অলস্পোর্ট ডেস্ক: সম্প্রতি তরুণ তারকা ফুটবলার সহাল আব্দুল সামাদ-কে কেরালা ব্লাস্টার্স শিবির থেকে নিয়ে এসে যে রকম হইচই ফেলে দিয়েছে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট, তার পরে বাংলার ফুটবলপ্রেমীরা, বিশেষ করে মোহনবাগান সমর্থকেরা এখন এই নিয়েই চর্চায় মজে রয়েছেন।
ভারতীয় দলের হয়ে নিয়মিত খেলা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার সহালকে সম্প্রতি সই করিয়েছে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। মোটা অঙ্কের ট্রান্সফার ফি ও এক ফুটবলারের পরিবর্তে পাঁচ বছরের চুক্তিতে কলকাতার ক্লাবে যোগ দিলেন ভারতীয় ফুটবলের এই ‘পোস্টার বয়’।
দেশের অন্যতম সেরা এই তরুণ তারকা ফুটবলারের আসার খবরে বঙ্গ ফুটবল মহল সরগরম হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ, কেরালা থেকে কলকাতায় এসে একাধিক ফুটবলারের সাফল্যের ইতিহাস। দক্ষিণের এই ফুটবলপাগল রাজ্য থেকে কলকাতায় এসে অনেক ফুটবলারই যথেষ্ট সফল হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে অনেকে তারকাও হয়ে উঠেছেন।
অনেকে যেমন তারকা হয়েছেন, তেমনই অনেকে আবার কলকাতার ফুটবলের চাপ, সমর্থকদের প্রত্যাশার ভার নিতে না পেরে সাফল্য না পেয়েই ফিরে যান। সহাল যদিও ইতিমধ্যেই তারকা। যথেষ্ট সফলও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পূর্বসূরীদের কোন দলে পড়বেন তিনি, সেটাই দেখার।
সবুজ-মেরুন শিবিরে সই করে সহাল বলেছেন, “কেরল থেকে আইএম বিজয়ন, জো পল আনচেরিরা কলকাতায় খেলে মহা তারকা হয়েছেন। আরও অনেকেই এখানে খেলে গিয়েছেন। কলকাতা যাওয়ার আগে ওঁদের সঙ্গে কথা বলে নেব বলে ভেবে রেখেছি”। তিনি নিশ্চয়ই কথা বলবেন বর্তমানে কলকাতার ক্লাবে খেলা তাঁর রাজ্যের ফুটবলার আশিক কুরুনিয়ান ও ভিপি সুহেরের সঙ্গেও।
শুধু বিজয়ন, আনচেরিই নয়, সহালের রাজ্য থেকে এক ঝাঁক খেলোয়াড় সাম্প্রতিক ও সুদূর অতীতে কলকাতায় খেলে গিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন যাঁরা, তাঁদের কয়েকজনের কথা তুলে ধরা হল এই প্রতিবেদনে।
পিবিএ সালেহ (১৯৪৫-১৯৫৩, ইস্টবেঙ্গল)
আসল নাম পুথনপরম্বিল বাবাখান আব্দুল রজ্জাক সালেহ। জন্ম কোট্টায়ামে। ইস্টবেঙ্গলের বিখ্যাত পঞ্চপাণ্ডবের অন্যতম তারকা ছিলেন এই সালেহ। পাঁচ বাঘা-বাঘা ফরোয়ার্ডে তৈরি এই পঞ্চ পাণ্ডবে সালেহ ছাড়াও ছিলেন আহমেদ খান, আপ্পা রাও, পি ভেঙ্কটেশ ও কে পি ধনরাজ। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে এই পঞ্চপাণ্ডব ভারতীয় ফুটবলে ঝড় তোলে। ন’বছর ইস্টবেঙ্গলের হয়ে যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে খেলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন সালেহ। ক্লাবসূত্রে যে পরিসংখ্যান পাওয়া গিয়েছে, সেই অনুযায়ী কলকাতার ক্লাবের হয়ে ৫৫টি গোল করেছিলেন তিনি। ১৯৫০-এ তিনি দলের অধিনায়কও ছিলেন।
স্বাধীনতার পরে ইস্টবেঙ্গলই ছিল প্রথম ভারতীয় ক্লাব, যারা কোনও ইউরোপীয় ক্লাবকে হারিয়েছিল। গোটেবর্গকে তারা ঘরের মাঠে হারায় এবং সেই ম্যাচের জয়সূচক গোলটি করেন সালেহ। সন্তোষ ট্রফিতে তিনি তখন বাংলার প্রতিনিধিত্বও করতেন।
১৯৫১ সালে আইএফএ শিল্ড ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দী মোহনবাগানের বিরুদ্ধে তাঁর জোড়া গোলের কীর্তির কথা বাংলার ফুটবলের ইতিহাসে এখনও উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সেবারই টানা তৃতীয় বার আইএফএ শিল্ড জিতে নজির সৃষ্টি করে ইস্টবেঙ্গল। তারাই ছিল এই কীর্তি স্থাপন করা প্রথম ভারতীয় ক্লাব দল।
ইস্টবেঙ্গলে খেলার সময়ই অলিম্পিকগামী ভারতীয় দলে ডাক পান তিনি। ১৯৪৮ ও ১৯৫২-য় পরপর দু’টি অলিম্পিকের আসরে ভারতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন সালেহ। ১৯৫১-র এশিয়ান গেমসে ভারতের সাফল্যের নেপথ্যে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল কেরালার এই তারকা ফুটবলারের। ইস্টবেঙ্গল ছাড়ার পরও তিনি কলকাতার ক্লাব ফুটবলে ছিলেন। খেলতেন কাস্টমসের হয়ে।
আই এম বিজয়ন (১৯৯১-২০০৬, মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল)
কেরালার ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা ও সফল ফুটবলার ইনিভালাপ্পিল মানি বিজয়ন, যিনি আই এম বিজয়ন নামেই বেশি জনপ্রিয়। বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তাঁর একটা ডাকনামও রয়েছে, ‘কালো হরিণ’। এই কৃষ্ণাঙ্গ ফরোয়ার্ডের গতির জন্যই তাঁকে ওই নামে ডাকতেন তাঁর ভক্তরা। দীর্ঘ ১৬ বছর ক্লাব ফুটবল খেলার পর আজও তিনি যথেষ্ট জনপ্রিয়। নিজের রাজ্য কেরালায় তো বটেই, সারা দেশেও।
কেরালার ছোট শহর ত্রিশূর থেকে উঠে আসা বিজয়নকে এখনও ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ডের আখ্যা দেওয়া হয়। তাঁর সমসাময়িক বাইচুং ভুটিয়ার সঙ্গে তুলনা করা হলে অনেক বিশেষজ্ঞই তাঁকে বাইচুংয়ের চেয়ে এগিয়ে রাখেন।
ছোটবেলায় কেরালার ফুটবল মাঠে সিগারেট ও সোডা বিক্রি করা থেকে তাঁর দেশের সেরা ফরোয়ার্ড হয়ে ওঠার কাহিনী নিয়ে সিনেমাও তৈরি হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। কেরালা পুলিস ফুটবল ক্লাবের হয়ে প্রথম মাঠে নেমে তিনি সবার নজরে পড়েন। ১৯৯১-এ প্রথম যোগ দেন মোহনবাগানে। কিন্তু পরের বছরই ফিরে যান কেরালা পুলিশে। ১৯৯৩-এ ফের যোগ দেন সবুজ-মেরুন শিবিরে। এ বারও এক বছরের বেশি ছিলেন না সেখানে। ১৯৯৮-এ যখন আবার কলকাতার দলে ফিরে আসেন, তখনও সেই এক মরশুমের জন্যই। মোহনবাগানের হয়ে এই তিন মরশুমে প্রায় ষাটটি গোল করেছেন।
২০০১-এ তিনি আবার কলকাতায় ফিরে আসেন, তবে মোহনবাগান নয়, ইস্টবেঙ্গলের ডাকে। সেও এক মরশুমের জন্য। লাল-হলুদ শিবিরে আবার ফিরে আসেন ২০০৫-এ, ক্লাব ফুটবলে তাঁর শেষ মরশুম খেলার জন্য। ইস্টবেঙ্গলের হয়ে দুই মরশুমে প্রায় ৩০টি গোল করেছেন। কলকাতার দুই ক্লাব ছাড়াও তিনি খেলেছেন জেসিটি মিলস ফাগওয়ারা, চার্চিল ব্রাদার্স এবং এফসি কোচিনের হয়ে। ক্লাব কেরিয়ারের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় দলের হয়েও যথেষ্ট সাফল্যের সঙ্গেই খেলেছেন তিনি। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ৭০টি ম্যাচে ২৯টি গোল এসেছে তাঁর পা থেকে। সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন তাদের প্রথম বর্ষসেরা সন্মান দেয় আই এম বিজয়নকেই।
জো পল আনচেরি (১৯৯৩-২০০৫, মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল)
স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ত্রাভাঙ্কোর বা এসবিটি-র হয়ে আনচেরির পারফরম্যান্স দেখে তাঁকে প্রথম কলকাতায় নিয়ে আসে মোহনবাগান। সে ১৯৯৩-এর ঘটনা। কলকাতায় এসে প্রথম মরশুমেই সবার মন কেড়ে নেন ৪৮টি ম্যাচে ৩২ গোল দিয়ে। ক্লাবের হয়ে এই পারফরম্যান্স তাঁকে ভারতীয় দলে ডাক পেতেও সাহায্য করে। ভারতীয় দলের হয়েও মনে ছাপ ফেলার মতো পারফরম্যান্স দেখান বিজয়নের শহর ত্রিশূর থেকে উঠে আসা এই ফুটবলার। ১৯৯৪-এ ফেডারেশনের বর্ষসেরা ফুটবলারের সন্মানও পান তিনি।
বিভিন্ন পজিশনে সমান দক্ষতার সঙ্গে খেলতে পারতেন আনচেরি। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, মিডফিল্ডার ও স্ট্রাইকার—সব জায়গাতেই তাঁকে খেলাতে পারতেন কোচেরা। ১৯৯৮-এ মোহনবাগানে ফিরে এসে তিনি দলকে সে বছরের ফেডারেশন কাপ ও টানা দু’বছর আইএফএ শিল্ড জেতান। ইস্টবেঙ্গলকেও দুই মরশুমে তিনটি খেতাব জেতান আনচেরি, ২০০১-এর আইএফএ শিল্ড ও দু’টি ডুরান্ড কাপ। ২০০১-এ ফেডারেশেনের বর্ষসেরার খেতাব অর্জন করেন তিনি। ২০০৪-০৫ মরশুমে মোহনবাগানের হয়ে খেলে পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নেন তিনি।
এম সুরেশ (২০০০-২০১০, মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল)
মোহনবাগানেই ক্লাব কেরিয়ার শুরু করেন মুত্তাথ সুরেশ, যিনি এম সুরেশ নামেই বিখ্যাত কলকাতার ফুটবলে। সুব্রত ভট্টাচার্যের কোচিংয়ে পেশাদার ক্লাব কেরিয়ার শুরু করেন তিনি এবং কলকাতায় এই উইং ব্যাক থেকে সেন্টার ব্যাকে রূপান্তরিত হন সুরেশ। এবং এই পজিশনেই বেশি সফল হন। মোহনবাগানে প্রথম বছরেই ডুরান্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। মোহনবাগান ছেড়ে যখন মাহিন্দ্রা ইউনাইটেডে যোগ দেন, তখনও ডুরান্ড কাপ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন তিনি।
তবে কলকাতায় ফিরে আসেন তিনি। এ বার ইস্টবেঙ্গলে। মোহনবাগানে এক বছরের বেশি থাকা না হলেও ইস্টবেঙ্গলে তিনি ছিলেন টানা আট বছর। লাল-হলুদ পরিবারের ঘরের ছেলে হয়ে ওঠেন তিনি। ওই সময় টানা তিনবার ডুরান্ড কাপ জেতে ইস্টবেঙ্গল এবং তিন বারই সেই চ্যাম্পিয়ন দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন সুরেশ।
এই আট বছরে ক্লাবকে আরও একাধিক ট্রফি জিততে সাহায্য করেন তিনি। জাতীয় লিগ, আইএফএ শিল্ড, ফেডারেশন কাপ এবং আসিয়ান কাপেও তিনি ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের যোদ্ধা। ভারতের হয়েও খেলেছেন ৭০টি ম্যাচ। ২০০৫-এর সাফ চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য ছিলেন তিনি।
এঁরা ছাড়াও বহু ফুটবলার কেরালা থেকে কলকাতায় এসেছেন, যাঁদের অনেকেই মনে রেখেছেন, অনেকে রাখেননি। তবে জেভিয়ার পায়াসের কথা সবারই মনে থাকবে। অনেকে বলেন কেরালা থেকে কলকাতায় আসা সেরা ফুটবলার এই পায়াসই। বিজয়নের থেকেও তিনি ছিলেন ক্ষিপ্র ও আক্রমণাত্মক। তাঁকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন, তেমনই তিন ফুটববলার সুব্রত ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য ও সত্যজিৎ চ্যাটার্জিরা সে রকমই বলে থাকেন। কলকাতার ময়দানে নেমে বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের দুর্দান্ত কিছু ফুটবল উপহার দিয়েছিলেন তিনি।
এ ছাড়াও কেরালা থেকে যাঁরা কলকাতার ক্লাবে খেলে গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সুশান্ত ম্যাথু (২০১০-১৩, ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান), আনা এডাথোডিকা (২০১৭-২০২০, মোহনবাগান, এটিকে), ভি পি সত্যন (১৯৯২-৯৩, মোহনবাগান), টি আব্দুল রহমান (১৯৫৯-১৯৬৭, রাজস্থান ক্লাব, মোহনবাগান), পাপ্পাচান প্রদীপ (২০১১-১২, মোহনবাগান), জবি জাস্টিন (২০১৭-২০২১, ইস্টবেঙ্গল, এটিকে, এটিকে মোহনবাগান), ব্রিটো পিএম (২০১৮-২০২০, মোহনবাগান), রিনো আন্টো (২০০৮-২০১৫, মোহনবাগান, এটিকে)-দের কথা হয়তো অনেকেরই মনে আছে।
(লেখা ও ছবি আইএসএল ওয়েবসাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
