মুনাল চট্টোপাধ্যায়: শনিবার থেকে টেকিওতে শুরু হয়েছে বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপ। বিশ্বের সেরা দৌড়বাজ ও থ্রোয়াররা নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শনের জন্য টোকিওর মাঠে সেরা দিতে নেমে পড়েছেন। সকলেই যে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবেন বা পদক জিতবেন এমন নয়, কিন্তু এই মঞ্চটা নিজেদের কাছেও একটা বাড়তি চ্যালেঞ্জ, সেরা দেওয়ার, নিজেদের পারফরমেন্সের মূল্যায়ন করার।
ভারতের ১৪ জন পুরুষ ও ৫ জন মহিলা অ্যাথলিট এবার টোকিও বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা পরপর দু’টি অলিম্পিকে সোনা ও রুপোজয়ী জ্যাভেলিন থ্রোয়ার নীরজ চোপরার আছে। পদক তিনি জিতবেনই অঘটন কিছু না ঘটলে। বাকিদের মধ্যে পদক জয়ের সম্ভাবনা কম, তবে নীরজ বাদে ভারতের ৪ জন অ্যাথলিটের দিকে বিশেষ নজর থাকবে। এঁরা হলেন স্প্রিন্টার অনিমেষ কুজুর, লং জাম্পার মুরলি শ্রীশঙ্কর, দূরপাল্লার দৌড়বীর গুলবীর সিং ও মহিলা জ্যাভেলিন থ্রোয়ার অন্নু রাণী।
নিঃসন্দেহে পুরুষ জ্যাভেলিন ইভেন্টে ভারতের সেরা বাজি নীরজ চোপড়া। প্যারিস অলিম্পিকে একবারে সামনে থেকে দেখেছি, কীভাবে চোট নিয়েও পদক জয় নিশ্চিত করেছিলেন নীরজ স্রেফ ট্যাকটিক্স ও টেকনিক কাজে লাগিয়ে। টোকিও অলিম্পিকে সোনা জয়ের পর প্যারিসে রুপো জিতে তাঁর মধ্যে কোনও হতাশা ছিল না। বরং প্রতিযোগিতা শেষে পদক গলায় মিক্সড জোনে এসে হাসিমুখে বলেছিলেন, ‘পদকহীন হওয়ার চেয়ে রুপো পাওয়া অনেক ভাল। আর দিনটা আর্শাদ নাদিমের ছিল। ও প্রথমেই এমন থ্রো করে, যা ও নিজেও আগে কোনওদিন পারেনি। পরে কবে পারবে, সেটা ও নিজেও জানে না। কিন্তু আমি আমার লিমিটেশন জানতাম। একবছরের ওপর একটা চোট আমাকে ভোগাচ্ছে। সেটা ম্যানেজ করে এতদিন চালিয়ে এসেছি। প্যারিসে পদক জয়ের লড়াইয়ে নেমেছিলাম। চোটের কথা মাথায় রেখে বাড়তি এফর্ট দিতে চেষ্টা করিনি। তাতে রুপো এসেছে। বাড়তি কিছু করতে গেলে সেটাও ফসকে যেত। নাদিমের সঙ্গে ভবিষ্যতে আবার দেখা হবে জ্যাভেলিন ছোঁড়ার প্রাঙ্গনে। তখন দেখা যাবে, কে জেতে?’
চোট সারিয়ে এখন রীতিমতো চনমনে নীরজ। তাঁর সঙ্গে এবার টোকিও বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের আসরে আছেন আরও তিন পুরুষ জ্যাভেলিন থ্রোয়ার। নীরজ ছাড়া বাকিদের পদক জয়ের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে নীরজের কাছে এই চ্যাম্পিয়নশিপটা বাড়তি চ্যালেঞ্জের। কারণ এখানে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন আর্শাদ নাদিম যেমন আছেন, তেমন জুলিয়ান ওয়েবার। দোহা ডায়মন্ড লিগে প্রথমবার ৯০ মিটার মার্ক( ৯০.২৩ মিটার) অতিক্রম করে জ্যাভেলিন ছুঁড়েও সোনা জিততে পারেননি নীরজ। আরও বেশি দূরত্বে জ্যাভেলিন ছুঁড়ে বাজিমাত করেন ওয়েবার। এতেও হতাশভাব দেখাননি নীরজ। বরং বেশ শান্তভাবেই বলেছেন, ‘ এটাই স্বাভাবিক। আমি নিজের সেরা দিয়েছি। ওয়েবার তার থেকেও ভাল ছুঁড়েছে। টোকিওতে আবার দেখা হবে। তখন সেই দিনের সেরা পারফরমেন্স বলে দেবে কে সোনা জিতবে। তবে এবার আমি আগের তুলনায় বেশ ভাল ছন্দে আছি। অনুভব করছি সোনা জয়ের মতোই পারফরমেন্স করতে পারব।’ বলাই বাহুল্য টোকিওতে থাকলেও দুই তারকার মনে পড়ে থাকবে দুবাইয়ে অনুষ্ঠেয় এশিয়া কাপে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটের মেগা ম্যাচের দিকে।
নজর থাকবে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়শিপে ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়ার মুখে দাড়ানো অনিমেষ কুজুরের দিকে। তাঁর ফোকাস অবশ্য বেশি থাকবে ২০০ মিটার দৌড়ে। এতে তাঁর সেরা সময় ২০.৩২ সেকেন্ড। তাঁর অংশগ্রহণ নিয়ে কোচ মার্টিন ওয়েন্স বলেছেন, পদক জেতার থেকেও কুজুরের কাছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের মতো বড় মঞ্চে নিজের নার্ভ ধরে রেখে সেরা দেওয়াটা বেশি জরুরি। বিশ্বের সেরাদের সঙ্গে দৌড়ে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করা। কে বলতে পারে, টোকিওতে সেরা সময় করে পদক জিতে ফেলবে না।
লংজাম্পার মুরলি শ্রীশঙ্করের মাঠে ফেরার কাহিনীটা ভারতের প্রতিটি অ্যাথলিটের জন্য এক বিশেষ প্রেরণা। সিরিয়াস হাঁটুর চোটের জন্য দীর্ঘসময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। মনে হয়েছিল, খেলাধুলো ছাড়তে হবে। কিন্তু স্রেফ মনের জোর, অধ্যাবসায়, শৃঙ্খলা ও কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে মাঠে ফিরে মুরলি বুঝিয়েছেন, নাথিং ইজ ইমপসিবল। ভুবনেশ্বরে ইন্ডিয়ান ওপেনে বছরের সেরা লাফ(৮.১৫ মিটার) দিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের আসরে পৌঁছেছেন। তাঁর কোচ মনে করছেন, মুরলির এখনও আরও সেরা দেওয়া বাকি আছে।
স্প্রিন্ট ইভেন্টে শুধু নয়, দূরপাল্লার দৌড়ে নজর থাকবে গুলবীরের দিকে। জাতীয় স্তরে ৩০০০, ৫০০০ ও ১০০০০ মিটার দৌড়ে রেকর্ড রয়েছে তাঁর দখলে। টোকিওতে তিনি ৫ হাজার ও ১০ হাজার মিটারেই অংশ নেবেন। পদক হয়ত পাবেন না, কিন্তু পার্সোনাল বেস্ট সময় তো করতেই পারেন।
ভারতের জ্যাভেলিন থ্রোতে জোর শুধু মাত্র আর নীরজেই সীমাবদ্ধ ভবিষ্যতে থাকবে এমন নয়। উত্তরপ্রদেশের মহিলা জ্যাভেলিন থ্রোয়ার অন্নু রাণী নিজের দক্ষতা তুলে ধরছেন বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পরপর ৬০ মিটারের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে। চলতি মরশুমে অন্নুর সেরা পারফরমেন্স বিশ্বের ১৪ নম্বরে জায়গা করে নিয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর অন্নু নিজের অতীতের সব পারফরমেন্স ছাপিয়ে চমক দেখালে পদক এসে যেতে পারে।
ভারতের হয়ে যাঁরা টোকিও বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাঁরা হলেন, পুরুষদের মধ্যে নীরজ চোপরা( জ্যাভেলিন থ্রো), শচীন যাদব(জ্যাভেলিন থ্রো), যশবীর সিং( জ্যাভেলিন থ্রো), রোহিত যাদব ( জ্যাভেলিন থ্রো), মুরলি শ্রীশঙ্কর( লং জাম্প), প্রবীণ চিত্রাভেল (ট্রিপল জাম্প), আবদুল্লা আবুবাকার( ট্রিপল জাম্প), সর্বেশ অনিল কুশারে(হাই জাম্প), গুলবীর সিং( ৫ ও ১০ হাজার মিটার দৌড়), অনিমেষ কুজুর(২০০ মিটার স্প্রিন্ট), তেজস শীর্ষে( ১১০ মিটার হার্ডলস), সার্ভিন সেবাস্টিয়ান( ২০ কিমি হাঁটা), রামবাবু( ৩৫ কিমি হাঁটা), সন্দীপ কুমার( ৩৫ কিমি হাঁটা), মহিলাদের মধ্যে পায়েল টৌধুরি( ৩ হাজার মিটার স্টিপল চেজ), অঙ্কিতা ধ্যানী( ৩ হাজার মিটার স্টিপল চেজ), অন্নু রাণী (জ্যাভেলিন থ্রো), প্রিয়াঙ্কা গোস্বামী( ৩৫ কিমি হাঁটা), পুজা ( ৮০০ ও ১৫০০ মিটার দৌড়)।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
