Cart Total Items (0)

Cart

All Sports

 

অলস্পোর্ট ডেস্ক:‌ বৃহস্পিতবার ইডেন গার্ডেন্সের সবুজ গালিচায় এক নতুন তারকার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। কলকাতা নাইট রাইডার্স যখন এবারের আইপিএলে প্রথম ম্যাচ জয়ের আশা দেখছিল প্রবলভাবে, তখন সেই আশায় জল ঢেলে দেন মুকুল চৌধুরি। অবিশ্বাস্য এক ইনিংস খেলে প্রায় হারা ম্যাচ জিতিয়ে দেন লখনউ সুপার জায়ান্টসকে। ২৭ বলে অপরাজিত ৫৪ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলে শেষ বলে জয় ছিনিয়ে নেন। ২০০ রানের গড়ের ওই ইনিংস সাজানো ছিল ৭টি ছয় ও ২ টি বাউন্ডারিতে। মুকুলের এই চোখধাঁধানো ব্যাটিং কলকাতার মানুষ ও ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীরা দীর্ঘসময় মনে রাখবেন।

মুকুলের এমন একটা লড়াকু মানসিকতার পিছনে যে বাবা দলীপ চৌধুরির বিশাল আত্মত্যাগ, ধারে ডুবে যাওয়া, এমনকি জেল খাটার করুণ কাহিনী রয়েছে, তা ক’‌জনের জানা আছে?‌ যা অনায়াসে এক রূপকথার গল্পের সঙ্গে মেলে। রুপোলি পর্দায় তুলে ধরার মতো। ছেলেবেলা থেকেই কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে মুকুলকে। রাজস্থানের ঝুনঝুনু জেলার ‘‌খেদারাও কি ধানি’‌ গ্রামে জন্ম তাঁর।

মুকুলের বাবার ভাষায়, ‘‌ ২০০৩ সালে স্নাতক হওয়ার পরই আমার বিয়ে হয়। তখনই আমার স্বপ্ন ছিল, যদি ছেলে হয়, তাকে ক্রিকেটার করব। পরের বছর মুকুল জন্মায়। তখনই ঠিক করে ফেলি, যতই সমস্যা হোক, ছেলেকে ক্রিকেট খেলা শেখাবো। ৬ বছর ধরে রাজস্থান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসেসের জন্য তৈরি হলেও, সেই পরীক্ষায় পাস করতে পারিনি। রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা শুরু করি। তাতেও সফল হইনি। কিন্তু মকুলকে ক্রিকেটার তৈরি করার লক্ষ্য থেকে সরে আসিনি। ২০১৬ সালে মুকুলকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে শিকড়ের এসবিএস ক্রিকেট হাবে পৌঁছই ভাল অ্যাকাদেমির খোঁজ চালিয়ে গিয়ে। মুকুলে নাম অ্যাকাদেমিতে লেখানোর পর বুঝি ওখানে রেখে ছেলেকে ক্রিকেট খেলা শেখাতে গেলে যা টাকার দরকার তা আমার নেই। তাই ২১ লাখ টাকা দিয়ে নিজের বাড়ি বেচে দি। পরের বছর ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে হোটেল খুলি। সেই লোনের কিস্তি শোধ করতে পারিনি সময়মতো। তার জন্য আমাকে জেল পর্যন্ত খাটতে হয়। তবে বিশ্বাস করুন, কোনও প্রতারণা বা দুর্নীতির আশ্রয় নিইনি। শুধু চেয়েছিলাম, মুকুলের ক্রিকেটার হওয়া যেন আটকে না যায়।’‌

দলীপ আক্ষেপের সঙ্গে বলেছেন, ‘‌ ওই কঠিন সময়ে আত্মীয় পরিজন বন্ধুরা আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আমাকে উন্মাদ বলত। আমি নাকি নিজের মতো ছেলের জীবনটাও নষ্ট করব। এতে আমি ভেঙে পড়িনি বা নিজের প্রতিজ্ঞা থেকে সরে আসিনি। বরং আমার মনের জোর আরও বাড়িয়েছিল। প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর ছিলাম, আমি ঠিক পথেই চলছি। মুকুল একদিন সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে মাঠে খেলে।’‌

দলীপ নিজে কখনওই বড় ক্রিকেটার ছিলেন না। গ্রামের মাঠে সাধারন পর্যায়ে খেলতেন মাত্র। জানালেন, ‌‘‌ আমি কপিল দেব আর শচীন তেন্ডুলকারের খুব ভক্ত ছিলাম। মুকুলের সঙ্গে শচীনের খেলার ভিডিও দেখতাম। কিন্তু ২০১১ একদিনের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে এম এস ধোনির ছক্কা হাঁকানো বিশ্বকাপ জেতার শট মারা দেখার পর ধোনির ভক্ত হয়ে যায় মুকুল। ও আমার কাছে দু’‌জোড়া গ্লাভসের আবদার করে। সেই ওর এগোনোর শুরু। বাকিটা তো আপনারাই দেখছেন।’‌

২০২৫-‌২৬ মরশুমে অনূর্ধ্ব ২৩ লিস্ট ‘‌এ’‌ ট্রফিতে মুকুল চৌধুরির ব্যাট থেকে এসেছিল সর্বাধিক ৬১৭ রান। যার মধ্যে ছিল ২ টি শতরান ও ৪টি অর্ধ শতরান। গড় ১৪২.‌৪৯। ৩৯ টি ছক্কা হাঁকিয়েছিল মুকুল, যা টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি। মুকুলের এই পারফরমেন্স নজর কাড়ে রাজস্থান রনজি ক্রিকেট দলের কোচ অংশু জৈনের। চোট পাওয়া কার্তিক শর্মার জায়গায় সৈয়দ মুস্তাক আলি ক্রিকেটে মুকুলকে দলে নেন তিনি। ৫ ম্যাচে ১৭৩ রান করেন মকুল। গড় ১৯৮.‌ ৮৫।

অংশু জৈন জানিয়েছেন, ‘‌ দিল্লির বিরুদ্ধে আমাদের জয়ের জন্য জয়ের দরকার ছিল ২৬ রান। মুকুল ৪টি ওভারবাউন্ডারি মেরে ম্যাচ জেতায়। মুকুল যে হেলিকপ্টার শটে ছক্কা হাঁকায়, তা ওর নিজস্ব পছন্দের স্টাইল। প্রধান অস্ত্রও বলতে পারেন। সৈয়দ মুস্তার আলি ট্রফিতে মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে পুল শটে মিড অনের ওপর দিয়ে ওর ছক্কা মারা দেখে প্রতিপক্ষ দলের ক্রিকেটাররাও হাততালি দিয়েছিল।’‌

বাবা দলীপের মতে, মুকুলের রান খিদে মারাত্মক। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে মুকুল ছন্দে ছিল না রান তাড়া করার দৌড়ে। লখনউ সুপার জায়ান্টসের অধিনায়ক ঋষভ পন্থ শেষপর্যন্ত ম্যাচটা বের করে নিয়ে যায়। কিন্তু মুকুল নিজে মরমে মরে ছিল, ভাল কিছু করতে না পারায়। হোটেলে ফিরে আমাকে ভিডিও কল করে। তখন দেখি ওর চোখ লাল। জানতে চাই, মকুল তুই কাঁদছিলি নাকি?‌ মুকুল মাথা নেড়ে শুধু হেসেছিল। আসলে মুকুল খব হতাশ ছিল। বলেছিল, এলএসজি টিম ম্যানেমেন্ট আমাকে বেস প্রাইসের থেকে অনেক বেশি টাকা দিয়ে দলে নিয়েছে। সেইমতো খেলতে না পারলে, ওদের প্রতি অবিচার করা হবে। আমি বলেছিলাম, ম্যাচ তো আরও আছে। সুযোগ আসবে, তখন দেখিয়ে দিবি। মুকুল বলেছিল, পরের ম্যাচেই সেটা করবে দেখাবে। আমাকে ও আর পরিবারের সবাইকে গর্বিত করবে ওর পারফরমেন্স দিয়ে। মুকুল কথা রেখেছে।’‌

কেকেআরের বিরুদ্ধে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলার পর ২১ বছরের মুকুলের প্রতিক্রিয়া, ‘‌ আমার এই পারফরমেন্স বাবা ও এম এস ধোনিকে উৎসর্গ করছি। বিয়ের আগে থেকেই বাবার সংকল্প ছিল, ছেলে হলে তাকে ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তুলবেন। আর আমার আদর্শ ক্রিকেটার ধোনি। আমি সবসময় চেষ্টা করি ধোনির মতো ফিনিশারের ভূমিকা পলান করতে। ধোনি ইয়র্কারেও ছক্কা মেলে ম্যাচ জেতাতে পারে। যখন এই ধরনের বলে ছয় মারা যায়, তখন বোলার বুঝে উঠতে পারে না কোথায় বল ফেলবে।’‌

মুকুলের এখন একটাই লক্ষ্য নিয়মিত ভারতীয় দলে খেলার সুযোগ অর্জন করা, আর বাবার সমস্ত ধার মিটিয়ে মনের মতো বাড়ি উপহার দিয়ে গোটা পরিবারের জীবনে সাচ্ছন্দ আনা।

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *