মুনাল চট্টোপাধ্যায়: এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের অবসান। জল্পনা একটা ছিলই। তার অবসান ঘটল সোমবার বিশ্বের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির ঘোষণায়। দু’দশকের বেশি সময় ধরে নীল সাদা জার্সিতে সারা বিশ্বকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখার পর আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক ও মেগাতারকা মেসি জানালেন, তিনি আর দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নেবেন না। ফিফা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর মনে হয়েছিল, মেসি আর দেশের হয়ে খেলবেন না। কিন্তু বাস্তবে সেটা ঘটেনি। মেসি ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপেও অংশ নেন। আর শুধু যে খেলেছিলেন তাই নয়, দুরন্ত ফর্ম দেখিয়ে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালেও তুলেছিলেন। তবে টানা দু’বার বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন সফল হয়নি মেসির ফাইনালে স্পেনের কাছে হারায়। মেসির আর কিছু দেওয়ার বা পাওয়ার ছিল না। আর সেকারণেই অবসর নিয়ে ফেললেন এবার মেসি পাকাপাকিভাবে।
সোমবার ইনস্টাগ্রামে মেসি জানিয়েছেন, স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের দু’দিন পরই অবসর নেওয়ার কথা ভেবে ফেলেন। আর সেটা আরও জোরালো হয় তাঁর বাবার মৃত্যুতে। মেসির বাবা এমাসের শুরুর দিকে মারা যান। তখনই বিশ্বের কিংবদন্তী ফুটবলার মেসি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন খেলা ছাড়ার। যদিও মেসি বলেছেন, আর্জেন্টিনার হয়ে আর না খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা মোটেই সহজ ছিল না। তাঁকে যথেষ্ট পীড়া দিয়েছে এই সিদ্ধান্ত নিতে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলা তিনি সবসময় উপভোগ করেছেন। তাঁর আর কিছু দেওয়ার ছিল না। তাই সরে দাঁড়ানোই সঠিক মনে করেছেন নতুন প্রজন্মকে তাঁদের দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ দিতে। ৩৯ বছর বয়সী মেসির মতে, তিনি আর্জেন্টিনা দল ছেড়ে যাচ্ছেন একরাশ মানসিক শান্তি নিয়ে। অবসরের সিদ্ধান্তটা তিনি নিয়েই ফেলেছিলেন ২১ জুলাই। শুধু সরকারি ঘোষণাটা এতদিনে করলেন। মেসি অবশ্য এমএলএসে ইন্টার মিয়ামির হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন।
ফিফা ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপে চোখের সামনে মেসিকে প্রথমবার আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে খেলতে দেখেছিলাম। আর্জেন্টিনার তৎকালীন কোচ পেকারম্যান বিশ্বকাপে নবীন মেসিকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারেননি। তাতেই আর্জেন্টিনা সাফল্য পায়নি। সেকথা পরে স্বীকারও করেছিলেন জার্মানির কাছে হারের পর সাংবাদিক সম্মেলনে আমার করা প্রশ্নে। তবে মেসি দমেননি তারপরও। বরং বিশ্বকাপ জেতার লক্ষ্যে নিজের সেরা দিয়ে গেছেন পরের বিশ্বকাপগুলোয়। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে জার্মানির কাছে হারের মেসির বুক ফেটে গিয়েছিল। হৃদয়ের ভেতরে রক্তক্ষরণ ঘটেছিল। রানার্স পদক গলায় পরার সময় মেসির গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়েছিল বেদনার অশ্রু। মেসি ২০১৬য় অবসর প্রায় নিয়েই ফেলেছিলেন। পরে তাঁকে বুঝিয়ে শুনিয়ে সেই সিদ্ধান্ত বদল করা হয়। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপটা মোটেই ভাল যায়নি মেসি ও আর্জেন্টিনার নিজেদের মধ্যে দলাদলির কারণে। তবে ২০২১য়ে আর্জেন্টিনার হয়ে কোপা আমেরিকা জয় মেসি ও আর্জেন্টিনার জন্য টার্নিং পয়েন্ট ছিল। অবশেষে মেসি ও আর্জেন্টিনাবাসী-ভক্তদের স্বপ্নপূরণ হয় ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সকে অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের পর টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ায়। সেই রূদ্ধশ্বাস ম্য়াচের সাক্ষী ছিলাম আমি কাতারের লুসেইল স্টেডিয়ামের গ্যলারিতে বসে।২০২৬ বিশ্বকাপের আসরও মাতিয়েছিলেন মেসি তাঁর অসাধারণ ক্রীড়ানেপুণ্য দিয়ে। তবে টানা দু’বার বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব হয়নি মেসি। আর তাই থেমে গেলেন পাকাপাকিভাবে।
মেসি ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন,‘ ২০২৬য়ে স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের পর থেকেই ভাবছিলাম, এবার থেমে যাওয়া উচিত। ভাবছিলাম, কীভাবে সবাইকে সেটা জানানো যায়। এমন একটা সিদ্ধান্ত সত্যি কষ্ট দেয়। আমি সবসময় নিজের সেরা দিতে চেষ্টা করেছি। সেটা গত কয়েকবছরে শুধু নয়, যখন আমরা অনেককিছু জিতেছি। তার আগেও একইরকম নিষ্ঠা ছিল। আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেশবাসী, সমর্থক ও ভক্তদর গর্বিত করার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি। এটাই সঠিক সময় সরে দাঁড়ানোর। নতুন প্রতিভাকে মেলে ধরার সুযোগ দেওয়ার। সবাইকে ধন্যবান আমাকে গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে উৎসাহ জোগানোর জন্য, প্রেরণা দেওয়ার কারণে। এখন থেকে গ্যালারি থেকে আমার জন্য চিৎকারটা খুব মিস করব। আমিও এখন থেকে আপনাদের মতো মাঠের বাইরে থেকে দলের জন্য গলা ফাটাব। ভাল ও খারাপ সময়ে। ধন্যবাদ আমার পরিবারকে সবসময় পাশে থাকার জন্য। কঠিন সময়ে সাপোর্ট দেওয়ায়। সতীর্থ ফুটবলার, কোচ, কোচিং স্টাফ, কর্তাদের সঙ্গে আমার ফুটবলজীবন কাটানোর সময়টা দারুন উপভোগ করেছি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমাকে আর্জেন্টাইন বানানোর জন্য। লেটস গো আর্জেন্টিনা।’
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি ২০৭ ম্যাচে করেছেন ১২৫ গোল। দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসির বিশ্বকাপের ৩৪ ম্যাচে গোল ২১টি। মেসির সিনিয়র দলর যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮। মেসির ঝুলিতে ২০২২ বিশ্বকাপ ছাড়াও কোপা আমেরিকা জয়ের পাশাপাশি ২০০৮ বেজিং অলিম্পিক্সে সোনার পদকপ্রাপ্তিও রয়েছে।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
