ইস্টবেঙ্গল ২(দিয়ামান্তাকোস-২) মোহনবাগান ১(অনিরুদ্ধ)
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: এমন জমজমাট রবিবাসরীয় ডার্বি শেষ দু’মরশুম কলকাতা দেখেছে বলে মনে পড়ছে না, যেখানে যুবভারতীতে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের ওপর অধিকাংশ সময় আধিপত্য দেখিয়ে ডুরান্ড কোয়ার্টারফাইনালে ২-১ গোলের জয় তুলে নিয়ে ইস্টবেঙ্গল চলে গেল সেমিফাইনালে। জোড়া গোল করে নায়ক ইস্টবেঙ্গলের দিমিত্রিয়স দিয়ামান্তাকোস। যাঁর পা থেকে এল গোল এল ৩৮ ও ৫২ মিনিটে। প্রথম গোলটা পেনাল্টি থেকে। পরের গোলটা মহেশ ও মিগুয়েলের পা ঘুরে আসা বলে দর্শনীয় হাফভলিতে। ৬৮ মিনিটে অনিরুদ্ধ থাপার গোলে সবুজ মেরুন শিবিরে কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও, সেটা যথেষ্ট ছিল না মোহনবাগানের পক্ষে হার বাঁচাতে।
ডার্বি জয়টা মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট একতরফা করে ফেলেছিল। কলকাতার মাঠে যুবভারতীতে ইস্টবেঙ্গল শেষ জয় পেয়েছিল ২০২৩ মরশুমের ডুরান্ড কাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে তৎকালীন কোচ কার্লেস কুয়াদ্রাতের কোচিংয়ে নন্দকুমারের চমকপ্রদ গোলে। সেবারই ডুরান্ড ফাইনালে ১০ জনে খেলে দিমিত্রি পেত্রাতোসের গোলে ফিরতি ডার্বি জিতে কাপ ঘরে তুলেছিল ফেরান্দোর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মোহনবাগান। এবার আর সেসুযোগ রইল না মোহনবাগানের সামনে, কোয়ার্টারফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের কাছ হেরে ছিটকে যাওয়ায়। ২০২৩ ডুরান্ড ফাইনালের পর কলকাতার মাঠে ৪ ম্যাচ পর বাগানের হার। মাঝে কার্লোস কুয়াদ্রাতের কোচিংয়ে ভুবনেশ্বরের মাঠে সুপার কাপে জেতার পর ইস্টবেঙ্গল আর কোনও ডার্বি জেতেনি বাগানের বিরুদ্ধে। লাল হলুদ সমর্থকদের সেই আক্ষেপটা মিটিয়ে দিলেন তাঁদের কোচ অস্কার, এবার ডুরান্ডের ডার্বি জিতে।
ম্যাচের আগে সাংবাদিক সম্মেলনে ইস্টবেঙ্গল কোচ অস্কার ব্রুজোঁ বলেছিলেন, গত মরশুম অতীত। এবার নতুন ইস্টবেঙ্গলকে দেখবেন সবাই ডার্বিতে। সেটা যে ফাঁকা আওয়াজ ছিল না, সেটা লাল হলুদ ফুটবলারদের ম্যাচের শুরু থেকেই গতিময় ফুটবল দেখে বোঝা গেছে। অস্কার যে একজন ভাল ট্যাক্টিশিয়ান, সেটা এর আগেও প্রমাণ মিলেছিল তাঁর দলকে খেলানোর ধরনে। গত মরশুমে অবশ্য তাঁর দলকে খেলানোর কৌশলে রক্ষণ জমাট করে আক্রমণে যাওয়ার প্রবণতাই বেশি নজর কাড়ত। রবিবারের ডুরান্ড কোয়ার্টারফাইনাল ডার্বিতে অস্কার কিন্তু শুরু থেকেই হাঁটেন সার্বিক আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার রাস্তায়। অস্কার বলেছিলেন, তিনি মোহনবাগানের দুর্বলতা জানেন। খেলায় সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েও দিলেন।
সেটা হল সবুজ মেরুন ফুটবলারদের ফিটনেসের অভাব। মোহনবাগানের হেড স্যার মোলিনা নিজেও এই ভয়টা পেযেছিলেন। কোনওরকম রাখঢাক না করেই বলেছিলেন, ফুটবলারদের ফিটনেসের অভাব ভোগাতে পারে। সেটাই হল। তার সঙ্গে মোহনবাগানের প্রথম গোল হজমের কারণ হল অতিরিক্তি আত্মবিশ্বাস। সবুজ মেরুন ফুটবলারদের খেলায় তার ছাপটা ধরা পড়ছিল শুরু থেকেই। আসল গত দুমরশুম ধরে ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে একটা কুখ্যাত আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছিল বাগান বাহিনীতে। বিশেষ করে বাগান রক্ষণের ফুটবলারদের মনোভাবে। প্রথম গোল হজমের কিছু সময় আগে গোলকিপার বিশালের বাড়ানো বল নিজেদের বক্সের বাইরে ধরে অহেতুক দেরি করে মহেশকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ করে দিয়ে নিজেদের বিপদ প্রায় ডেকে এনেছিলেন টম আলড্রেড। সেটাই ছিল অশনি সঙ্কেত। একইসঙ্গে বলতেই হবে, মোহনবাগান রক্ষণে শুভাশিসের না থাকাটা একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে গেল। শুভাশিসের মতো পরিণত এক ডিফেন্ডারের অভাবটা পূরণ করতে পারেননি নবাগত অভিষেক সিং। টম, আলবার্তো, আশিসদের ত্রুটি ঢাকার কাজটা গত মরশুম ধরে একনাগাড়ে চালিয়ে গিয়েছিলেন শুভাশিস। শুভাশিস ছিলেন না, তার খেসারত দিতে হল বাগানকে।
মোলিনার নবীন ফুটবলার পাসাংকে খেলানোর পরীক্ষাটা যেখানে কার্যকর হল না, সেখানে ডার্বিতে অস্কারকে ম্যাচ জেতাতে বড় ভূমিকা নিলেন এডমুন্ড। বিপিনের উপস্থিতিটাও উল্লেখযোগ্য ইস্টবেঙ্গলের উইংয়ে।লাল হলুদের হেডস্যার অস্কারকে তাঁর মিডফিল্ড মার্শাল মিগুয়েল ও ডিফেন্ডাররা নিজেদের উজাড় করে দিলেন, রশিদের অভাব বুঝতে না দিয়ে। আর বুদ্ধি করে সল ও অন্যদের ব্যবহার করে অস্কার দখল নিলেন মাঝমাঠের। আর মোহনবাগান আক্রমণের ডানা ছেঁটে দিলেন দুটো উইংয়ে সাহাল ও লিস্টনকে ব্লক করে। ওখানেই বাজিমাত।
১৬ মিনিটের মাথায় কুঁচকির চোটের কারণে ইস্টবেঙ্গলের স্ট্রাইকার হামিদ আহদাদের বসে যাওয়াটা মনে হয়েছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট হবে অন্যদিক থেকে। সঠিক প্রিসিজন করে মাঠে না নামলে যা হয়। যেভাবে ডার্বির উত্তাপে তেতে গিয়ে তেড়েফুঁড়ে খেলা শুরু করেছিলেন হামিদ যুবভারতীতে লাল হলুদ সমর্থকদের দেখে, তাতেই চোটের শিকার হয়ে গেলেন। ওখানে সাময়িক লাল হলুদ ব্রিগেডের আক্রমণের ঝাঁজটা কিছুটা হলেও কমে যায়। ১৮ মিনিটে পরিবর্ত হিসেবে দিমিত্রিয়স দিয়ামান্তাকোস নামলেও তিনি হামিদের মতো কার্যকরী ভূমিকা নিতে কিছুটা সময় নেন। তারপর ঝলসে উঠে মোহনবাগানের রণতরীকে ডুরান্ড সাগরে ডুবিয়ে ছাড়লেন। সাজানো বাগান তছনছ হয়ে গেল দিয়ামান্তাকোসের জোড়া গোলে। যোগ্য দল হিসেবেই জিতল ইস্টবেঙ্গল। তাদের তারুণ্যের দৌড় ও ডিটারমিনেশনের কাছে মোলিনার মোহনবাগান আত্মসমর্পণ করল।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
