ছবি: ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ
স্পেন ১ (টোরেস) আর্জেন্টিনা ০
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: আর্জেন্টিনার সমর্থকরা তো বটেই, সারা বিশ্বের লিওনেল মেসির ভক্তরা বিশ্বকাপটা তাঁদের প্রিয় মেসির হাতেই আর একবার দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সবসময় সেটা মেলে না, যেটা চাওয়া হয়। এক্ষেত্রেও হল না। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে জেতা মুকুটটা ফুটবলের রাজপুত্র মেসির মাথা থেকে খসে পড়ল ২০২৬ বিশ্বকাপে। নিউ জার্সিতে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মাঠে ফাইনালে ১০৬ মিনিটে করা সুপার সাব ফেরান টোরেসের একমাত্র গোলে গতবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ ফলে হারিয়ে বিশ্বকাপ খেতাব ছিনিয়ে নিল স্পেন। লামিনে ইয়ামালের থেকে বল পেয়ে পেড্রো পোরো ক্রশ ভাসিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা বক্সে। সেই বল ব্যাক হেডে পেছনে নামিয়ে দেন বদলি হিসেবে মাঠে আসা আর এক ফুটবলার নিকো উইলিয়ামস। সেই আলগা বল জোরালো শটে গোলের ভেতর পাঠান ফেরান টোরেস।
ইওরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনের হাতে হার হল কোপা আমেরিকা ও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। বলা যেতে পারে লাতিন আমেরিকার ঘরানা হার মানল ইওরোপিয় ঘরানার ফুটবল। ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের পর এটা স্পেনের দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়। সেবার ফাইনালে দেল বস্কের কোচিংয়ে জোহানেসবার্গের মাঠে ইনিয়েস্তার গোলে অতিরিক্ত সময়ের গোলেই ফাইনালে হল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন ক্যাসিয়াস, পুয়োল, জাভি, ইনিয়েস্তা, র্যামোস, পিকে, বিসকেটসরা। রবিবার রাতে নিউ জার্সির ভিভিআইপি বক্সে বসে উত্তরসূরী ইয়ামাল, রড্রি, টোরেস, ওয়ারজাবাল, পেড্রি, কুকুরেলা, উনাই সিমনের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি দেখে উচ্ছ্বাসে গা ভাসালেন।
আর স্পেন ফুটবলারদের বিজয়োল্লাসের মাঝে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা বুকে নিয়ে জলে ভেজা চোখ নিয়ে মাঠ ছাড়লেন সর্বকালের সেরা ফুটবলার মেসি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে জেতার পর মেসির চোখে ছিল আনন্দাশ্রু, আর এদিনেরটা বেদনার। ফুটবল সম্রাট পেলের পরপর দু’বার বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড ছোঁয়া সম্ভব হল না মেসির। যদি খেতাব ধরে রাখতে পারতেন মেসি, তাহলে ফুটবল গড মারাদোনা যেটা পারেননি, সেই রেকর্ড গড়ে ফেলতেন। সেটা হল না। এমনকি কিলিয়ান এমবাপে চলতি বিশ্বকাপে ১০ গোল করে ফেলায় গোল্ডেন বুট জিতে নিলেন মেসিকে পিছনে ফেলে। মেসির গোলসংখ্যা ৮য়ে আটকে থাকল ফাইনালে কোনও গোল করতে না পারায়। বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোলের রেকর্ডও এখন ফ্রান্সের স্ট্রাইকার এমবাপের দখলে। তাঁর গোল সংখ্যা ২২। মেসির ২১। পরের বিশ্বকাপে আর না খেললে এমবাপেকে ধরা মেসির পক্ষে আর সম্ভব নয়।
৩৯ বছর বয়সী মেসি চারবছর পর বিশ্বকাপে আর খেলবেন বলে মনে হয় না। যদি খেলেন, তাহলে সেটা একটা অবাক করা ব্যাপার ঘটবে। তবে যেহেতু ২০৩০য়ের শতবার্ষিকী বিশ্বকাপের প্রথম তিন ম্যাচ খেলা হবে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে, সেক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা শিবির যদি চায়, তাহলে ভাবতে পারে অন্তত সেই উদ্বোধনী ম্যাচটা ঘরের মাঠে মেসিকে খেলিয়ে অবসরে পাঠাতে। অবশ্য সেটা কতটা সম্ভব এখন থেকে বলা মুশকিল। বরং মেসির চোখের জল বলে দিয়েছে, তিনি সম্ভবত বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচটা খেলে ফেললেন।
২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে দারুন লড়েও অতিরিক্ত সময়ের গোলে আর্জেন্টিনার হার হয়েছিল। মেসি সেদিনও হারটা মানতে পারেননি। রানার্স পদক নেওয়ার সময় তাঁর চোখে ছিল জল। বিশ্বকাপ না পাওয়ার যন্ত্রণা তাঁকে সেবার কুরে কুরে খেয়েছিল। সেই মনের জ্বালা মিটিয়েছিলেন মেসি গত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে।কিন্তু এবার নিউ জার্সির ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার খেলায় ১২০ মিনিটে জেতার কোনও তাগিদই চোখে পড়েনি। এর আগের সব ম্যাচে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়লেও শেষপর্যন্ত দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে আক্রমণ তুলে এনে ম্যাচ বের করেছিলেন মেসি ও তাঁর সতীর্থ ফুটবলাররা। সেটাই তো চোখে পড়ল না স্পেনের বিরুদ্ধে আর আর্জেন্টিনার খেলায়। সারা ম্যাচে নিজেদের গুটিয়ে রাখলেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। কোচ লিওনেল স্কালোনির কৌশলটা যে ঠিক কী ছিল, সেটাই বুঝে ওঠা সম্ভব হল না, ম্যাচের শেষ মিনিট পর্যন্ত। তারওপর আর্জেন্টিনা নিজেদের খোলসে আরও বেশি করে ঢুকে যায় দ্বিতীয়ার্ধের সংযুক্তি সময়ের ৩ মিনিটে এনজো ফার্নান্ডেজ দ্বিতীয় হলুদ ও লাল কার্ড দেখায়।
স্পেনের কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তের অঙ্ক কষা ফুটবলের সঙ্গে ১০ জনে পাল্লা দেওয়া সম্ভব ছিল না। ফলে যেটা হওয়ার ছিল সেটাই হয়েছে, আর্জেন্টিনার হার, স্পেনের জয়। ভাবা যায়, গোটা ম্যাচে স্পেন যখন গোল লক্ষ্য করে ২১ টা শট নিয়েছে, আর্জেন্টিনাকে গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে অন্তত চারটে সেভ করতে হয়েছে হার বাঁচাতে ফেরান টোরেসের গোলের আগে, সেখানে আর্জেন্টিনার গোল লক্ষ্য করে একটাও শট নেই। শেষমুহূর্তে সিমিওনে একটা শট নেন, সেটা ক্রশপিসের অনেক ওপর দিয়ে উড়ে যায়। স্পেন গোলকিপার উনাই সিমনকে একবারও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি। গোটা বিশ্বকাপে মাত্র এক গোল হজমের জন্য উনাই সিমনের হাতেই উঠেছে গ্লোল্ডেন গ্লাভস ট্রফি।
ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে পুরোপুরি অচেনা লেগেছে। তাই বলতে দ্বিধা নেই যোগ্য দল হিসেবেই স্পেন চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ফুয়েন্তের অঙ্ক কষা ফুটবলের ভর করে। রক্ষণে নজর কাড়া ফুটবল খেলে স্পেনের টিনএজার ডিফেন্ডার কুবারসি পেলেন ফিফা ইয়ং প্লেয়ারের ট্রফি। আর গোটা টুর্নামেন্টে মাঝমাঠে দুরন্ত ফুটবল খেলে গোল্ডেন বল খেতাব উঠল স্পেনের রড্রির হাতে। চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি সব প্রায় সব পুরষ্কারই তো রবিবার রাতে নিয়ে গেলেন স্পেনের ফুটবলাররা। তাই তাঁদের এই বিশ্বকাপ জয় বিতর্কহীন।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
