অলস্পোর্ট ডেস্ক: ডুরান্ড ফাইনালের ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলের কাছে বিশ্রিভাবে হারের পর প্রচারমাধ্যমের মুখোমুখি না হয়ে যুবভারতী ছেড়েছিলেন মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট কোচ পানোস। আর বৃহস্পতিবার আইএফএ শিল্ড ফাইনালে ডার্বিতে হারের পর একই আচরণ করেন ইস্টবেঙ্গলের কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস। তিনি মাঠ থেকে সরাসরি সাজঘরে ফিরে যুবভারতী ছেড়ে বেরিয়ে যান সাংবাদিক সম্মেলনে না এসে। কেন এমন করলেন হাবাস, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
ইস্টবেঙ্গল কোচ হাবাস তাঁর আচরণের কোনও ব্যাখা বা অজুহাত দেওয়ার পথে হাঁটেননি। বরং ইনস্টাগ্রামে আইএফএ শিল্ডের সূচী, মাঠ ও আয়োজনের পদ্ধতি নিয়ে বিষ্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ কের হাবাস বলেছেন, ‘ আমি একজন সিরিয়াস পেশাদার মানুষ। বিশ্বের সব কোচের মতোই। আমি কখনও জিতে, কখনও হারি। কিন্তু আমার নীতি অনুযায়ী কেউ আমার সঙ্গে সার্কাসের জন্তুর মতো আচরণ করবে, এটা মেনে নিতে পারব না। কিন্তু এই টুর্নামেন্টটা ( শিল্ড) আমাকে তেমন অনুভূতি দিয়েছে। টুর্নামেন্টের সময, সূচী, খেলার মাঠ, রেফারি নিয়োগ দেখে বলতে বাধ্য হচ্ছি এই টুর্নামেন্টে সিরিয়াসনেস ও পেশাদারিত্বের অভাব ছিল। পেশাদারদের প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখানো হয়নি। আমি এমন একটা টুর্নামেন্টে খেলাটা মানতে পারছি না।’
ইস্টবেঙ্গল কোচ হাবাসের এই ক্ষোভ অমূলক নয়। কারণ তাঁর দলের ফুটবলারদের এবার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে হচ্ছে। কলকাতা লিগে যদিও বা রিজার্ভ টিমের ফুটবলার খেলিয়েছে ইস্টবেঙ্গল, কিন্তু ডুরান্ড বা শিল্ডে সিনিযারদের ব্যবহার করা ছাড়া উপায় ছিল না। কারণ দু’টি টুর্নামেন্টের ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। তাদের বিরুদ্ধে রিজার্ভ টিমের ফুটবলারদের তো আর খেলিয়ে ডার্বি হারের লজ্জা গায়ে মাখা চলে না। সেটা করলে সদস্য-সমর্থকদের আবেগের সঙ্গে খেলা হয়ে যেত। আবার সিনিয়র ফুটবলারদের খেলানো নিয়েও একটা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ইস্টবেঙ্গল কোচ হাবাসকে। কলকাতা লিগ, ডুরান্ড কাপ ও শিল্ডের বাইরে তাঁর দলকে খেলতে হচ্ছে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টায়ার টু-র ম্যাচ। মূল পর্বে খেলার সুযোগ পেতে হাবাসের দলকে প্লেঅফের গন্ডি পেরোতে হয়েছে। তার জন্য একটা কঠিন প্রতিপক্ষকে হারাতে হয়েছে।
এতো গেল ইস্টবেঙ্গলের নিজের ক্লাব পর্যায়ের খেলার বিষয়টা। এর বাইরে ইস্টবেঙ্গলের চার ফুটবলারকে জাতীয় দলের শিবিরে যোগ দিতে হয়েছিল। তার সঙ্গে ভারতীয় দলের জার্সি গায়ে পানামা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ের মতো তিনটি হাই ইনটেনসিটির ম্যাচ খেলতে হয়েছে খুব অল্প সমযের মধ্যে। এতে জাতীয় দলে থাকা খেলোয়াড়দের শরীরে ক্লান্তি আসাটা স্বাভাবিক। সবচেয়ে উরুগুয়ে ম্যাচের দু’দিনের মধ্যে জাতীয় দলে থাকা চার ফুটবলার গোলকিপার প্রভুসুখন, ডিফেন্ডার আনোয়ার, জয় গুপ্তা ও ফরোয়ার্ড এডমুন্ডের পক্ষে শিল্ড ফাইনালের ডার্বি খেলা কোনমতেই বিজ্ঞানসম্মত ছিল না। শরীর যখন ক্লান্ত থাকে, তখন পেশি তৈরি থাকে না অতিরিক্ত লোড নেওয়ার জন্য। এতে চোট লাগার সম্ভাবনা থেকে প্রবল। ইস্টবেঙ্গল কোচ হাবাস এটা বোঝেন বলেই, শিল্ড ফাইনালের ডার্বিতে শুরুতে এডমুন্ড ও জয়কে রাখলেও, পরে তুলে নেন। একেবারেই নামাননি দলের সেরা স্টপার আনোয়ারকে। হাবাসের এই সিদ্ধান্ত একেবারের সঠিক।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কেন আনোয়ারকে নামাননি হাবাস? তাঁদের জন্য একটাই উত্তর, আনোয়ার দেশের জার্সিতে পানামা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ে ম্যাচে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। এবার ক্লান্ত শরীরে শিল্ড ফাইনালের ডার্বিতে যদি চোট পেয়ে যেতেন, তাহলে ১৩ অক্টোবর ঘরের মাঠে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টায়ার টু-র দ্বিতীয় ম্যাচে আল শোরতার বিরুদ্ধে আনোয়ারের খেলার সম্ভাবনা থাকত কিনা বলা মুশকিল। আর চোট যদি বেশি হত, তাহলে আইএসএলের ম্যাচে আনোয়ারের খেলা কঠিন হয়ে যেত। কবে ফিট হতেন কে বলতে পারে? তখন কোচ হাবাসের অনেক পরিকল্পনাই ভেস্তে যেত। আর হাবাস এমন একজন কোচ যিনি ই কলকাতা লিগ, ডুরান্ড বা শিল্ড নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামান না। তাঁর লক্ষ্য থাকে আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হওয়া। কারণ লিগ শিল্ড জিতলে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার সুযোগ মেলে দলের।
তাই হাবাসের ক্ষোভ প্রকাশের কারণ থাকলেও, এবার লিগ ও শিল্ডের আয়োজন নিয়ে আইএফএর কিছু করার ছিল না। কারণ আইএফএকে কলকাতা লিগ ও শিল্ড করতে হয়, অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে। বারবার বলেও আইএফএ তাদের ঘরোয়া দুই টুর্নামেন্টের জন্য আলাদা করে স্লট পাননি আইএফএ সচিব অনির্বান দত্ত এআইএফএফের কাছে। বরং ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন একটা বার্ষিক সূচী ঘোষণা করে দেয়, রাজ্য ফুটবল সংস্থাগুলির কথা মাথায় না রেখে। এতে সমস্যায় পড়ে রাজ্য ফুটবল সংস্থাগুলো। তাও অন্য রাজ্যে ততটা সমস্যা হয় না। কারণ সেখানে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের মতো জনপ্রিয় দল থাকে না। তার থেকে বড় কথা, ইদানিং কলকাতায় ডুরান্ড কাপের আসর বসায়, ফৌজি শাসন , বলা ভাল ডুরান্ডের আয়োজক ফোর্ট উইলিয়াম কর্তৃপক্ষের কোপ থেকে বাঁচতে ইসটবেঙ্গল ও মোহনবাগানকে এই টুর্নামেন্টে খেলতেই হয়। ফলে কলকাতা লিগ ও শিল্ডের আয়োজনের জন্য জন্য পর্যাপ্ত সময় আইএফএর হাতে থাকে না। কারণ মিলিটারি নিয়মে কলকাতা ময়দান ১ থেকে ১৫ অক্টোবর বন্ধ থাকে।
তারওপর এবার ১৫ তারিখের পর দুর্গা পুজোর মুডে চলে যাবে শহর। কোনওরকম বড় ধরনের মাচ করার জন্য পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি মিলবে না। এবার আইএফএর কাছে একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছিল মাঠ পাওয়া। অন্য যে কোনও ম্যাচ কিশোরভারতী, বারাসত, বারাকপুর বা কল্যানীতে আয়োজন করে ফেলা যায়, কিন্তু মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল পুরো শক্তির দল নিয়ে খেলা ডার্বি করা কখনওই সম্ভব ছিল না। সেই সমস্যাটাই এবার বড় করে দেখা দেয়, ভারতের সঙ্গে ব্রাজিল ও উরুগুয়ে ম্যাচের জন্য যুবভারতীর মাঠ ৬ অক্টোবর পর্যন্ত আটকে থাকায়। তারপরও এআইএফএফ যুবভারতীর মাঠের সিনিয়র ভারতীয় মহিলা দলের সঙ্গে রাশিয়ার ম্যাচ করার জন্য মাঠ ১১ তারিখ পর্যন্ত আটকে রাখতে চেয়েছিল। সেটা যদি হত, তাহলে শিল্ড ফাইনালের ডার্বি আয়োজন সম্ভবই হত না আইএফএর পক্ষে। শিল্ড অসম্পূর্ণ থেকে যেত। কারণ ৮ অক্টোবরের পর ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানের আর কেউ ফাইনাল খেলত না। মোহনবাগানের আইএসএলের প্রথম ম্যাচ নর্থ ইস্টের বিরুদ্ধে গুয়াহাটিতে ১২ অক্টোবর। তারা ১১ অক্টোবর কলকাতা থেকে রওনা হবে। আর ইস্টবেঙ্গল খেলবে যুবভারতীতে আল শোরতার বিরুদ্ধে ১৩ অক্টোবর। রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রককে ধরে শেষপর্যন্ত ভারতীয় মহিলা দলের রাশিয়ার সঙ্গে ম্যাচ দুটিকে কিশোরভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সরিয়ে শিল্ড ফাইনাল সফলভাবেই আয়োজন করেন আইএফএ সচিব অনির্বাণ দত্ত। সেটা না পারলে, অনেকেই বসেছিলেন সমালোচনায় তাঁকে বিঁধবেন বলে।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
