ইস্টবেঙ্গল—২ (৫) (মহেশ, নন্ধা কুমার) (ক্লেটন (গো), ক্রেসপো (গো), বোরহা (গো), মহেশ (গো), নন্ধা (গো))
নর্থ-ইস্ট—২ (৩) (মিগুয়েল, ফাল্গুনী) (ইবসন (গো), গনি (গো), পার্থিব (মিস), প্রজ্ঞান (গো))
সুচরিতা সেন চৌধুরী: নিভতে থাকা প্রদীপটা যে এভাবে জ্বলে উঠবে তা কে ভেবেছিল। কিন্তু কথায় আছে ওস্তাদের মার শেষ রাতে। তা আরও একবার প্রমান করে দিল ডুরান্ড কাপ ২০২৩-এর সেমিফাইনাল। ৯৭ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থাকা ইস্টবেঙ্গল সমতায় ফিরে ম্যাচ নিয়ে গেল টাইব্রেকারে। আর সেখানে বাজিমাত লাল-হলুদ ব্রিগেডের। শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনায় কাঁপল গোটা স্টেডিয়াম। ২০০৪-এর পর আবার ফাইনালে ইস্টবেঙ্গল। আবার হিরো নন্ধা কুমার। দলকে সমতায় ফেরালেন, দলের হয়ে জয়সূচক গোলটিও করলেন। ডার্বির হিরো আরও একবার হিরো হয়ে গেলেন ডুরান্ড সেমিফাইনালে।
নন্ধা না হয়ে এদিন হিরো হতে পারতেন নর্থ-ইস্টের ফাল্গুনী। গোল করলেন আবার করালেনও। পুরো ম্যাচ জুড়ে অসাধারণ খেললেন কোনসাম ফাল্গুনী সিং। প্রথম গোল করালেন, দ্বিতীয় গোল করলেন। ইস্টবেঙ্গলের ঘরের মাঠে লাল-হলুদ ব্রিগেডকে প্রায় আটকেই দিয়েছিল নর্থ-ইস্ট। যার পিছনে বড় ভূমিকা ছিল এই মিডিও-র। ম্যাচ রিপোর্টের শুরুটা যে তাঁকে দিয়েই হবে তা নিয়েই কোনও সন্দেহই ছিল না ৭৭ মিনিট পর্যন্ত। কিন্তু ৭৭ মিনিটে মহেশের গোল আর অতিরিক্ত সময়ে নন্ধা কুমারের গোল খেলার রঙটাই বদলে দিল মুহূর্তে। ৭০ মিনিট খেলল নর্থ-ইস্ট। শেষ ২০ মিনিট খেলে ম্যাচ পকেটে পুড়ে ফেলল ইস্টবেঙ্গল।
ম্যাচের ২২ মিনিটে গোল করে নর্থ-ইস্ট ইউনাইটেডকে এগিয়ে দিয়েছিলেন মিগুয়েল জাবাকো তোমে। কোনসাম ফাল্গুনী সিং বক্সের মধ্যে ক্রস করেছিলেন লালচুংনুঙ্গাকে ঘাড়ে নিয়েই। অন্যদিকে মিগুয়েল যখন গোলে শট নিলেন তখনও তাঁকে ঘিরে ইস্টবিঙ্গল ডিফেন্ডাররা। কিন্তু তাঁদের নড়াচড়ার সুযোগ না দিয়েই ইস্টবেঙ্গল জালে বল জড়ালেন এই স্পেনিয়ার্ড। গোলের নিচে প্রভসুখন গিলের কিছু করার ছিল না। দ্বিতীয় গোল এল ৫৭ মিনিটে। মাঝ মাঠ থেকে লম্বা বল ধরে বক্সের বাঁ দিক থেকে বল নিয়ে ঢুকে পড়েছিলেন ফাল্গুনী। সেখান থেকেই মন্দার রাও দেশাইকে কাঁধে নিয়ে তাঁর বাঁ পায়ের জোড়াল শট চলে যায় ইস্টবেঙ্গল গোলে। ২-০ গোলে এগিয়ে যায় নর্থ-ইস্ট ইউনাইটেড।
২-০ গোলে পিছিয়ে পড়া ইস্টবেঙ্গল জনতা যখন প্রায় হতাশায় ডুবে মাঠ ছাড়ার কথা ভাবছে তখনই ব্যবধান কমাল ইস্টবেঙ্গল। ততক্ষণে ম্যাচের বয়স ৭৭-এ পৌঁছে গিয়েছে। সাউল ক্রেসপোর ক্রস বক্সের মধ্যে ধরে চলতি বলেই শট নিয়েছিলেন মহেশ। সেই বল নর্থ-ইস্টের দীনেশ সিংয়ের গায়ে লেগে চলে যায় গোলে। ২-১ করে ইস্টবেঙ্গল। আবার জেগে ওঠে লাল-হলুদ জনতা। যে ‘ইস্টবেঙ্গল ইস্টবেঙ্গল’ চিৎকার মৌনতায় পরিণত হয়েছিল তা আবার ফিরে আসে। শেষ ১৫ মিনিট যে লড়াইটা দিল ইস্টবেঙ্গল সেটা পুরো ম্যাচে একবারও দেখা যায়নি। কোথায় থমকে ছিল লাল-হলুদের দৌঁড় সেটা নিশ্চই এই ম্যাচের পর কাটাছেড়া করবেন কোচ। তবে আপাতত ডুরান্ড ফাইনালে প্রস্তুতি নিয়ে অনেক বেশি ভাবতে হবে তাঁকে। তার মধ্যেই কার্ডের জন্য ফাইনালে নেই সৌভিক চক্রবর্তী। যিনি ইস্টবেঙ্গল মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা। তাঁর বিকল্প ভাবতে হবে কোচকে।
গোকুলাম কেরালার বিরুদ্ধে জয়ী কোয়ার্টার ফাইনাল দলে জোড়া পরিবর্তন করে সেমিফাইনালে দল নামিয়েছিলেন ইস্টবেঙ্গল কোচ কার্লেস কুয়াদ্রাত। সৌভিক চক্রবর্তী আর বোরহা হেরেরাকে বেঞ্চে রেখেই প্রথম দল সাজান তিনি। যার ফলে বদলে গিয়েছিল ফর্মেশন। মহেশকে উইং থেকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে। আর তাতেই থমকে গিয়েছিল তাঁর দৌঁড়। মাঝমাঠ থেকে তেমনভাবে অপারেট করতে পারছিলেন না তিনি। দ্বিতীয়ার্ধে কুয়াদ্রাত ভুল বুঝেই হয়তো আবার ফিরে গেলেন পুরনো ফর্মেশনে। নামিয়ে দিলেন সৌভিক ও বোরহাকে। তুলে নিলেন পার্দো ও নিশু কুমারকে। তার ফল পেতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেল ইস্টবেঙ্গলের। বরং গোলের ব্যবধান বাড়িয়ে নিল নর্থ-ইস্ট। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লেটন আর গুরসিমরাতকে নামিয়ে দিলেন। বার বার দলের ফর্মেশন বদলে ধাক্কা খেল খেলার গতি। এর মধ্যেই ব্যবধান কমাল ইস্টবেঙ্গল।
নর্থ-ইস্টের বিরুদ্ধে ডুরান্ড কাপ ২০২৩-এর সেমিফাইনাল যে এতটা কঠিন হয়ে যাবে তা আগাম বোঝাটা মুশকিলই ছিল। বরং অনেকেই ধরে নিয়েছিল সহজেই জিতে ফাইনালে পৌঁছে যাবে কলকাতার দল। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মোহনবাগান জিতলেই ফাইনালে আবার ডার্বি। তবে এদিনের সেই স্বপ্নে প্রায় জল ঢেলে দিয়েছিল ইস্টবেঙ্গলের খেলা। ইস্টবেঙ্গল প্রথমার্ধ শেষ করেছিল ০-১ গোলে পিছিয়ে থেকেই। লাল-হলুদ ব্রিগেডকে যেন কিছুটা ছন্নছাড়াই লাগল। পজেশন বেশি থাকলেও গোলের সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ ইস্টবেঙ্গল। সঙ্গে রক্ষণের ব্যর্থতায় জোড়া গোল হজম। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার ঠিক আগে লাল কার্ড দেখলেন নর্থ-ইস্ট ফুটবলার মিগুয়েল জাবাকো। তার পরই ইসটবেঙ্গলের দ্বিতীয় গোল। এবং শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকার।
টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলে ম্যাচের দখল নিল ইস্টবেঙ্গল। নর্থ-ইস্টের একটি শট বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন প্রভসুখন গিল। কিন্তু সেই শট গ্রাহ্য হয়নি। নতুন করে সেই শট নিতে গেলে নর্থ-ইস্টের পার্থিব ক্রসবারে মারেন। সেখানেই পিছিয়ে পড়ে তারা। ইস্টবেঙ্গলের হয়ে পাঁচটি গোল করেন ক্লেটন, ক্রেসপো, বোরহা, মহেশ, নন্ধা।
ইস্টবেঙ্গল: প্রভসুখন গিল, হরমনজ্যোত খাবরা (ক্লেটন সিলভা), লাল চুংনুঙ্গা (লাল চুংনুঙ্গা), জর্ডন এলসে (গুরসিমরাত সিং), মন্দার রাও দেশাই, অ্যান্তোনিও লুকাস (বোরহা হেরেরা), নন্ধা কুমার, নাওরেম মহেশ, নিশু কুমার (সৌভিক চক্রবর্তী), সল ক্রেসপো, জ্যাভিয়ের সিভেরিও।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
