মুনাল চট্টোপাধ্যায়: ডুরান্ড কাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম ডার্বি জেতার পর ফানুসের মতো আকাশে উড়েছিলেন মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট কোচ পানোস। আর তাঁর সেই গর্বের ফানুসটা চুপসে গেল ডুরান্ড ফাইনাল ডার্বি ইস্টবেঙ্গলের কাছে ১-৪ গোলে হেরে। এতটাই লজ্জিত হয়ে পড়লেন লজ্জাজনক হারে, ম্যাচ শেষে যুবভারতী স্টেডিয়াম ছেড়ে পালিয়ে গেলেন বাগান কোচ পানোস। প্রচারমধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার সাহসটুকু দেখাতে পারেননি। না পারারই কথা, কারণ তাঁর পরিকল্পনাহীন কোচিংয়ে যে বিশ্রি ফুটবল খেলেছে সবুজ মেরুন ব্রিগেড, তাতে মোহনবাগান সদস্য-সমর্থকদের মন ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ফাইনালের দল গঠন থেকে ম্যাচের কৌশলের মধ্যে কোনও পরিণতবুদ্ধির ছাপ নজরে আসেনি। এই হারের পর পানোস নিশ্চয়ই বুঝলেন কলকাতার ফুটবল, ডার্বি অত্যন্ত কঠিন ঠাঁই, এটা পাঞ্জাব এফসির কোচিংয়ের আরামপ্রদ সিট নয়। মোহনবাগান কোচের আসনটা সবসময়ই হট, সামান্যতম ভুলে ভুগতে হবে। মোহনবাগান টিম ম্যানেজমেন্ট ফাইনালের ডার্বি শেষে তাঁকে প্রচারমধ্যমের মুখোমুখি হতে না দিয়ে যতই তাঁর ত্রুটি আড়াল করার চেষ্টা করুন না কেন, মোহনবাগানের সাম্প্রতিককালের সফলতম কোচ হোসে মোলিনাকেও যেভাবে এক কর্তার কলকাঠি নাড়ার কারণে সরে যেতে হয়েছে, তেমন পানোসকে কোচের পদ হারাতে হবে, আর একবার ডার্বি হারলে, বা আইএসএলের শুরুর দিকে ম্যাচে সাফল্য না পেলে। আর সেটাই ঘটবে বলে বেশি মনে হচ্ছে।
পানোস যখন পালিয়ে গেলেন, তখন ইস্টবেঙ্গল কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস নিজের দলের ফুটবলারের লড়াকু মনোভাবের প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন। তিনি যে কত বড় ট্যাকটিশিয়ান সেটা প্রমাণ করে দিলেন আবার। ডুরান্ডের প্রথম ডার্বি হারের পর তাঁর মুখে কোনও হতাশা ভাব ছিল না। বরং সেই হার থেকে শিক্ষা নিয়ে দলটা গোছানোর সঙ্গে নিজের কৌশল ফুটবলারদের রপ্ত করানোর কাজটা করে গিয়েছিলেন মন দিয়ে। তারই সুফল মিলল ফাইনালের ডার্বিতে। যেভাবে দল গঠন করে ৫-৩-২য়ের ছক সাজিয়ে মোহনবাগানকে চাপে ফেলে দিয়েছেন, তা এককথায় অভাবনীয়। জয় গুপ্তাকে উইংয়ে রেখে বাগান রক্ষণকে নিয়ে যে ছেলেখেলা করলেন হাবাস, তাতে তাঁর ভূমিকার কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। ম্যাচ শেষে প্রচারমধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেই দিলেন, এটা তাঁর সেরা ডার্বি জয়। কারণ এর আগে ডার্বি তিনি অনেক জিতেছেন, কিন্তু এই ডার্বি জয় তাঁকে ট্রফি দিয়েছে, ইস্টবেঙ্গল সদস্য-সমর্থকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, আনন্দ, উৎসবে মাতার সুযোগ দিয়েছে।
ফাইনালের ডার্বির হ্যাটট্রিক হিরো ও টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলার এডমুন্ডকে নিয়ে ছিল বাড়তি উচ্ছ্বাস। ইস্টবেঙ্গল সদস্য-সমর্থকরা যখন মিজোরামের স্ট্রাইকারকে নিয়ে জয়ধ্বনি দিয়েছেন যুবভারতীর গ্যালারিতে বসে, পরে তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য হুড়োহুড়ি লাগিয়েছেন, তখন ক্লাব কর্তা থেকে কোচ হাবাস তাঁর পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন এমন একটা চোখ ধাঁধানো পারফরমেন্সের জন্য। ভারতীয় ফুটবলারদের তাঁর আদর্শ কে এই প্রশ্নে মিজো ফুটবলার জানান, এর আগে ইস্টবেঙ্গলের জার্সিতে ভাল খেলে ছাপ রেখে গিয়েছেন মিজোরামের লালরিনডিকা। তিনি তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ভারতীয় ফুটবল লালরিনডিকা, জেজের মতো মিজোরামের ফুটবলাররা নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরেছেন। এবার তারকা হওয়ার সব সম্ভাবনাই রয়েছে এডমুন্ডের মধ্যে।
আন্তর্জাতিক স্তরে নেইমারকে পছন্দ এডমুন্ডের। নেইমারের খেলার ভক্ত এডমুন্ড বললেন, ডুরান্ড কাপ জয় তাঁকে ও গোটা দলকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে, উজ্জীবিত করবে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স টায়ার টু-র ম্যাচে আরও ভাল খেলতে। ডার্বি ম্যাচ গোল করাটাই বড় ব্যাপার,সেখানে হ্যাটট্রিক করাটা বাড়তি প্রাপ্তি। গোটা দলের সম্মিলিত চেষ্টার ফলে এটা সম্ভব হয়েছে। ইস্টবেঙ্গল কোচ হাবাসের কৌশল ও টিপস কাজে দিয়েছে।
অন্য সব ফুটবলারের মতোই ভারতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর স্বপ্ন দেখেন এডমুন্ড। ১৬ সেপ্টেম্বর এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আল হুসেইনের বিরুদ্ধে অ্যাওয়ে ম্যাচ রয়েছে ইস্টবেঙ্গলের। তারপর ভারতীয় সিনিয়র ফুটবল দল ৩ অক্টোবর যুবভারতীতে ব্রাজিলের জাতীয় দলের বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচে অংশ নেবে। নেইমার ভক্ত এডমুন্ডের ইচ্ছা ওই ম্যাচে খেলার সুযোগ পাওয়া। বলেন, ‘ এটা তো আমার হাতে নেই। সবটাই নির্ভর করছে ভারতীয় দলের চিফ কোচের ওপর। তিনি যদি সুযোগ দেন আমার এই পারফরমেন্স দেখে। তাহলে ব্রাজিলের মতো হেভিওয়েট দলের বিরুদ্ধে খেলার স্বপ্নপূরণ হবে।’ আপাতত অবশ্য এডমুন্ড ডুরান্ড ফাইনালে হ্যাটট্রিক ও ট্রফি জয়টা উদযাপন করতে চান তাঁর প্রিয় চিকেন বিরিয়ানির স্বাদ নিয়ে।
গোটা টুর্নামেন্টে দারুন খেলেও গোল্ডেন গ্লাভস পেলেন না ইস্টবেঙ্গল গোলকিপার প্রভুসুখন গিল। কেন সেটা দুর্বোধ্য। এই পুরস্কার পেলেন মোহনবাগান গোলকিপার বিশাল কাইথ ডুরান্ড কাপ ফাইনালে ৪ গোল হজম করেও। তবে তা নিয়ে ভেতরে ভেতরে দুঃখ বা অভিমান থাকলেও, তা বাইরে প্রকাশ করলেন না প্রভুসুখন। বরং বললেন, গোল্ডেন গ্লাভস পাননি বলে আক্ষেপ নেই কোনও, আসল হল ট্রফি জয়। ২২ বছর পর ডুরান্ড জেতার আনন্দই আলাদা , গত মরশুমে আইএসএল জয়ের পর।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
