মুনাল চট্টোপাধ্যায়: ভারতীয় ফুটবল দলের ‘কালো হরিন’ প্রাক্তন অধিনায়ক আইএম বিয়জনের মুখে সদ্য ২০২৬ অস্ট্রেলিয়া এএফসি এশিয়ান কাপের মূল পর্বে যোগ্যতার্জনকারী জাতীয় সিনিয়র মহিলা ফুটবল দলের ভূয়সী প্রশংসা। একইসঙ্গে বিজয়নের মুখে ঘুরে ফিরে আসছে থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে ভারতকে দুরন্ত জয় এনে দেওয়া সঙ্গীতা বাসফোরের কথা।
নিজে দুরন্ত স্ট্রাইকার ছিলেন বিজয়ন। তাঁর সময়কালেই বাইচুংয়ের উত্থান। এই দুই গোলগেটার মিলে ভারতীয় দলের হয়ে অসংখ্য আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করেছেন। পরবর্তী সময়ে এঁদের উত্তরসূরী হিসেবে দারুন ভাবে উঠে আসেন সুনীল ছেত্রী। ভারতীয় সিনিয়র পুরুষ দলে এখনও গোলের জন্য সুনীলের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। গোল করার লোকের অভাব মেটাতে ভারতীয় চিফ কোচের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নেওয়া মানোলো মারকোয়েজ অবসর ভাঙিয়ে সুনীলকে ফেরত এনেছিলেন। ভারতীয় পুরুষ দলে সুনীলের বিকল্প কে হবেন, তা এখনও পরিষ্কার নয়। কিন্তু ভারতীয় মহিলা দলে বেশ কয়েকজন গোলগেটার রয়েছেন, যাঁরা ইতিমধ্যেই নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরেছেন। তাঁদের অন্যতম হলেন বাংলার মেয়ে সঙ্গীতা। হোল্ডিং মিডফিল্ডার পজিশনে খেলেও কল্যানী থেকে উঠে আসা সাফাইকর্মী মায়ের মেয়ে সঙ্গীতার পা ও মাথা থেকে এসেছে থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে মূল্যবান দুটি গোল।
সঙ্গীতার করা দুটি গোল নিয়ে উচ্ছ্বসিত বিজয়ন। ফোনে যোগাযোগ করলে বলেন, ‘ সঙ্গীতার দু’টি গোলের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা ও সুযোগসন্ধানী মনোভাবের পরিচয় মিলেছে। দেখে বুঝলাম, ওর মধ্যে গোল করার একটা বাড়তি খিদে আছে। তারাই গোল করে বেশি, যারা আগে থেকেই গোলের গন্ধ পায়। সঙ্গীতার দ্বিতীয়, ভারতের হয়ে করা জয়সূচক গোলটা তারই ফসল। ও অনেকদূর যাবে। আসলে আমার জীবনের লড়াইয়ের সঙ্গে ওর জীবনযুদ্ধের অনেক মিল আছে। সেই হার না মানা মনোভাবটাই ওর খেলায় প্রতিফলিত হয়েছে দেশের জার্সিতে। এশিয়ান কাপের মূল পর্বেও সঙ্গীতা আর ওর সতীর্থদের কাছে এই একইধরনের পারফরমেন্স আশা করছি। বিশ্বাস রাখি ওরা বিশ্বকাপেও খেলবে।’
বিজয়নের মতে, ভারতীয় মহিলা দলের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটা পরিকল্পনামাফিক ভাবে এগোনোর পদ্ধতি। দেশের মাঠে ২০২২য়ে অনূর্ধ্ব ১৭ বালিকাদের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখান থেকে স্বপ্ন দেখা শুরু সিনিয়র মহিলা বিশ্বকাপে খেলার। ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছে মেয়েদের ফুটবল দলটা বিভিন্ন কোচের হাতে। বর্তমানে ক্রিসপিন ছেত্রীর কোচিংয়ে এশিয়ান কাপের মূলপর্বে খেলার লক্ষ্যপূরণ হয়েছে। এবার এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে এশিয়ান কাপে ভাল পারফরমেন্স করে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নপূরণের পথে এগোনোর মানসকিতা ধরে রাখতে হবে সঙ্গীতাদের।
বাংলার মেয়ে সঙ্গীতার মুখেও বিশ্বকাপে খেলার লক্ষ্যের কথা। জোড়া গোল করে থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয় এনে দেওয়ার পর মাঠের মাঝে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন সঙ্গীতা। পরে আবেগতাড়িত গলায় বলেন, ‘ এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করার অনুভূতি সম্পূর্ণ অন্যরকম। কারণ এশিয়ান কাপের মূল পর্বে কোয়ালিফাই না করলে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নপূরণের সুযোগটাই থাকত না। আমার ও দলের বাকি মেয়েদের এটাই আসল লক্ষ্য। বিশ্বকাপে খেলা। এখন থেকে এটাই হবে ধ্যান জ্ঞান চিন্তা। কোথাও মনের মাঝে একটা বিশ্বাস জন্মেছে, আমরা বিশ্বকাপটা খেলতে পারি।’
নিজের করা দুটি গোল নিয়ে সঙ্গীতার প্রতিক্রিয়া,‘থাইল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে নেমেছিলাম, একটা বাড়তি জোস নিয়ে। জয় ছাড়া কিছু ভাবিনি। জানতাম ড্র করলে পেনাল্টি শুট আউটের ওপর নির্ভর করতে হবে। সেটা লটারির মতো। তাই শুরু করেছিলাম ম্যাচটা ইতিবাচক মেজাজে। প্রথম গোলটা পেয়ে যাই হঠাৎই। বলটা বক্সের বাইরে যেখানে পেয়েছিলাম, তখন একমূহূর্ত দ্বিধায় ছিলাম, গোলে শট নেব, না বল ধরে আর একটু এগোব। তারপর কী মনে হল, অপনেন্ট গোলকিপার জায়গায় নেই দেখে শট নিলাম। বল জড়িয়ে গেল জালে। আমাদের অন্যমনস্কতার কারণে থাইল্যান্ড গোল শোধ করে। তবে হাল ছাড়িনি। শেষপর্যন্ত লড়ে যাওয়ার অঙ্গীকার নি। তাতেই পেলাম দ্বিতীয় জয়ের গোলটা। সিল্কির বাড়ানো বলে মাথা ছুঁইয়ে গোল করার পর নিশ্চিত ছিলাম, জিতেই মাঠ ছাড়ব। সেটা সম্ভব হয়েছে গোটা দলের জন্য। সতীর্থ ফুটবলার, কোচ ক্রিসপিন স্যার, কোচিং স্টাফের অবদান সমান। দু’মাসের কঠোর পরিশ্রমের ফসল।’
সঙ্গীতার মুখে সুনীল ছেত্রীর কথা। বলেন,‘ জাতীয় শিবিরে এসে সুনীল স্যার এসে আমাদের মোটিভেট করেছিলেন। বিশ্বাস জুগিয়েছিলেন আমরা যেকোনও লক্ষ্য ছুঁতে পারি। একটা গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ ছিল তাঁর বক্তব্যে। বলেছিলেন, সবসময় মনে রাখবে, কেন ফুটবল খেলাটা শুরু করেছিলে, আর কীসের জন্য খেলছ? এটা আমাকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল। তখন থেকেই মনের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল, সিনিয়র বিশ্বকাপে খেলার যে স্বপ্ন পুষে রেখেছি মনে, তার কাছাকাছি পৌঁছতেই হবে। এটা তার শেষ ধাপ বলতে পারেন। সুনীল স্যারকে ধন্যবাদ এভাবে তাতানোর জন্য। দলের বাকিদের কাছে, ফেডারেশনের কাছেও কৃতজ্ঞ।’
সঙ্গীতা এশিয়ান কাপের মূল পর্বে পৌঁছে সন্তুষ্ট থাকতে চান না, এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। দেখা যাক, বিশ্বকাপের মূল পর্বে তাঁদের খেলার স্বপ্নপূরণ হয় কিনা। বিজয়ন, বাইচুং, সুনীলরা যেটা এখনও করে উঠতে পারেননি, সেটা সঙ্গীতারা পারলে ভারতীয় ফুটবলের সুনাম ও সম্মান দুটোই বাড়বে আন্তর্জাতিক স্তরে।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
