অলস্পোর্ট ডেস্ক: মঙ্গলবারের রাত পোহালেই এক বিষন্ন মুহূর্তের সাক্ষী হবেন আর্জেন্টিনার মানুষ সহ গোটা বিশ্বর ফুটবলপ্রেমীরা। কারণ ভারতীয় সময় বুধবার ভোর সাড়ে ৪টেয় শেষবারের মতো আর্জেন্টিনা জার্সিতে খেলতে নামবেন ফুটবলের রাজপুত্র লিওনেল মেসি। ২১ বছরের বর্ণময় ফুটবল জীবনের অবসান ঘটবে মেসির বুয়েনস এয়ারসের এস্তাদিও মাস মনুমেন্টালে বেনিনের বিরুদ্ধে ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচে।
৩৯ বছর বয়সী মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের কথা ঘোষণা করেছিলেন ৩১ আগস্ট, ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর। তবে তাঁর বিদায়টা স্মরণীয় করে রাখতে চেয়েছিল আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। একইসঙ্গে সারা বিশ্বজুড়ে থাকা মেসি ভক্তরাও। আর তাই বেনিন ম্যাচে মেসির জাদু দেখার আকাঙ্খা নিয়ে ভক্তের দল ভিড় করবেন বলাই বাহুল্য, তাঁরা মেসির পা থেকে গোল আসুন এটাও চান। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে আর্জেন্টিনা ২ নম্বরে, বেনিন সেখানে ৮৯। বেনিনের কোচের দায়িত্বে রয়েছেন ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপে নাইজেরিয় দলকে নেতৃত্ব দেওয়া গারনট রোর। আর আর্জেন্টিনার দলের কোচের ভুমিকায় থাকছেন বিশ্বকাপজয়ী কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি আগেই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, মেসির বিদায়ী ম্যাচে কোচ হিসেবে শেষবারের মতো থাকতে চেয়ে। এরপর স্কালোনি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচ থাকবেন কিনা, সেটা ঠিক হবে তাঁর আর আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে কর্তাদের সঙ্গে আলোচনায়।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়ে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসির পাশাপাশি ডিফেন্ডার নিকোলাস ওটা মেন্ডির বড় ভুমিকা ছিল। তিনিও বেনিন ম্যাচের শেষে নিজের বুট জোড়া বরাবরের মতো তুলে রাখবেন। এমনকি আর্জেন্টিনা দলের মিডফিল্ডার রডড্রিগো ডি পল ও জিওভানি লো সেলসোকেও আর্জেন্টিনার জার্সিকে শেষবারের মতো খেলতে দেখার সম্ভাবনা প্রবল।
আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচ খেলে মেসি করেছেন ১২৫ গোল। মেসির দখলে রয়েছে ২০০৮ বেজিং অলিম্পিক্সের সোনার পদক, ফিফা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ট্রফি, ২০১৪ ও ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে রানার্স, ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন ও ২০২২ ফিনালিসিমা জেতার কৃতিত্ব। একজন ফুটবলার আর কী চাইতে পারেন তাঁর খেলোয়াড় জীবনে?
বাংলার মানুষ সহ আর্জেন্টিনার অগনিত মেসি ভক্তের সঙ্গে বিশ্বের ফুটবলপ্রামীরা শেষবারের জন্য ফুটবলের রাজপুত্রের পায়ের জাদু আর গোল দেখতে মাঠে বা টিভির পর্দায় চোখ রাখবেন। কিন্তু তাঁদের অনেকের হয়ত মনে নেই, মেসির অভিষেক ম্যাচের এক বিশেষ ঘটনার কথা। যেটা মেসিও বাকি জীবনে মনে রেখেছেন বলে মনে হয় না। আর না হলে বলতে হয়, অভিষেক ম্যাচের সেই ঘটনাই মেসিকে মহান করে তুলেছে, গ্রেটেস্ট অব অল ফুটবলারের আসনে বসিয়েছে।
মেসি দ্য মসীহার আর্জেন্টিনা সিনিয়র দলের হয়ে অভিষেক ঘটেছিল মাত্র ১৮ বছর বয়সে ২০২৫ সালে ১৭ আগস্ট বুদাপেস্টের হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচে। সিনিয়র দলে খেলার সুযোগ হয়েছিল মেসির ২০০৫ অনূর্ধ্ব ২০ ফিফা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে। মেসি আর্জেন্টিনার জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ফেরেঙ্ক পুসকাস স্টেডিয়ামে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে ওই ম্যাচটা আর্জেন্টিনা জিতলেও সেই রাতটা মেসির অভিষেক মধুর হয়নি। বরং যা ঘটেছিল তা খুব খারাপ। তখন আর্জেন্টিনা দলের কোচ ছিলেন জোস পেকারম্যান। তিনি হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে ম্যাচে লিসান্দ্রো লোপেজের জায়গায় মেসিকে নামান ৬৩ মিনিটে।
মেসি যখন মাঠে নামেন, তখন আর্জেন্টিনা ২-১ গোল এগিয়ে ছিল। ম্যাক্সিমিলিয়ানো রডড্রিগেজের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা প্রথমে। হাঙ্গেরির হয়ে সমতা ফেরান স্যান্ডোর টরঘেলে। গ্যাব্রিয়েল হেইঞ্জের গোলে আবার এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। শেষপর্যন্ত সেই ফলেই জেতে। তবে ১০ জনে খেলে। তার বড় কারণ ৬৩ মিনিটের মাথায় মাঠে নেমেই প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লাল কার্ড দেখে মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন মেসি।
মেসি মাঠে নেমে প্রথমবার বল ধরে হাঙ্গেরির ডিফেন্ডার ভিলমস ভ্যানচাককে কাটিয়ে বেরুতে চেষ্টা করেছিলেন। ভিলমস আটকানোর চেষ্টায় মেসির জার্সি টেনে ধরেছিলেন। মেসি ঝটকা দিয়ে বল নিয়ে বেরিয়ে যেতে গিয়ে ভিলমসের হাতে জোরে ধাক্কা দেন। রেফারির পছন্দ হয়নি মেসির সেই মারমুখী মেজাজ। তাঁর মনে হয়েছিল মেসি ইচ্ছাকৃত ভাবে ভিলমসকে আঘাত করতে হাত চালিয়েছেন সজোরে। তাই মেসিকে তিনি অখলোয়াড়োচিত আচরণের জন্য লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন। ফিফার রেকর্ড উল্লেখ আছে বদলি হিসেবে নামার পর মেসি মাঠে ছিলেন ৪২ সেকেন্ড। আর আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের রেকর্ডে আছে মেসি মাঠে ছিলেন ৯২ সেকেন্ড।
তবে মেসি অভিষেক ম্যাচে কতটুক সময় মাঠে ছিলেন, সেটা পরবর্তী সময়ে কোনও প্রভাব ফেলেনি। বরং মেসি আর্জেন্টিনা ও ক্লাব জার্সিতে গোটা বিশ্বকে শাসন করেছেন তাঁর ফুটবল জাদুতে। পেকারম্যান ওই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যে মেসিকে সিনিয়র জাতীয় দলে ডেকে নিয়েছিলেন। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে সিনিয়র দলের হয়ে ২০২৬ সালের ১ মার্চ দেশের জার্সিতে প্রথম গোল করেন মেসি। আর কখনও পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি মেসিকে। ২১ বছরের ফুটবলজীবনে অনেক চড়াই উতরাই এসেছে। কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে মেসি সাফল্যের এভারেস্টের চুড়া ছুঁয়েছেন। এবার শেষবারের মতো নিজের ফুটবল জাদুর মায়াজাল বুনবেন মেসি মাঠে।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
