সুচরিতা সেন চৌধুরী: ১৯১১ সালের ২৯ জুলাই মানে ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস। ২৯ জুলাই মানে একদল ব্রিটিশকে খালি পায়ে একদল বাঙালির হারিয়ে দেওয়ার গল্প। যা লেখা হয়ে গিয়েছে ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসেও। ফুটবল মাঠের এই জয় নতুন করে স্বাধীনতা আন্দোলনকে তরান্বিত করেছিল। আর সেই দিনটিই লেখা হয়ে গিয়েছে মোহনবাগানের সাফল্যের তালিকায়ও। সেদিনের সেই ১১ বাঙালি খেলেছিল মোহনবাগানের জার্সিতে। ২০০১ সাল থেকে এই দিনকেই মোহনবাগান দিবস হিসেবে পালন করে আসছে ক্লাব। প্রবল বৃষ্টিতে যখন বানভাসি কলকাতা তখনও সেই আগ্ৰহে ঘাটতি নেই এক ইঞ্চি। জলে ডোবা কলকাতা ময়দান থেকে নেতাজি ইন্ডোরের গেটে তখন কাতারে কাতারে সবুজ-মেরুন জার্সির ঢল। ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে জল পেরোচ্ছেন এক বৃদ্ধ বাবা। প্রিয় ক্লাবের ঐতিহাসিক দিন বলে কথা।
গত এক সপ্তাহ ধরেই সাজ সাজ রব ক্লাব তাঁবু জুড়ে। সোমবার বিকেলে তাতে পড়েছে শেষ প্রলেপ। মঙ্গলবার সকাল থেকেই শহরের সব রাস্তা গিয়ে মিশতে শুরু করেছিল মোহনবাগান ক্লাব তাঁবুতে। ক্লাব তাঁবুর লনে প্রতিষ্ঠিত অমর একাদশের গলায় মালা দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ক্লাব সভাপতি দেবাশিস দত্ত ও সচিব সৃঞ্জয় বোস। এর পর তোলা হয় পতাকা। ক্লাব তাঁবুর অনুষ্ঠান শেষ হয় প্রাক্তন ফুটবলারদের একটি প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ দিয়ে। প্রেসিডেন্ট একাদশ বনাম সেক্রেটারি একাদশের মধ্যের ম্যাচটি ২-১ গোলে জিতে নেয় সভাপতি একাদশ দল। এর পর পুরো নজর ঘুরে যায় নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে।
নেতাজি ইন্ডোরও মোহনবাগানের রঙে সাজছিল গত কয়েকদিন ধরেই। মঙ্গলবার তা মঞ্চস্থ হয়ে গেল সারম্বরে। সৌরেন্দ্র, সৌমজিতের গান দিয়ে শুরু হল নেতাজি ইন্ডোরের অনুষ্ঠান। মোহনবাগানকে নিয়ে তাঁদের তৈরি নতুন গান দিয়েই শুরু হল গানের অনুষ্ঠান। তার পর রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে হিন্দি রোমান্টিক সিনেমার গান হয়ে যে গান না হয়ে ফুটবলের অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হয় না সেই “সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল”তো ছিলই। একঘণ্টার অনুষ্ঠান জমিয়ে দিয়ে গেলেন তাঁরা। আর গানের সঙ্গেই মঞ্চ মাতিয়ে গেলেন একদল জাগলার। উত্তম, সরোজ, প্রসেনজিতের বল জাগলিংয়ের প্রভাব প্রসারিত হল গ্যালারিতেও। গান শেষ হল “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি… ধনধান্য পুষ্প ভরা”। তাঁর মধ্যেই মাঠে ঢুকলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। এলেন সিএবি সভাপতি স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়, অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, দমকল মন্ত্রী সুজিত বোস, বাবুল সুপ্রিয়। এলেন একে একে পুরস্কারপ্রাপকরাও।

এর পর ছিল আসল পুরস্কারের পালা, যা সব সময় মোহনবাগান দিবসের মূল আকর্ষণ হিসেবেই জায়গা করে নেয়। এবারের মোহনবাগান রত্ন স্বয়ং টুটু বসু, যাকে ঘিরে বাগান জনতার আবেগের কোনও শেষ নেই। তিনি মঞ্চে উঠলে যে গ্যালারি জুড়ে শব্দ ব্রহ্ম চলবে তা তো স্বাভাবিকই। জয় মোহনবাগান ধ্বনিতে বার বার মুখরিত হল নেতাজি ইন্ডোরের গ্যালারি। লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্টের পুরস্কার উঠল রাজু মুখোপাধ্যায়ের হাতে। এছাড়া সেরা সাংবাদিকের পুরস্কার পেলেন দুই প্রয়াত সাংবাদিক অরুণ সেনগুপ্ত ও মানস চক্রবর্তী। আর যারা না থাকলে সব অনুষ্ঠান ফিকে সেই গত মরসুমের সাফল্যের কারিগরদের মধ্যে সেরা স্ট্রাইকারের পুরস্কার পেলেন জেমি ম্যাকলারেন, সেরা ফুটবলার আপুইয়া এবং সেরা উদীয়মান ফুটবলার দীপেন্দু বিশ্বাস। দীপেন্দু উপস্থিত থাকলেও বাকি দুই ফুটবলার ছিলেন না।
ভারতীয় মহিলা ফুটবল দলের তিন বাঙালি সুজাতা বাসফোর, অঞ্জু তামাং ও রিম্পা হালদারকে সংবর্ধিত করা হল। যদিও উপস্থিত ছিলেন শুধুই রিম্পা। কোচ ক্রিসপিন ছেত্রী উপস্থিত না থাকলেও তাঁকেও সংবর্ধনার কথা ঘোষণা করা হয়। ম্যারিনার্স বেসক্যাম্পকে ফ্যান ক্লাব হিসেবে সংবর্ধিত করা হয় বৃহত্তম টিফো বানানোর জন্য। সেরা ফ্যান রিপন মণ্ডল। সেরা রেফারি মিলন দত্ত। সেরা প্রশাসক কমল কুমার মৈত্র। সেরা অ্যাথলিট অর্চিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেরা হকি প্লেয়ার অর্জুন শর্মা। সেরা ক্রিকেটার সিনিয়র রনজ্যোত সিং খয়রা। অনুষ্ঠান শেষের সুর এবারের মতো বেঁধে দিয়ে গেলেন ইমন চক্রবর্তী।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
