মুম্বই ১(নৌফাল) মোহনবাগান ০
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: বেঙ্গালুরু এফসির সঙ্গে গোলশূণ্য ড্র করার পর জয়ে ফিরতে মরিয়া ছিলেন মোহনবাগান এসজির চিফ কোচ সের্জিও লোবেরা। ম্যাচের আগেরদিন সাংবাদিক সম্মেলনে প্রচারমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ইন্টারন্যাশানাল ব্রেকের আগে লিগ টেবিলের শীর্ষে থাকতে চান মুম্বই ম্যাচ থেকে ৩ পয়েন্ট তুলে নিয়ে। কিন্তু শুক্রবার যুবভারতীর মাঠে মুম্বইয়ের কাছে ০-১ গোলে হেরে সেই লক্ষ্যপূরণ হল না। বরং ম্যাচটা হেরে ৬ ম্যাচে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে নেমে গেল মোহনবাগান। সেখানে ৬ ম্যাচে ১৪ পয়েন্ট নিয়ে লিগ শীর্ষে উঠলে এল মুম্বই। ৬ ম্যাচে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে জামশেদপুর গোলপার্থক্যের সুবাদে।
আইএসএলে শেষবার ঘরের মাঠে কাপ ফাইনালে মুম্বইয়ের কাছেই হেরেছিল মোহনবাগান এসজি ২০২৪ সালের ৪ মে। মোহনবাগানের তৎকালীন কোচ ছিলেন হাবাস। মুম্বইয়ের কোচ ছিলেন বর্তমানে যিনি দায়িত্বে আছেন সেই পিটার ক্র্যাটকি। তারপর আইএসএলে হোসে মোলিনা জমানা সহ চলতি মরশুমে লোবেরার কোচিংয়ে ৪ ম্যাচ ধরে যুবভারতীতে টানা ১৮ ম্যাচ অপরাজিত থাকার পর আবার তাঁর কাছেই হার লোবেরার সবুজ মেরুন ব্রিগেডের।
প্রতিপক্ষ মুম্বই সিটির শক্তি মাথায় রেখে লোবেরা ৪-২-৩-১ ছকে দল সাজান আক্রমণ ও রক্ষণের ভারসাম্য বজায় রেখে। প্রতি ম্যাচের মতো মুম্বইয়ের বিরুদ্ধেও ৪ ব্যাকের সামনে আপুইয়া ও অনিরুদ্ধকে রাখেন লোবেরা প্রতিপক্ষের আক্রমণ মাঝমাঠেই থামিয়ে দিতে। মুম্বই দলের মাঝমাঠে জনি কাউকোর মতো অভিজ্ঞ ফুটবলার থাকায়, তাঁকে ছেড়ে রাখার বিলাসিতা দেখাননি বাগান কোচ। তবে আক্রমণ সচল রাখতে উইং দিয়ে অনেক বেশি ওভারল্যাপে ওঠার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন তিনি দুই উইং ব্যাক অভিষেক ও শুভাশিসকে। একইসঙ্গে বারবার প্রান্ত বদল করে মুম্বই রক্ষণকে ব্যস্ত রাখার কাজটা চালিয়ে যান লিস্টন ও কামিংস। দিমিত্রিকে একটু পিছন থেকে খেলিয়ে ম্যাকলারেনকে সামনে রেখে বাজিমাত করতে চেয়েছিলেন লোবেরা। কিন্তু বারবার প্রতিপক্ষ বক্সের সামনে পৌঁছেও মুম্বই রক্ষণব্যুহ ভাঙতে পারেনি বাগান। উপরন্তু মিস পাসের ছড়াছড়ি।
এটাই মুম্বইকে ধীরে হলেও খেলায় ফেরার সুযোগ করে দেয়। মুম্বই কোচ পিটার ক্র্যাটকি শুরু থেকে কাছাখোলা আক্রমণে যাওয়ার কৌশল নেননি। আগে মোহনবাগানের প্রাথমিক আক্রমণ সামলে প্রথম ১৫ মিনিট প্রতিপক্ষকে মেপে নেওয়ার নির্দেশ যে তিনি তাঁর ফুটবলারদের দিয়েছিলেন, সেটা বোঝা গেছে মুম্বইয়ের খেলার ধরন দেখে। ক্র্যাটকির নেওয়া প্রতিআক্রমণনির্ভর ফুটবলের কার্যকরীতাই মুম্বইকে গোল করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
২১ মিনিটে বাঁ প্রান্ত দিয়ে বল নিয়ে উঠে এসে নৌফাল বক্সে ঢুকে পড়ে বাঁপায়ে শট নিলে তৎপরতার সঙ্গে তা ধরে নিয়ে দলের পতন রোখেন মোহনবাগান গোলকিপার বিশাল। পরের মিনিটে গোল করে এগিয়ে যাওয়ার নিশ্চিত সুযোগ হাতছাড়া করে মুম্বই। আকাশ মিশ্রর বাড়ানো পাস পেরিরা দিয়াজের পা ঘুরে ডানদিকে ফাঁকায় ছাংতের কাছে চলে গেলে, তিনি সামনে অনেকটা ফাঁকা জমি পেয়ে যান। গোলকিপার বিশাল ছাড়া আর কেউ ছিলেন না প্রতিরোধ করতে। বিপদ বুঝে গোল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন গোলকিপার বিশাল বাধা দিতে। ছাংতের শট রুখেও দিলে বল শূণ্যে উঠে গোলের দিকে চলে যাচ্ছিল। সেই বল গোললাইনে বল দখলের লড়াইয়ে আকাশ মিশ্রকে হেডে পরাস্ত করে গোল খাওয়ার হাত থেকে দল বাঁচান মেহতাব।
সাময়িক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও মোহনবাগানের জন্য সেটা স্থায়ী হল না। বারবার আক্রমণ তুলে এনে বাগান রক্ষণের ওপর চাপ তৈরি করছিল মুম্বই। তার ফল পেয়েও গেল। ২৮ মিনিটে নৌফালের গোলে এগিয়ে যায়। ডানপ্রান্তে ছাংতে বল ধরে আলবার্তোকে শরীরের ঝটকায় টলিয়ে দিয়ে পাশে পেরিরা দিয়াজকে দিলে, তিনি সেটা বাড়িয়ে দেন বক্সের মাথায় দাঁড়ানো জনি কাউকোকে। আলতো টোকায় কাউকো তাঁর ট্রেডমার্ক পাসে বলটা ঠেলে দিলেন বাঁদিকে ওত পেতে থাকা নৌফালকে। বল ধরে নৌফাল ডানপায়ের গড়ানো কোনাকুনি শটে গোলকিপার বিশালের পাশ দিয়ে বল পাঠান গোলের ভেতর।
৪০ মিনিটে সমতা ফেরানোর খুব কাছে এসে গিয়েছিল মোহনবাগান। বাঁদিক থেকে দিমিত্রির ভাসানো বলে কামিংসের হেড পোস্ট ঘেঁষে গোলে ঢোকার মুখে, ঝাঁপিয়ে পড়ে বের করেন মুম্বই গোলকিপার লাচেনপা। এর ২ মিনিটের মধ্যে আরও দুটো সেভ করে দলের লিড অক্ষত রেখে দেন গোলকিপার লাচেনপা।
রক্ষণের নড়ূবড়ে ভাবে ৪৫ মিনিটে মোহনবাগান দ্বিতীয় গোল হজম করে ফেলত, যদি না গোলকিপার বিশাল অতিমানবিক হয়ে উঠে চলতি আইএসএলের দুরন্ত সেভ না করলে। প্রথমে ছাংতের শট রুখে দেন বিশাল ব্লক করে। আলগা বল বক্সের মাথায় চলে গিয়েছিল জর্জ ওর্তিজের পায়ে। তাঁর নেওয়া শট মাটি থেকে চকিতে লাফিয়ে উঠে ক্লিয়ার করে দলকে লড়াইয়ে রাখেন বিশাল।
বিরতির পর জোড়া বদল করেন বাগানের হেড স্যার লোবেরা। ম্যাচের প্রথম মিনিটেই চোট পেয়েছিলেন অনিরুদ্ধ থাপা। তাতে সাচ্ছন্দে ছিলেন না ম্যাচে। তাই তাঁকে তুলে দীপক টাংরিকে নামান তিনি। আক্রমণের ঝাঁজ অক্ষুন্ন রাখতে কামিংসের জায়গায় রবসনকে। ৫৯ মিনিটে সুবিধাজনক অবস্থায় বল পেয়েও ম্যাকলারেন সাইডনেটে শট মেরে সমতা ফেরানোর সুযোগ হাতছাড়া করেন। ৬৩ মিনিটে দিমিত্রি বল জালে জড়ালেও,অফসাইডের কারণে গোল দেননি রেফারি। চেপে ধরেছিল মোহনবাগান গোল শোধে। ৯৫ মিনিটে বক্সের ভেতর গোলের ৮ গজ দূরে ফাঁকায় বল পেয়েও দুর্বল শট মেরে মুম্বই গোলকিপার লাচেনপার হাতে তুলে দেন রবসন। ক্ষমার অযোগ্য মিস। সারা ম্যাচে ১৭টা কর্নার পেয়েও একটাও কাজে লাগাতে না পারার খেসারত দিল বাগান।ম্যাচ শেষে মুম্বইয়ের বিক্রমপ্রতাপের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন মোহনবাগানের আলবার্তো ও শুভাশিস। তবে সতীর্থ ফুটবলাররা তাঁদের দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যাওয়ায় ঘটনা বেশিদূর গড়ায়নি।
মোহনবাগান: বিশাল, অভিষেক, মেহতাব(মনবীর), আলবার্তো, শুভাশিস, অনিরুদ্ধ(টাংরি)(সাহাল), আপুইয়া, লিস্টন, কামিংস(রবসন), দিমিত্রি, ম্যাকলারেন।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
