ইস্টবেঙ্গল ৪(বিপিন, এডমুন্ড-৩) মোহনবাগান ১(মনবীর)
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: যুবভারতীর রং লাল হলুদ। মশালের তেজে পুড়ে ছাড়খাড় সাধার বাগান। এডমুন্ডের হ্যাটট্রিক ও বিপিনের গোলের টর্পেডো হানায় সবুজ মেরুনের নৌকাডুবি। ডুরান্ড কাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে সাহালের গোলে ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়েছিল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। রবিবার যুবভারতীতে ফাইনালের ডার্বিতে মোহনবাগানকে দুরমুশ করে ৪-১ গোলে হারিয়ে ডুরান্ড কাপ জেতার সঙ্গে সঙ্গে মধুর প্রতিশোধ নিল লাল হলুদ বাহিনী। এমন আধিপত্য নিয়ে মোহনবাগানকে হারাতে ইস্টবেঙ্গল ব্রিগেডকে সাম্প্রতিককালে দেখা যায়নি। ২০০৪য়ের পর আবার ডুরান্ড কাপ জিতল ইস্টবেঙ্গল ২২ বছর পর। ২০০৪য়ে জয় পেয়েছিল লাল হলুদ ব্রিগেড দিল্লির আম্বেদকারে চন্দন দাসের ২ গোলে। আর এবার প্রথমবার কলকাতার মাটিতে। ২০২৩ ডুরান্ড কাপের গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচে মোহনবাগানকে ইস্টবেঙ্গল হারালেও ফাইনালের ডার্বিতে ফেরান্দোর কোচিংয়ে সবুজ মেরুন জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। এবার ঘটল ঠিক উল্টোটা, প্রথম ডার্বি হেরে ফাইনাল ডার্বি জিতে মোহনবাগানের ১৭ তম ডুরান্ড জযের রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলল লাল হলুদ। ২০১৫য় কলকাতা লিগে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ৪-০ গোলে জেতার পর এটাই সবচেয়ে বড় জয় লাল হলুদের কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের কেরামতিতে।
শুরু থেকেই ইস্টবেঙ্গলের ঝাঁজালো আক্রমণের মুখে অসহায় আত্মসমর্পণ মোহনবাগানের। সবুজ মেরুনের রক্ষণ সংগঠনের কোনও শৃঙ্খলাই নজরে আসেনি খেলায়। এমন ছন্নছাড়া মোহনবাগানকে সাম্প্রতিকালে দেখা যায়নি। মনে হয়েছে বাগান ফুটবলাররা একে অপরকে চেনেনই না। মোহনবাগান কোচ পানাগয়টিস ডিমপেরিসের কোনও সঠিক পরিকল্পনাই ছিল না। হয়ত তিনি ফুটবলারদের ক্লান্তির দোহাই দিতে পারেন, কিন্তু সেটা একটা অজুহাত মাত্র। কেনই বা ছন্দে থাকা সাহাল শুরু থেকে তাঁর প্রথম একাদশে ছিলেন না , সেটা বোধগম্য হয়নি। বাগানের বিশ্রি ফুটবলের সুযোগের পুরো সদ্ব্যবহার করে লাল হলুদ। ইস্টবেঙ্গলের বিপিনের গতি কারও অজানা নয়। সঙ্গে এডমুন্ডের গোল খিদের পরিচয় এর আগেই মিলেছিল। চলতি ডুরান্ড কাপে মাঝমাঠে রশিদের মাস্তানি ইস্টবেঙ্গলের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে রেখেছিল ডার্বিতে খেলতে নামার আগে। ইস্টবেঙ্গল কোচ হাবাসের বিচক্ষণতার নিদর্শন আগেই দেখেছে ভারতীয় ফুটবল। আবার দেখল ডুরান্ডের ফাইনাল ডার্বিতে। তাঁর কৌশলেই বাজিমাত ইস্টবেঙ্গলের।
১০ মিনিটেই গোল করে বিপিন ইস্টবেঙ্গলকে এগিয়ে দেন। রশিদের বাড়ানো বল ধরে বিপিন কাট করে বক্সে ঢুকে এসে ডান পায়ে শট নিলে, তা বাগান গোলকিপার বিশালের পায়ে লেগে গোলে ঢোকে। এই গোলেই মোহনবাগানের রক্ষণ তাসের মতো ভেঙে পড়ে, সঙ্গে আত্মবিশ্বাস তলানিতে পৌঁছয়। তাতেই বাগানের দ্বিতীয় গোল হজম ১২ মিনিটে। জিকসনের থেকে বল পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে কোনাকুনি গড়ানো শটে অনবদ্য গোল করেন এডমুন্ড। বাগান গোলকিপার বিশাল বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে পড়েও বলের নাগাল পাননি।
খেলার গতির বিরুদ্ধে গোল করার একটা সুযোগ এসেছিল মোহনবাগানের কাছে। ২০ মিনিটে লিস্টনের নেওয়া ফ্রিকিক ফিস্ট করে বের করে দেন লাল হলুদের গোলকিপার প্রভুসুখন। ২ গোলে পিছিয়ে থাকার পরও কাছাখোলা আক্রমণে যাওয়ার মতো হারিকিরি কৌশল কেন মোহনবাগান কোচ পানোস জারি রেখেছিলেন, সেটাই দুর্বোধ্য। তার খেসারত দিয়ে ২২ মিনিটে তৃতীয় গোল হজম করে বাগান। রশিদের পাস ধরে বাগান ডিফেন্ডার রাহুল বেকেকে মাটি ধরিয়ে দিয়ে গোলকিপার বিশালকে টপকে ফাঁকা গোলে বল ঠেলে দেন এডমুন্ডই।
এরপরও অবশ্য বাগান কোচ তাঁর আক্রমণাত্মক ফুটবল থেকে সরে আসেননি, বা রক্ষণের জমাট ভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেননি। এতে ৩৪ মিনিটে একক প্রচেষ্টায় মনবীর বাঁপায়ের মাপা শটে গোল(১-৩) করে ব্যবধান কমালেও,আবার গোল খাওয়ার হাত থেকে বাঁচেনি বাগান ব্রিগেড। ৩৭ মিনিটে বাগানের ম্যাকলারেন সহজ গোল মিস করার পরই জয় গুপ্তার মাইনাস থেকে ৪৪ মিনিটে দলের চতুর্থ গোল, নিজের হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ করেন মিজোরামের ফুটবলার এডমুন্ড(৪-১)। ভারতীয় ফুটবলে এমন একজন দক্ষ স্ট্রাইকারের দেখা মিলল বাইচুং ভুটিয়া ও সুনীল ছেত্রীর পর। ভারতীয় ফুটবলে বাইচুংয়ের পা থেকে হ্যাটট্রিক এসেছিল ৯৭ ফেডারেশন কাপে। ম্যাচের ফল ছিল ইস্টবেঙ্গলের অনুকূলে ৪-১। ২০০৯ আই লিগের ম্যাচে চিড্ডির হ্যাটট্রিকে মোহনবাগান জিতেছিল ৫-৩ গোলে। ২০২২ সালে আইএসএলের ম্যাচে কিয়ান নাসিরির হ্যাটট্রিকে মোহনবাগান জিতেছিল ৩-১ গোলে। তৃতীয় ভারতীয় হিসেবে এডমুন্ডের হ্যাটট্রিক ২০২৬ ডুরান্ডের ফাইনাল ডার্বি ম্যাচে। প্রত্যাশিতভাবেই তিনি প্রতিযোগিতার সেরা হলেন। তবে ফাইনালে ৪ গোল হজমের পরও বাগান গোলকিপার বিশাল কীভাবে গোল্ডেন গ্লাভস পুরস্কার পেলেন, কেন প্রভুসুখন গিলকে এই পুরস্কার দেওয়া হল না বোঝা গেল না।
বিরতিতে খেলার ফল ছিল ইস্টবেঙ্গলের পক্ষে ৪-১। একটা সময় মনে হচ্ছিল ১৯৭৫য়ের শিল্ডের পর আবার ৫ গোল পেয়ে যাবে ইস্টবেঙ্গল। ৭২ মিনিটে বাগান গোলকিপার বিশাল এগিয়ে এসে সময়মতো জেসিন টিকের গোলের প্রচেষ্টা রুখে দেওয়ায় ৫ গোল খাওয়ার লজ্জার হাত থেকে বাঁচে মোহনবাগান। তবে এমন একটা হারের পর মোহনবাগান কোচ পানোসের বিদায় ঘন্টা বেজে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যতই তিনি ক্লান্তির সাফাই দিয়ে
ইস্টবেঙ্গল: প্রভুসুখন, হার্দিক, আনোয়ার, সন্দীপ, লালচুংনুঙ্গা, জয়, জিকসন, রশিদ, রামিরেজ(আসিফ), বিপিন, এডমুন্ড(জেসিন)।
মোহনবাগান: বিশাল, অভিষেক, বেকে, আলবার্তো, শুভাশিস, মনবীর(ছাংতে), জেলকোভিচ(মিগুয়েল), থাপা(সাহাল), আপুইয়া(টাংরি), লিস্টন(কিয়ান), ম্যাকলারেন।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
