Cart Total Items (0)

Cart

All Sports India

মোহনবাগান ৩(‌সাহাল-‌২, সায়ন)‌    মহমেডান ২(‌লালরেমসাঙ্গা, মহীতোষ-‌পেনাল্টি)‌

মুনাল চট্টোপাধ্যায়:‌ শেষবার কলকাতা ফুটবল লিগ জিতেছিল মোহনবাগান ২০১৮ সালে। তারপর আবার মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের মাথায় কলকাতা লিগ খেতাবের মুকুট উঠল শনিবার বারাসত স্টেডিয়ামে রোমাঞ্চকর সুপার সিক্সের ম্যাচে মহমেডানকে ৩-‌২ গোলে হারানোয়। যা একপ্রকার থ্রিলার বললে ভুল হবে না। নাম বদলে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট হলেও দলের জার্সির রং সবুজ মেরুন। সমর্থকদের হৃদয়ের রং সবুজ মেরুন। তাই নামে কী বা আসে যায়। আসল তো হল লড়াকু মেজাজ ও চরিত্রটা। ৫৮ মিনিটে গোলকিপার দীপ্রভাত লাল কার্ড দেখার পর পেনাল্টি গোলে পিছিয়ে পড়েও নির্ধারিত সময়ের বাকি ৩২ মিনিট ও সংযুক্তি সময়ের ৬ মিনিট, অর্থাৎ ৩৮ মিনিট ১০ জনে খেলে ৩-‌২ গোলে ম্যাচ জিতে মোহনবাগানের চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের। এটা মোহনবাগানের ৩১তম কলকাতা লিগ খেতাব। চলতি মরশুমে মোহনবাগানের ঘরে প্রথম ট্রফি সুপার সিক্সের ৩ ম্যচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে।

লিগ খেতাব পকেটে পুরতে দু’‌দলের দরকার ছিল ম্যাচটা জেতা। অন্য দু’‌টি ম্যাচের ফলের ওপর নির্ভর না করে। আর সেটা মাথায় রেখেই দল সাজিয়েছিলন মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট কোচ বাস্তব রায় ও মহমেডান কোচ শাহিন রামন।

চলতি মরশুমে ঘরে কোনও ট্রফি নেই মোহনবাগানের। সেখানে ইস্টবেঙ্গল ইতিমধ্যেই ডুরান্ড কাপ ঘরে তুলেছে। এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টায়ার টু-‌তে জর্ডনের আল হুসেইন ম্যাচে সম্মানজনক ড্র করেছে। ঘরের মাঠে প্লেঅফ ম্যাচে আল আরাবিকে হারিয়ে মূল পর্বে ওঠার পর। তারওপর কলকাতা লিগের ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলের বাঙালি ব্রিগেডের কাছে মোহনবাগান আইএসএলের একঝাঁক সিনিয়র ফুটবলারকে খেলিয়েও আটকে যায়। ম্যাচ ড্র হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে মোহনবাগান শিবির যে ঘরোয়া লিগে চ্যাম্পিয়ন হতে মরিয়া হবে, এটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আর সেকারণে মহমেডানের বিরুদ্ধে মাস্ট উইন ম্যাচে সবুজ মেরুন কোচ বাস্তব রায় নিয়মিত আইএসএল খেলা ৭ ফুটবলারকে প্রথম একাদশে নামাতে দ্বিধা করেননি। বাস্তবের ৪-‌২-‌৩-‌১য়ের ছকে নতুন সংযোজন ছাংতে। কলকাতা লিগে এই প্রথম সবুজ মেরুন জার্সিতে তাঁর আত্মপ্রকাশ।

লিগ জেতার সুযোগ যে মহমেডানও ছাড়বে না, এটা জানাই ছিল। সুপার সিক্সে ভবানীপুরকে প্রথম ম্যাচে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নিয়েছিল সাদা কালো ব্রিগেড। তারওপর ভর করেই ইস্টবেঙ্গলকে রুখে দেয় মহমেডান। ওই ম্যাচ ড্র হওয়ায় মহমেডান ফুটবলাররা বাড়তি উৎসাহ নিয়ে শনিবার বারাসত স্টেডিয়ামের মাঠে ঝাঁপিয়েছিল মোহনবাগানের বিপক্ষে। মুখোমুখি হওয়ার আগে দু’‌দলের পয়েন্ট ছিল সমান(‌৪ পয়েন্ট)‌। মহমেডান কোচ শাহিদ রামনও জানতেন, ম্যাচ জিততে হলে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে অতিরক্ষণাত্মক ফুটবল খেললে ভুগতে হবে। তাই ৪-‌১-‌৪-‌১ ছকের আক্রমণ ও রক্ষণের মেলবন্ধনে ভারসাম্যমূলক দল নামিয়েছিলেন। তার ফলে প্রতিপক্ষ মোহনবাগান প্রথমার্ধে একতরফা প্রাধান্য নিয়ে ঘাড়ে চেপে বসতে পারেনি। আইএসএল থেকে অবনমন হয়ে যাওয়া মহমেডান ফুটবলারদের মধ্যে একটা জোস ছিল। তাঁরা নিজেদের প্রমাণ করতে বেছে নিয়েছিলেন কলকাতা ফুটবল লিগের মঞ্চটাকে। একটা সময় পর্যন্ত মহমেডান ফুটবলাররা লড়েছিলেন সমানে সমানে। বলতে গেলে অনেকটা সময় মোহনবাগানের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করেওছিলেন। ম্যাচ হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বুঝে মোহনবাগান শেষদিকে জ্বলে ওঠে। তার সুফল পায় সবুজ মেরুন।

প্রথম গোলের সুযোগটা এসেছিল মোহনবাগানেরই সামনে। ৯ মিনিটে কিয়ানের মাইনাসে বক্সের ভেতর বল পেয়ে সাহাল গড়ানো শট নিলে, মহমেডান গোলকিপার নিখিল বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বল ধরে নিয়ে নিশ্চিত পতন রোখেন। তবে ২৬ মিনিটে মোহনবাগানের গোল করে এগিয়ে যাওয়া আটকাতে পারেননি মহমেডান গোলকিপার নিখিল। মনবীরের বাড়ানো পাস বক্সের মাঝে ছাংতের কাছে গেলে, তিনি আলতো একটি লব ভাসিয়ে দেন দ্বিতীয় পোস্টের সামনে। ওত পেতে দাঁড়িয়েছিলেন সাহাল আব্দুল সামাদ। তিনি সেই বলে হেড করলে বল গোলকিপারের হাতে লেগে জালের ভেতর জড়িয়ে যায়।

গোল খেয়ে অবশ্য লড়াই ছাড়েনি মহমেডান। বারবার আক্রমণ তুলে এনে মোহনবাগান রক্ষণের ফুটবলারদের বিব্রত করছিলেন সাদা কালো ব্রিগেডের লালথানকিমা, লালরেমসাঙ্গা ও ইসরাফিলরা। ৪০ মিনিটে বক্সের মাথা থেকে নেওয়া ইসরাফিলের শট চাপড়ে বের করে দলকে গোল খাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন বাগান গোলকিপার দীপ্রভাত। কিন্তু ২ মিনিট বাদেই মহমেডানের হয়ে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান লালরেমসাঙ্গা। মাঝমাঠ থেকে বল টেনে নিয়ে গিয়ে সবুজ মেরুনের ডাবল ডিফেন্সিভ স্ক্রীণকে টপকে মোহনবাগান রক্ষণের ফাঁক দিয়ে একটি দর্শনীয় থ্রু বাড়ান লালথানকিমা। বক্সের ডানদিকে লালরেমসঙ্গা যখন বল ধরেন, তখন তাঁকে বাধা দেওয়ার জন্য বাগান ডিফেন্ডারদের কেউ ছিলেন না। ঠান্ডা মাথায় বল গোলকিপার দীপ্রভাতের পাশ দিয়ে জালের ভেতর পাঠান লালরেমসাঙ্গা।

দ্বিতীয়ার্ধের দলে একটি বদল আনেন বাগান কোচ বাস্তব। তিনি দীপক টাংরিকে তুলে নিয়ে নামান অভিষেক সূর্যবংশীকে। মহমেডান প্রথমার্ধের মতোই আক্রমণের চাপ বজায় রাখে দ্বিতীয়ার্ধের খেলায়। তাতেই ৫৮ মিনিটে মারাত্মক ভুল করে মোহনবাগানকে ডোবাতে বসেছিলেন গোলকিপার দীপ্রভাত। মহমেডান গোলকিপারের লম্বা কিক মোহনবাগান মাঝমাঠ ও রক্ষণের ফুটবলারদের টপকে সামনে পড়লে, লালরেমসাঙ্গা বলের দখল নিতে গেলে নিজের জায়গায় না থাকার কারণে বাগান গোলকিপার দীপ্রভাত গোল বাঁচাতে ফাউল করে বসেন পেনাল্টি বক্সের মাঝে। দীপ্রভাত জাপটে ধরে লালরেমকে বক্সের ভেতর ফেলে দিলে রেফারি মহমেডানের অনুকূলে পেনাল্টি দেন। একইসঙ্গে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন মোহনবাগান গোলকিপার দীপ্রভাতকে।

মোহনবাগান কোচ বাস্তবের সামনে তখন একজন সামনের দিকে ফুটবলার বসিয়ে নতুন গোলকিপার নামানো ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। ৬০ মিনিটের মাথায় তিনি ছাংতেকে তুলে নিয়ে গোলকিপার জাহিদকে নামান। একইসঙ্গে কিয়ানের জায়গায় মাঠে আনেন সায়ন ব্যানার্জিকে। ৬২ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে মহমেডানকে এগিয়ে দেন মহীতোষ। অনেকেই ভাবছিলেন লিগটা বুঝি জিতেই গেল মহমেডান ২-‌১ গোলে এগিয়ে গিয়ে।

কিন্তু ম্যাচে তখনও অনেক নাটক বাকি ছিল। ১০ জন হয়ে গেলেও মোহনবাগান ফুটবলাররা হাল ছাড়েনি ম্যাচ জেতার। সেই লড়াকু জেদ থেকেই ৬৯ মিনিটে ম্যাচের সেরা সাহালের গোলে সমতা ফেরায় মোহনবাগান। রবিলাল মান্ডির তোলা বল বক্সের ডানদিকে মনবীর হেডে সামনে রাখলে সাহাল সেই বলে হেড করে জালের ভেতর পাঠান। তবে ২-‌২ হয়ে গেলেও স্বস্তিতে ছিল না সবুজ মেরুন। কারণ ম্যাচ ড্র করলে মোহনবাগানের চ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব হত না। কারণ ইস্টবেঙ্গল নিজেদের মাঠে কোল ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে ৫ গোলের প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলার খবর বারাসতে এসে পৌঁছতে দেরি হয়নি।

মোহনবাগান যদি ম্যাচটা শেষপর্যন্ত জিততে না পারত, ম্যাচটা ২-‌২ থেকে যেত, তাহলে ইসটবেঙ্গল বাজিমাত করে যেত গোলপার্থক্যে ভাল জায়গায় থাকার সুবাদে। কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের লিগ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে নিজেরাই চ্যাম্পিয়ন হয় মোহনবাগান ৭৩ মিনিটে জয়সূচক গোল করে। সাহালের সঙ্গে ওয়ালপাস খেলে সায়ন বক্সের মাঝে বল ধরে কোনাকুনি শটে মহমেডান গোলকিপার নিখিল ডেকার পাশ দিয়ে তা গোলে পাঠান(‌৩-‌২)‌। গত মরশুমে কল্যানীর মাঠে কলকাতা লিগে ইস্টবেঙ্গলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পিছনে সায়নের মূল ভুমিকা ছিল, আর শনিবার বারাসতের মাঠে সবুজ মেরুন জার্সিতে ১০ জন হয়ে যাওয়া মোহনবাগানকে চ্যাম্পিয়ন করলেন জয়সূচক গোল করে।

মোহনবাগান:‌ দীপ্রভাত , রাজ, বেকে, শুভাশিস, রবিলাল, টাংরি(‌সূর্যবংশী)‌, সন্দীপ, কিয়ান(‌সায়ন)‌, সাহাল(‌সুহেল)‌, ছাংতে(‌জাহিদ)‌, মনবীর(‌আলেক্স)‌।
মহমেডান:‌ নিখিল, হীরা(‌আকাশ)‌, দীনেশ, রাহুল, জুয়েল, অর্পিত, লালরেমসাঙ্গা(‌আদিসন)‌, মহীতোষ, তাংভা(‌লালাঙ্গশাকা)‌, ইসরাফিল, লালথানকিমা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Captcha loading...