অলস্পোর্ট ডেস্ক: ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন মাত্র ২৪ ঘণ্টাই পেরিয়েছে। তার মধ্যেই সাংবাদিকদের ডাকে স্বপরিবারে ক্রীড়া সাংবাদিক ক্লাবে হাজির। এক কথায় বিতর্কীত চরিত্র। কখনও তিনি নিজে যেঁচে বিতর্কে জরিয়েছেন আবার কখনও বিতর্ক অজান্তেই পিছু নিয়েছে। কিন্তু কখনওই কেরিয়ারের কথা ভেবে সত্যিটা বলতে পিছপা হননি তিনি। তিনি বাংলার ক্রিকেটের বর্ণময় চরিত্র মনোজ তিওয়ারি। রবিবারই রঞ্জি ট্রফি দিয়ে ঘরের মাঠেই কেরিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন মনোজ। বাংলা দলের অধিনায়ক হয়েই অবসর নিলেন তিনি। এরপর ক্রিকেটের সঙ্গে কীভাবে জরিয়ে থাকবেন তা নিয়ে ভাববেন কিন্তু আপাতত রাজনীতিতেও বড় দায়িত্বে রয়েছেন আর পুরনো অভ্যেস মানুষের পাশে থাকা, সেটা চালিয়ে যেতে চান। তবে মুখের উপর সত্যিটা সহজ করে বলে দেওয়ার রোগটা কিন্তু শেষ দিনেও একই। বলছিলেন ,”অবসরের দিন সবাইকে দেখি চোখের জল ফেলতে ফেলতে মাঠ ছাড়ে, আমিও তেমনটাই ভেবেছিলাম আমার সাথেও তাই হবে। কিন্তু হল না কারণ আমি তখন ভাবছিলাম শেষ ম্যাচেও আম্পায়ার আমাকে ভুল আউট দিল! আমি আউট ছিলাম না। আর ভাবতে গিয়ে দুঃখ পাওয়া হয়নি।” এটাই আসলে মনোজ তিওয়ারি।
২০ বছরের কেরিয়ার রাতারাতি শেষ করে দেওয়া তো আর সহজ ছিল না। কিন্তু তিন তো মনোজ, কঠিন সিদ্ধান্তটাও সহজভাবে নিয়ে ফেললেন। বলছিলেন, “অবসরের সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি সময় লাগেনি। শরীর জনান দেয় কখন থামতে হবে। হাঁটুর চোট আমাকে বলল এবার তোকে থামতে হবে। অনেক খেলেছিস, এবার বিশ্রাম দে।” বেশ সুন্দর করেই বুঝিয়ে দিলেন ১০ হাজার রানের মালিক, যে শরীর এখন জবাব দিয়ে দিচ্ছে। এবার সরে দাঁড়ানোর পালা। তার আগেই অবশ্য মনোজের স্ত্রী সুস্মিতা জানিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে চোট মনোজকে বার বার থমকে দিয়েছে বার বার। আবার তার পরও কীভাবে লড়াই করে ফিরে এসেছেন এই ক্রিকেটার। আর সেই লড়াইয়ের কঠিন সময়গুলোর কথা বলতে গিয়ে এখনও গলায় সেই উদ্বেগ যে ধরা পড়ল মনোজের জীবনসঙ্গীনির।
তবে বিতর্ক কোথায় যাবে? যেখানে মনোজ সেখানে কিছু না কিছু বিতর্কীত প্রসঙ্গ তো চলে আসবেই। যখন পুরোদমে খেলার সময় কাউকে পাত্তা দেননি এখন তো উড়িয়ে ছক্কা হাঁকানোর সময় তাঁর। নিজেই মেনে নিলেন, তাঁর এই স্বভাবের জন্যই তিনি অনেক সুযোগ নষ্ট করেছেন। বলছিলেন, “কেকেআর-এ থাকার সয় গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে ঝামেলা হয়ে গেল। দিল্লিতে গিয়ে কোচের সঙ্গে। ঝামেলার পর আমাকে যে কেউ দলে রাখবে না সেটা তো জানাই ছিল। তখন আমি পেতাম প্রায় ২.৮ কোটি। এবার কেকেআর-এর তিন বছরের সঙ্গে এই টাকাটা গুন করলে কত দাঁড়ায়, আমি সেটা মিস করেছি।”
তার জন্য একটা সময় আফশোসও যে হয়নি তা নয়। সেটা মেনে নিলেন মনোজ নিজেই। বলছিলেন, “যখন হাটু সমস্যায় জর্জরিত হয়ে খেলার বাইরে তখন মনে হয়েছে।” তবে টাকার কথা ভেবে কখনও কিছু করেননি তিনি। তাই হয়তো বার বার ঠেকে গেলেও নিজের দর্শন থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। এটাই হয়তো মনোজ তিওয়ারিকে কোথাও বাকিদের থেকে আলাদা করে দেয়। জাতীয় দল থেকে আইপিএল, যোগ্যতা অনুযায়ী সুযোগ যে তিনি পাননি তা অতি বড় বিশেষজ্ঞরাও জানেন। তাই হয়তো একটা শেষ প্রশ্ন করতে চান মহেন্দ্র সিং ধোনিকে।
অবসরের পরের দিন সেই কথাটটা সদর্পে বলে গেলেন। এতদিন তেমনভাবে সুযোগ পাননি। দেশের জার্সিতে। ২০০৮ থেকে। ২০১৫-র মধ্যে ১২টি একদিনের ম্যাচ খেলেছে। তিনি। করেছেন ২৮৭ রান। ২০১১-১২–তে খলেছেন তিনটি টি২০। আইপিএল—এ। ৯৮ ম্যাচে ১৬৯৫ রান রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। প্রথমশ্রেণির ক্রিকেটে যা অনেকরই ধরা ছোয়ার বাইরে। ১০ হাজারের ওপরে রা। বল হাতেও সাফল্য রয়েছে তাঁর। ১২ ওডিআই-তে পাঁ উইকেট। ও আইপিএল-এ এক উইকেট রয়েছে তাঁর নামের পাশে। প্রথমশ্রেণির ক্রিকেট ৩২ উইকেট রয়েছে।
কিন্তু তিনি প্রশ্নটা করবেনই ধোনিকে। বলছিলেন, “আমি ধোনিকে একটাই প্রশ্ন করব যখনই দেখা হবে, সেদিন আমি কেন ভারতীয় দলের প্রথম একাদশ থেকে বাদ পড়েছিলাম। তার আগেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে আমি ১০০ রান করেছিলাম। এর আগে সুযোগ পাইনি। এবার দেখা হলেই জিজ্ঞেস করব।” ২০১১ সালের ঘটনা কিন্তু এখনও খচখচানিটা রয়ে গিয়েছে মনোজের ভিতরে।
শুধু কী তাই, মনোজ এদিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ এমনকি সব ক্রীড়া সংস্থা নিয়েও। তিনি বলেন, “শুধু ক্রিকেট নয় আমাদের দেশের যে কোনও ক্রীড়া সংস্থার মাথায় বসে রয়েছেন রাজনীতিকরা। এটা সত্যি। মুখ খুললেই শাস্তি। আমার একটা টুইটের জন্য আমার ২০ শতাংশ ম্যাচ কেটে নেওয়া হয়েছিল। আগে মুখ খুললে হয়তো এত সম্মনের বিদায় হত না। রঞ্জি ট্রফি শেষহলে আরও অনেক কিছু বলার আছে।” আবার তাঁর টুইট-ই বিসিসিআইকে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করেছে বলে মনে করছেন তিনি। হাসতে হাসতে বলছেন, “আমি টুইট করেছিলাম বলেই বিসিসিআই এখন বলছে সবাইকে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে হবে। এটা অনেকদিন আগেই ভাবা উচিত ছিল। এই প্রজন্মের ক্রিকেটাররা শুধু আইপিএল খেলতে চায়।”
পাশাপাশি বিসিসিআই-এর সূচি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মনোজ। নিজেই উদ্যোগ নিয়ে এই বিষয়ে কথা বলবেন তিনি। এই প্রজন্মকে আইসিসি ট্রফির গুরুত্ব বোঝাতে হবে বলে মনে করেন। ঘরের মাঠে একটা টেস্ট জয় বা একটা দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয় দিয়ে সাফল্যের বিচার হয় না তাঁর কাছে। বিশ্বাস করেন, আমাদের দেশে প্রতিভার অভাব নেই যা অস্ট্রেলিয়ার কাছেও নেই। এখানে রয়েছে সঠিক মানসিকতার অভাব। এই মানসিকতা বদলাতে কতটা ভূমিকা নিতে পারবেন তিনি এখন সেটাই দেখার। শুধু আফশোস একটাই, “খেলোয়াড় হিসেবে জেতা হল না রঞ্জি ট্রফি। দেখি যদি ভবিষ্যতে কখনও কোচ বা মেন্টর বা অন্য কোনও ভূমিকায় এই সাফল্য দিতে পারি বাংলাকে।”
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
