মুনাল চট্টোপাধ্যায়: ব্রাজিল জাতীয় দলের ডিফেন্ডার মারকুইনহোস কলকাতার অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলন বক্তব্য রাখছিলেন। একটু আগেই সাংবাদিক সম্মেলন কক্ষে চলে এসেছিলেন ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচ কার্লেস আনসেলোত্তি। মঞ্চের ধারে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ নিয়ে নিজের দলের ফুটবলার মারকুইনহোসের বিশ্লেষণ শুনছিলেন ব্রাজিল কোচ আনসেলোত্তি। মাঝেমধ্যে মারকুইনহোসের বক্তব্য শুনে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছিলেন তিনি। কথা শেষ করে মারকুইনহোস মঞ্চ থেকে নেমে কোচ আনসেলোত্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ব্রাজিল কোচকে সামনে পেয়ে চোখা চোখা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন দেশ ও বিদেশের প্রচারমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। বিশেষ করে ব্রাজিল কেন ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁর কোচিংয়ে ব্যর্থ, এই প্রশ্নেরও সম্মুখীন হতে হল। কিন্তু ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল মেজাজে সেসব খোঁচা মারা প্রশ্নের উত্তর দিলেন আনসেলোত্তি বিচক্ষণতার সঙ্গে। শুধু তাই নয়, ভারতে ফুটবল সংস্কৃতির অভাব আছে, সেই বক্তব্য বজায় রেখেও আনসেলোত্তি ভারতীয় ফুটবল দল নিয়ে কোনও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য দেখানোর মনোভাবের পথে হাঁটলেন না। বরং সমীহ দেখানোর ভঙ্গিতে বলেন, ভারতীয় দলকে সম্মান জানাতে দ্বিধা করছেন না। ওরা পানামার বিরুদ্ধে লড়াকু ফুটবল উপহার দিয়েছে। সেটা মাথায় রেখেই জেতার জন্য ঝাঁপাবে ব্রাজিল ফুটবলাররা।
ব্রাজিল কোচ আনসেলোত্তি বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুরুতেই প্রচারমাধ্যমকে শুভেচ্ছা জানান, সুপ্রভাত, নমস্তে বলে। প্রথমেই তাঁর কাছে প্রশ্ন রাখা হয়, ভারতের মাটিতে খেলতে আসা নিয়ে আপনার কী অনুভূতি? আনসেলোত্তির উত্তর,‘ ভারতে আসা এই প্রথম। এই শহরে পা দেওয়ার পর দেখছি প্রচুর ফুটবলপ্রেমী রয়েছেন। ব্রাজিল ফুটবল দল কলকাতায় আসায় তাঁরা যে কতটা উচ্ছ্বসিত, সেটাও বুঝতে পারছি। তাঁরা শনিবার গ্যালারিতে ভিড় জমাবেন একটা উপভোগ্য ম্যাচ দেখতে।’
কলকাতায় খেলতে আসার আগে আপনি মন্তব্য করেছিলেন, ভারতে ফুটবল সংস্কৃতি নেই। আপনি কলকাতায় আসার পর এখনও কি সেই বক্তব্যে আটকে আছেন? আনসেলোত্তির প্রতিক্রিয়,‘ এখনও নিজের বক্তব্য থেকে সরছি না। যেটা বাস্তব সেটাই বলেছি। ভারতের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ফুটবল এখনও সবচেয়ে বড় খেলা নয়। তার মানে এই নয় যে ফুটবলের গুরুত্ব নেই। ক্রিকেটের মতো ফুটবলও দুরন্ত খেলা। তবে ক্রিকেটের সঙ্গে এখানকার মানুষ অনেক বেশি পরিচিত এবং সেটা তাঁদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। কিন্তু এটা এইমুহূর্তে আলোচ্য বিষয় নয়। বরং এটা বলতে চাই, আমরা কলকাতায় এসে খুব খুশি। যাঁরা মাঠে এসে কিংবা টেলিভিশনের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে আমাদের ম্যাচ দেখার সুযোগ পাবেন, তাঁদের সামনে আমাদের দলের মান তুলে ধরতে চাই। আশা করছি, তাঁদের জন্য এটি একটি দুর্দান্ত সন্ধ্যা হয়ে উঠবে। আমাদের মতো দলের এই ধরনের সফর ভারতের ফুটবল সংস্কৃতিতে কোনও পরিবর্তন আনতে পারে কি না, সেটা বলা কঠিন। আমি মনে করি, এটা মূলত সংস্কৃতিরই একটা অংশ। পরিবর্তন আনা সম্ভব কি না, আমার পক্ষে এখনই বলা বেশ কঠিন।। তবে ভারত ফুটবলেও প্রতিযোগিতা করার চেষ্টা করছে, খেলাধুলার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তার জন্য শুভকামনা রইল।’
আপনি বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে প্রচুর সাফল্য পেয়েছেন। সেসব ম্যাচে অসংখ্যবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মুখোমুখিও হয়েছেন। কিন্তু সেসসব পরিস্থিতিতে আপানাকে কখনও প্যানিক করতে দেখা যায়নি। আপনি সবসময় ধীর স্থির থেকেছেন। কীভাবে নিজেকে এত শান্ত রাখেন? আনসেলোত্তি হেসে বলেন, ‘ম্যাচ চলাকালীন শান্ত থাকার ব্যাপারটা আমার চরিত্রেরই একটা অংশ। আমি এমনই। সাধারণত আমি খুব শান্ত এবং ধৈর্যশীল। আর একজন কোচ হিসেবে ফুটবলে ধৈর্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই পেশায় অনেক সময়ই আপনাকে ধৈর্য ধরে সঠিক পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়।’
ভারতীয় ফুটবল দলের থেকে র্যাঙ্কিংয়ে ব্রাজিল অনেক এগিয়ে। বলতে গেলে কোনও তুলনাই চলে না। এমন একটা দলের মোকাবিলা করার জন্য বিশেষ ধরনের স্ট্র্যাটেজি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে কি? ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটা কি কেক ওয়াক হবে, মানে সহজেই জয় আসবে? নরওয়ে ম্যাচে হালান্ডকে আটাকানোর জন্য ছক কষতে হয়েছিল আপনাকে। ভারতীয় কোনও স্ট্রাইকার নিয়ে কি আদৌ আপনার কোনও মাথা ব্যথা আছে? এই প্রশ্নে ব্রাজিল কোচ আনসেলোত্তির কথায় কোনও শ্লেষ ঝরে পড়েনি। ভারতীয় ফুটবল দলকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টাও করলেন না। বরং ভারতীয় দলকে সম্মান দেখিয়া বলেন,‘ আমরা ভারতের শেষ ম্যাচটি দেখেছি, পানামার বিরুদ্ধে। পানামা দলের আক্রমণভাগও যথেষ্ট গতিশীল ছিল। ডিফেন্সেও স্ট্রং। তবু তাদের বিরুদ্ধে গোল পেয়েছে। গোল করেন রায়ান উইলিয়ামস। ভারতের এই স্ট্রাইকার আমাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন। তাই অবশ্যই তাকে নিয়ে ভাবছি এবং তার সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছি। ভারতীয় দলের প্রতি সম্মান রেখে তাদের শক্তি, গুণমান এবং খেলোয়াড়দের বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করছি। সেই অনুযায়ী ম্যাচের আগে নিজেদের প্রস্তুত করছি।’
আপনি আগেই বলেছেন, ব্রাজিলের কাছে ‘ফ্রেন্ডলি’ ম্যাচ বলে কিছু হয় না। ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে মনোভাব কি একইরকম থাকবে? আনসেলোত্তির জবাব, ‘ হ্যাঁ, ব্রাজিল জাতীয় দলের কাছে, কোনও ম্যাচই কখনও শুধুমাত্র ‘ফ্রেন্ডলি’ ম্যাচ নয়। তাই এই ম্যাচটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা নতুন একটি চক্রের শুরুতে রয়েছি, নতুন খেলোয়াড়দের নিয়ে দল গড়ে নিজেদের আরও উন্নত করার চেষ্টা করছি। প্রতিপক্ষকে সবসময়ই সম্মান করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ ভারত। ভারতকে যথেষ্ট গুরুত্ব ও সম্মান দিয়েই ম্যাচ জেতার লক্ষ্যে মাঠে নামব।’
এর আগে ক্লাব কোচিংয়ে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছেন। এখন ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাওয়াটা কতটা উত্তেজনাপূর্ণ? আনসেলোত্তি বলেন, জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ করার ধরনটা ক্লাবের থেকে একেবারেই আলাদা। এখানে প্রতিদিন অনেকক্ষণ অনুশীলন করানোর সুযোগ থাকে না। জাতীয় শিবির হলে ফুটবলারদের পাওয়া যায় একসঙ্গে। তাই খেলোয়াড় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরও বেশি মনোযোগী হতে হয় এবং সঠিক খেলোয়াড়দের নির্বাচন করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। হাতে কিছুটা বেশি সময় নিয়ে কাজটা করতে হয়। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে। ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ করা সত্যিই বিশেষ এক অনুভূতি। কারণ ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী জাতীয় দল। সেই দলের খেলোয়াড়দের অনুশীলন করানো এবং তাদের নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাওয়া সত্যিই খুবই আনন্দের ও রোমাঞ্চকর।’
২০০২য়ে শেষবার ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতেছিল। তারপর ২০২৬ পর্যন্ত ব্রাজিল বিশ্বকাপ জেতেনি। ২০২৬য়ে এবার কী সমস্যা হয়েছিল, যার কারণে দল প্রত্যাশিতভাবে পারফর্ম করতে পারেনি? আনসেলোত্তির চাঁচাছোলা উত্তর, ‘২০০২য়ের পর কী হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না, কারণ তখন আমি এই দলের কোচ ছিলাম না। আমি ২০২৫ সালে ব্রাজিল জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়েছি। তবে এটুকু বলতে পারি, আমাদের কিছু সমস্যা ছিল, যেগুলো এক বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব হয়নি। এখন সেগুলোর সমাধানের রাস্তা খুঁজতে হচ্ছে। বিশ্বকাপের চরিত্র বদলেছে। এখন আর আগের মতো সহজ নয়। ফুটবল অনেক বদলে গিয়েছে এবং অন্যান্য জাতীয় দলও অনেক উন্নতি করেছে। আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি ও মতামত হল, ২০০২ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল যে প্রতিভা দেখাতে পেরেছিল, সেটা ছিল অসাধারণ। এক অন্য পর্যায়ের। ব্রাজিলে এখনও সেই প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু এখন শুধু প্রতিভা থাকলেই হয় না চাই দলগত সংহতির খেলাটাও। ফুটবল বদলে গিয়েছে। ছোট দলগুলিও অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়ে উঠেছে। তাই প্রতিভাবান খেলোয়াড় থাকলেই শুধু হবে না, তাদের নিয়ে একটি ভালো, শক্তিশালী এবং সংগঠিত দল তৈরি করতে হবে। শুধু ব্যক্তিগত প্রতিভার ওপর নির্ভর করলে এখন আর সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়।
চোটর জন্য রাফিনিয়া না থাকায় আক্রমণভাগে ভিনিসিয়াস জুনিয়ারের পাশাপাশি এনডরিক ও পেদ্রো, দু’জনকেই খেলানোর সুযোগ থাকছে ভারতের বিরুদ্ধে। তাঁদের মধ্যে কাকে ব্যবহার করবেন, তা কি আপনি ঠিক করেছেন? আনচেলত্তি জানলন, ‘এনডরিক ও পেদ্রো, দু’জনে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের খেলোয়াড়। এনডরিক খুবই তরুণ এবং অসাধারণ প্রতিভাবান। ওর গুণমান, শক্তি এবং গতিশীলতা নজর কাড়া। অন্যদিকে পেদ্রো একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় এবং তাঁর টেকনিকাল দক্ষতা খুবই ভালো। আমি পেদ্রোকে আগে ব্যক্তিগতভাবে খুব একটা চিনতাম না। কিন্তু তাকে দেখার পর বুঝেছি, ওর মধ্যে ভাল খেলা উপহার দেওয়ার ক্ষমতা আছে। তবে ভারতের বিরুদ্ধে কে খেলবে, প্রথম একাদশই বা কী হবে, সেটা নিয়ে আগাম কিছু বলতে চাই না।’
সাংবাদিক সম্মেলন শেষে আরও একবার কলকাতাবাসীকে তাঁদের শহরে পা রাখা মাত্র উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ধন্যবাদের পাশাপাশি ভারতীয় ফুটবল দলকে ভাল খেলার জন্য আগাম শুভেচ্ছা দিয়ে রাখলেন আনসেলোত্তি। একইসঙ্গে স্মরণীয় হয় থাকল ভারতীয় দলের চিফ কোচ খালিদ জামিলের সঙ্গে তাঁর সৌজন্য বিনিময়ের মন ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্তটা।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
