অলস্পোর্ট ডেস্ক: সেমিফাইনালের মহড়া বা নিজেদের পরখ করে নেওয়ার ম্যাচ, যাই বলুন, মঙ্গলবার কুয়েতের বিরুদ্ধে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৩ লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ কিন্তু থাকছেই। তাও আবার একটা নয়, দু-দু’টো। এক, জিতে গ্রুপের সেরা দল হওয়ার চ্যালেঞ্জ। দুই, টানা জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ। চলতি বছরে মাঠে নামার পর থেকে গোল না খেয়ে জেতার যে অভ্যাস করে ফেলেছে ভারতীয় ফুটবল দল, সেই অভ্যাস এই ম্যাচেও রাখতে চায় ছেত্রী-বাহিনী।
টুর্নামেন্টের দুই অপরাজিত দল মুখোমুখি হলে সেই দ্বৈরথে যে উত্তেজনার আঁচ পাওয়া যাবে, এমনই ধরে নেওয়া যায়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বেঙ্গালুরুর কান্তিরাভা স্টেডিয়ামেও সে রকমই একটা ফুটবল-দ্বৈরথ দেখার আশায় গ্যালারিতে ভিড় করবেন ফুটবলপ্রেমীরা।
দুই দলই টানা দুই ম্যাচে জয় পেয়ে ছয় পয়েন্ট অর্জন করে সেমিফাইনালে জায়গা পাকা করে ফেলেছে। তাই এই ম্যাচে কোনও দলই অযথা ঝুঁকি নিতে যাবে না ঠিকই। তবে এটাও ঠিক যে, গ্রুপসেরা হিসেবে সেমিফাইনালে উঠলে শেষ চারের লড়াইয়ে অপর গ্রুপের দ্বিতীয় সেরার মুখোমুখি হতে হবে তাদের।
এই গ্রুপের সেরা দুই দল নির্ধারিত হয়ে গেলেও অপর গ্রুপের লড়াই এখনও চলছে। লেবানন দুই ম্যাচ জিতেও সেমিফাইনালে জায়গা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেনি। জোর লড়াই বেধেছে বাংলাদেশ ও মলদ্বীপের মধ্যে। দুই দলই দুই ম্যাচ থেকে তিন পয়েন্ট অর্জন করে বসে রয়েছে। বুধবার যদি লেবাননকে হারিয়ে দেয় মলদ্বীপ এবং বাংলাদেশ হারায় ভুটানকে, তা হলে তিন দলেরই পয়েন্ট দাঁড়াবে ছয়। তখন কোন দুই দল শেষ চারে যাবে, সেটাই দেখার।
প্রতিপক্ষ কঠিন
তবে ভারত বা কুয়েতকে তাদের কাজটা করে রাখতে হবে। লেবাননকে নিয়ে কুয়েতের চাপ থাকতে পারে, ভারতের তেমন নেই। কারণ, হিরো ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে তাদের বিরুদ্ধে পরপর দুটি ম্যাচ খেলে লেবানিজদের নাড়ি-নক্ষত্র সব জানা হয়ে গিয়েছে। ফের সাফ সেমিফাইনালে যদি তাদের মুখোমুখি হয় ভারত, তা হলে আর আলাদা করে হোমওয়ার্ক সারতে হবে না সুনীল ছেত্রীদের।
তবে আপাতত ভারতীয় শিবিরের ফোকাস একটাই কুয়েত। যারা এই টুর্নামেন্টে নেপালকে ৩-১-এ ও পাকিস্তানকে ৪-০-য় হারিয়ে লিগের শেষ ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি। বিশ্ব ক্রম তালিকায় ১৪৩ নম্বরে থাকলেও দলটা ছুটছে কিন্তু তাজা ঘোড়ার মতো। তাদের পারফরম্যান্স দেখে মনে হচ্ছে ৯৯ নম্বরে থাকা লেবানন ও ১০১ নম্বরে থাকা ভারতের চেয়ে কোনও অংশে কম যায় না তারা।
ভারতের কোচ ইগর স্টিমাচের মতে, “গ্রুপ সেরা হয়ে সেমিফাইনালে অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়া ছাড়া এই ম্যাচের আর কোনও গুরুত্ব নেই। আমরা অন্য সব ম্যাচের মতোই গুরুত্ব দিচ্ছি এই ম্যাচকে। ক্লিন শিট বজায় রাখাই আমাদের প্রথম লক্ষ্য। ড্র হলেও অসুবিধা নেই। আসল লক্ষ্য ফাইনালে ওঠা এবং চ্যাম্পিয়ন হওয়া”।
উন্নতি প্রয়োজন
পাকিস্তানকে অনায়াসে চার গোলে হারালেও নেপালকে দু’গোলে হারাতে ভারতকে বেশ বেগ পেতে হয়। গতবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের দুই ফাইনালিস্টের লড়াইয়ে জিতলেও ভারতের পারফরম্যান্স সে দিন প্রত্যাশার স্তর ছুঁতে পারেনি। নেহাত ভারতীয় দলের রক্ষণ এখন বেশ ভাল অবস্থায় রয়েছে, তাই তারা কোনও গোল খায়নি। কিন্তু নেপাল যে ভাবে ম্যাচের ৬০ মিনিট পর্যন্ত ভারতকে আটকে রেখেছিল, তা সুনীল ছেত্রী ও তাঁর দলকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে। উপরন্তু নেপালের একাধিক আক্রমণ আটকাতে রীতিমতো বেগ পেতে হয় ভারতীয় রক্ষণকে। ম্যাচের পরে সে কথা স্বীকারও করে নেন ভারত অধিনায়ক সুনীল।
কোচ স্টিমাচও বলেন, “সে দিন আমরা প্রথমার্ধে পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারিনি বলে ভাল খেলা হয়নি। কড়া মার্কিং যেমন করতে পারেনি ছেলেরা, তেমনই এরিয়াল বলের লড়াইয়েও পিছিয়ে ছিলাম। দ্বিতীয়ার্ধে কিছু কিছু জায়গায় পরিবর্তন করে ভাল ফল পাওয়া যায়। কিছু দুর্দান্ত মুভ এবং পাসিং হয় এই অর্ধে”।
মঙ্গলবার শক্তিশালী কুয়েতের বিরুদ্ধে ভারতকে পারফরম্যান্সের মান আরও বাড়াতে হবে। মাঝমাঠ ও আক্রমণ বিভাগকে আরও আক্রমণাত্মক, গতিময় ও তৎপর হতে হবে। কুয়েতের রক্ষণও যথেষ্ট শক্তিশালী। সেই রক্ষণে চিড় ধরাতে গেলে ভারতীয় অ্যাটাকারদের নিজেদের সেরাটা দেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। কিন্তু তাদের আক্রমণের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সুনীল ছেত্রীকে শুরু থেকেই নামাবেন কি না ভারতীয় কোচ ইগর স্টিমাচ, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপের শেষ লিগ ম্যাচেও তাঁকে বিশ্রাম দেওয়া হয়। শেষ দশ মিনিটের জন্য ডাগ আউট থেকে নামানো হয়েছিল।
ছেত্রীর সঙ্গে নজরে আরও এক
সুনীল ছাড়াও আরও একজনের দিকে এখন নজর রয়েছে ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের। তিনি নাওরেম মহেশ সিং। ইস্টবেঙ্গল এফসি-র এই মণিপুরী তরুণ এখন ভারতীয় দলের নয়া তারকা। নেপালের বিরুদ্ধে তাঁর অসাধারণ ক্রসেই গোল করেন সুনীল ছেত্রী। দ্বিতীয় গোলটি করেন স্বয়ং মহেশ। এই পারফরম্যান্সের পর থেকে তিনিই এখন ভারতীয় ফুটবলের নতুন তারকা। সেমিফাইনালের কথা ভেবে তাঁকেও বিশ্রাম দেওয়া হবে, না তাঁর ছন্দ বজায় রাখতে এই ম্যাচেও তাঁকে খেলানো হবে কি না, সেটাই প্রশ্ন।
গত ম্যাচে প্রথম এগারোয় আটটি পরিবর্তন করে দল নামিয়েছিল ভারত। এই ম্যাচেও যে একাধিক পরিবর্তন হবে, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এমন দলই নিশ্চয়ই নামাবেন স্টিমাচ, যারা কুয়তকে কড়া চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারবে। সে জন্য গোলদাতার সংখ্যাও বাড়াতে হবে ভারতকে। ভারতের প্রতি ম্যাচে শুধু সুনীল ছেত্রীই গোল করছেন, বাকিরা শুধু গোলের সুযোগ তৈরি করেও তা হাতছাড়া করছেন। এমন চলতে থাকলে ভারতীয়দের সাফ ফাইনালের আগেই বড় ধাক্কা খেতে হতে পারে। দলের আক্রমণ বিভাগের অন্যতম সেরা স্তম্ভ সহাল আব্দুল সামাদ তা স্বীকারও করে নিয়েছেন। তাঁর মতে, “শুধু সুনীল ভাইয়ের গোলের দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না, আমাদের সবাইকে গোল করতে হবে”।
কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে
ভারতের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত যে তিনটি ম্যাচ খেলেছে কুয়েত, তার মধ্যে দুটিতে জিতেছে তারা, একটিতে হেরেছে। দুই দল শেষ মুখোমুখি হয়েছে ২০১০-এর নভেম্বরে, আবুধাবিতে এক ফ্রেন্ডলি ম্যাচে। সেই ম্যাচে ৯-১-এ জিতেছিল কুয়েত। চলতি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ভাল ছন্দে রয়েছে তারা। নেপালের বিরুদ্ধে একটি গোল খাওয়া ছাড়া আর কোনও গোল খায়নি, কিন্তু করেছে সাতটি। বছরের শুরুতে তারা গালফ কাপে খেলে। সেখানে কাতারের কাছে ০-২-এ হারে, আরব আমিরশাহীকে ১-০-য় হারায়, বাহরিনের সঙ্গে ১-১ ড্র করে। মার্চে দুটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচে ফিলিপিন্সকে ২-০-য় হারায় কুয়েত এবং তাজিকিস্তানকে ২-১-এ হারায়। বেঙ্গালুরুতে আসার আগে জাম্বিয়াকে ৩-০-য় হারিয়ে আসে তারা। গত আটটি ম্যাচের মধ্যে সাতটিতেই জিতেছে কুয়েত।
এরকম একটা জয়ের ছন্দে থাকা দলকে যে কোনও কারণেই হালকা ভাবে নেওয়া যায় না, তা খুব ভাল করেই জানে ভারতীয় শিবির। স্টিমাচের মতে, “ক্রমতালিকায় ওদের যা অবস্থান, তা মোটেই ওদের সঠিক অবস্থা প্রকাশ করে না। গত ছ’মাসে ওরা এশিয়ার শক্তিশালী দলগুলোর বিরুদ্ধে দুর্দান্ত খেলেছে। যথেষ্ট উঁচু মানের দল ওরা”।
অন্য দিকে, কুয়েতের পর্তুগীজ কোচ রুই বেনতোর মতে, “আমাদের বল পজেশন আরও বাড়াতে হবে। এখানে আসার আগে আফ্রিকার কয়েকটি শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে খেলেছি আমরা। এই আবহাওয়ায় খেলা বেশ কঠিন। কারণ, এখানকার আর্দ্রতা বেশি। তা সত্ত্বেও যে দলের ছেলেরা প্রথম দুই ম্যাচে ভাল খেলেছে, সে জন্য ওদের অভিনন্দন”। দ্বিতীয় ম্যাচেও তারা ন’টি পরিবর্তন করে প্রথম দল নামায়। তাও জেতে তারা। অর্থাৎ, ভারতের মতো তাদেরও রিজার্ভ বেঞ্চ শক্তিশালী। কোচের মতে, “আমাদের লক্ষ্য ভারতকে হারানো নয়, নিজেদের উন্নতি। সেটাই করতে চাই আমরা”।
(লেখা ও ছবি আইএসএল ওয়েবসাইট)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
