রক্ষণ সতর্ক ও গোটা দলের শেপ-শৃঙ্খলা বজায় থাকায়, তারা সে লক্ষ্য সফল হয়নি। উল্টোদিকে, গোল হজম করলেও ভারতের কোচ খালিদ জামিল নিজের ফুটবলারদের খোলসে গুটিয়ে নেননি। বরং আক্রমণ, মাঝমাঠ ও রক্ষণে ফুটবলার বদল করে দলে তরতাজা ভাব বজায় রাখেন। ম্যাচের শেষদিকে মনবীর গোল করার যে সুযোগটা পেয়েছিলেন, তা কাজে লাগাতে পারলে পানামার বিরুদ্ধে সদ্য বিশ্বকাপে খেলে আসা দলকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে ফেলত ভারত। তবে এই ১-১ গোলে ম্যাচ শেষ করাটা কম কৃতিত্বের নয় ভারতের পক্ষে। ৩ অক্টোবর যুবভারতীতে ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে ভারতীয় দল। পানামার বিরুদ্ধে ভারতের এই খেলা ব্রাজিল কোচ কার্লোস আনসেলোত্তি দেখে থাকলে, তিনি এখন থেকে নিজের দলকে তৈরি করবেন ম্যাচ জেতার লক্ষ্যে।
ভারত: গুরপ্রীত, অভিষেক, আনোয়ার, বিজয়, আকাশ(পরমবীর), আপুইয়া, রিকি(অনিরুদ্ধ), বিক্রমপ্রতাপ(এডমুন্ড), রায়ান(সাহাল), আশিক(জয়), মনবীর।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
