মুনাল চট্টোপাধ্যায়: গত বেশ কয়েকটা মরশুম ধরে কলকাতা ডার্বিতে ফেবারিট তকমা গায়ে এঁটে খেলতে নামতো মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। সবুজ মেরুন মেরুন সদস্য-সমর্থক থেকে কর্তারা পর্যন্ত ধরেই নিতেন তাঁদের দল ইস্টবেঙ্গলকে হারাবে। আলোচনা হত কত গোলে হারাবে, সেটা নিয়ে। সেই ছবিটা এখন বদলে গেছে গত মরশুমে ইস্টবেঙ্গল আইএসএল জেতার পর থেকে। তারওপর ডুরান্ড কাপের গ্রুপ লিগের খেলায় ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে মোহনবাগান জেতার পর সবুজ মেরুন সমর্থকদের মনে হয়েছিল, আগের আধিপত্য বুঝি এখনও বজায় আছে। কিন্তু সেই ভুলটা ভেঙে দেন ইস্টবেঙ্গল কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস ডুরান্ড কাপের ডার্বি ফাইনালে মোহনবাগান এসজিকে দুরমুশ করে ৪-০ গোলে হারিয়ে।
সেই বিশ্রি হারের রেশ যেন মোহনবাগান শিবির যেন কাটিয়ে উঠতে পারছে না কিছুতেই। আইএফএ শিল্ডে অংশ নেওয়ার আগে কলকাতা ফুটবল লিগের ডার্বিতে সিনিয়র দলের ফুটবলারদের খেলিয়েও বাগান ব্রিগেড জিততে পারেনি ইস্টবেঙ্গলের রিজার্ভ টিমের ফুটবলারদের বিরুদ্ধে। মোহনবাগান ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরার লক্ষণটা তখন থেকেই নজরে আসছে খেলায়। শিল্ডের ম্যাচেও তার প্রভাব পড়েছে। গ্রুপ লিগের প্রথম ম্যাচে শ্রীনিধি ডেকানের বিরুদ্ধে জেতার পর মোহনবাগানের খেলা কেমন যেন ছন্নছাড়া। সবচেয়ে বড় কথা গোলকানা তকমাটা গায়ে লেগে গেছে ওই ম্যাচের পর থেকে। গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচে নর্থ ইস্টের বিরুদ্ধে জিততে পারেনি গোল করে এগিয়ে গিয়েও। বরং গোল খেয়ে ম্যাচ ড্র করে।
মোহনবাগান স্ট্রাইকিং লাইনে ফিনিশিংয়ের অভাবটা স্পষ্ট। এই কারণে সেমিফাইনালে পাঞ্জাব এফসির বিরুদ্ধে জিততে কালঘাম ছুটেছে। শেষপর্যন্ত কোনও গোল করতে না পারায় টাইব্রেকারে ম্যাচ গেলে গোলকিপার বিশাল কাইথের বিশ্বস্ত হাতে ভর করে শিল্ড ফাইনালে পৌঁছয় মোহনবাগান। সেখানে ইস্টবেঙ্গল নর্থ ইস্টের বিরুদ্ধে গোলের সুনামি বইয়ে দিয়ে ৭-২ গোলে জিতে ফাইনালে যাওয়ায় বাগান বাহিনীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে বলাই বাহুল্য। একইসঙ্গে সবুজ মেরুন কোচ পানাগয়টিস ডিমপেরিস (পানোস) যে চাপে আছেন বলাই বাহুল্য। কারণ বাজারে একটা জোর রটনা আছে, শিল্ড ফাইনালে বাজে ফল করলে পানোসের চাকরি রাখা দায় হবে। কারণ ইতিমধ্যেই সেমিফাইনাল ম্যাচে টাইব্রেকারে জেতার পর অসন্তোষ প্রকাশ করে পানোস বলেছিলেন, তাঁর দল আইএসএল খেলার জন্য এখনও তৈরি নয়।
প্রশ্ন একটাই, বৃহস্পতিবার শিল্ড ফাইনাল ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলের মুখোমুখি হওয়ার জন্য মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট কি আদৌ তৈরি বলে মনে করেন পানোস? বাগান কোচের ভাঙবেন , তবু মচকাবেন না ধরনের উত্তর আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে, ‘ তৈরি থাকতেই হবে, সেটা শিল্ডের ফাইনালই হোক, বা ১২ অক্টোবরের আইএসএলের প্রথম ম্যাচও হোক। ডার্বি বিশেষ ধরনমের ম্যাচ। আগের ম্যাচগুলোয় দল কেমন খেলেছে, কী ফল হয়েছে, এগুলো ম্যাটার করে না ডার্বিতে। এই ম্যাচে মর্যাদার লড়াই জড়িয়ে থাকে। ক্লাবের সম্মান ও সমর্থকদের আবেগ। তাই ম্যাচটা জেতার জন্য ঝাঁপাতে সকলে তৈরি। সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে ফুটবলাররা কৌশলগত ও মানসিকভাবে।’
জাতীয় দলে মোহনবাগান ফুটবলাররা ভাল খেলেছে। বিশেষ করে মনবীর, অনিরুদ্ধ থাপা, সাহালরা। তাঁরা দলে যোগ দেওয়ায় মোহনবাগানের আক্রমণে ধার কি বাড়বে? গোলখরা মিটবে? পানোসের প্রতিক্রিয়া, ‘ মনবীর, থাপা, সাহাল, অভিষেকরা জাতীয় দলের হয়ে পানামা, উরুগুয়ে ও ব্রাজিল ম্যাচে যে ফুটবল খেলেছে, তাতে গর্বিত। অবশ্যই ওরা যোগ দেওয়ায় দলের শক্তি বাড়বে। গত দু’ম্যাচে প্রত্যাশামফিক গোল দল পায়নি বলে যে খুব খারাপ খেলেছে এমন নয়। সুযোগ তৈরি হয়েছে, তবে ফিনিশিংয়ে দুর্বলতা ছিল। সেই সমস্যা ডার্বিতে থাকবেই, এমন ভাবছি না। বরং ফুটবলাররা সেরা দেবে ম্যাচ জিততে।’
ম্যাচ টাইব্রেকারে গেলে কি গোলের নীচে বিশাল কাইথ থাকায় বাড়তি সুবিধা পাবেন ম্যাচ জিততে? তাছাড়া ইস্টবেঙ্গলের এডমুন্ডের গত ডার্বিতে করা হ্যাটট্রিক ও শিল্ড সেমিফাইনালে ডেভিডের হ্যাটট্রিক কি আপনাকে ফাইনালের ডার্বির আগে ভাবাচ্ছে? পানোসের সোজাসাপ্টা উত্তর, ‘ বিশাল নিঃসন্দেহে বড় মাপের গোলকিপার। কিন্তু টাইব্রকারে নার্ভ ঠিক করে যা গোল করে তাদের অবদান কিছু কম নয়। আমি অবশ্য টাইব্রেকার পর্যন্ত ম্যাচ গড়াক এটা চাই না। ম্যাচের নিষ্পত্তি নির্ধারিত সময়ে শেষ হলে বেশি খুশি হব। অবশ্যই মোহনবাগানের ট্রফি জয়ে। আর ইস্টবেঙ্গলে কারা হ্যাটট্রিক করেছে, সেটা শুধু বলছেন, আমাদের দলে ছাংতে, সাহাল, মনবীরেরও হ্যাটট্রিক আছে,এটা ভুলে যাবেন না।’
দলের অন্যতম গোলস্কোরার জেমি ম্যাকলারেন চোটের জন্য মাঠের বাইরে রয়েছেন। সাইডব্যাক আশিস রাই সেমিফাইনালে পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে ম্যাচের শুরুতেই চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন। আশিস বেরিয়ে যেতেই বাকি সময়ের ম্যাচে মোহনবাগানের ছন্দপতন ঘটেছিল। কোচ পানোস বলেছিলেন, আশিস বেরিয়ে যেতে তাঁর ফর্মেশন ও স্ট্র্যাটেজি নষ্ট হয় যায়, তাতেই খেলায় ছন্দপতন ঘটে। আশিস ফিট কিনা সেটা পরিষ্কার করে কিছু বললেন না পানোস ডার্বির আগে। আশিস না খেললে পানোসের যে খুব একটা বড় সমস্যা হবে এমন নয়, কারণ জাতীয় দল থেকে ফিরে ডার্বিতে খেলার জন্য তৈরি অভিষেক সিং। অবশ্য কতটা তারতাজা থেকে সেরা দিতে পারবেন, সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু ম্যাকলারেন না খেলতে পারলে তাঁর গোল স্কোরিং ক্ষমতার দিকটা কতটা লি হ্যারি এরউইন, ড্রাজিচ, বা জেলকোভিচরা পূরণ করতে পারবেন, সেটাই এখন দেখার। তাছাড়া শিল্ড ফাইনাল ডার্বিটা ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে সবুজ মেরুন জার্সি গায়ে চাপানো মিগুয়েলের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
