মোহনবাগান ১(জেলকোভিচ) ইস্টবেঙ্গল ০
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: দীর্ঘসময় পর ডার্বি খেলতে নেমেছিল ইস্টবেঙ্গল ফেবারিট তকমা গায়ে নিয়ে। বলত গেলে কাগজে কলমে এগিয়ে থেকে। কিন্তু শিল্ড ফাইনালে সব হিসেব উল্টে দিয়ে বৃহস্পতিবার ইস্টবেঙ্গলকে যুবভারতীতে সমীর জেলকোভিচের গোলে ১-০ ফলে হারিয়ে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট ২২তম বার শিল্ড ঘরে তুলল। গতবছরের পর আবার শিল্ড জিতল মোহনবাগান এসজি। সবুজ মেরুন সমর্থকদের জন্য এর থেকে ভাল শারদীয়া উপহার আর কি হতে পারে। কলকাতা ফুটবল লিগও জিতেছিল সবুজ মেরুন। মোহনবাগান সদস্য-সমর্থকরা যখন শিল্ড জয়ের আনন্দে মাতবেন দুর্গা পুজোর উৎসবের দিনগুলিতে, তখন বাগান কোচ পানোসের একরাশ স্বস্তি। কারণ এমন রটনা ছিল বাগান শিল্ড ফাইনাল হারলে, তাঁর কোচিং ভবিষ্যত প্রশ্নের মুখে পড়ত।
গতবছর আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলকে টাইব্রেকারে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। তখন মোহনবাগান কোচের দায়িত্বে ছিলেন হোসে মোলিনা। আর ইস্টবেঙ্গলের কোচের চেয়ারে অস্কার ব্রুজোঁ। এবার নতুন মরশুমে শুধু যে কোচের জায়গাতেই বদল হয়েছিল তাই নয়, দু’দলেও অনেক ফুটবলার বদল। তবে বৃহস্পতিবার শিল্ড ফাইনাল ডার্বিতে মুখোমুখি হওয়ার আগে মোহনবাগান কোচ পানোস ও ইস্টবেঙ্গল কোচ হাবাস অনেক ম্যাচ পেয়েছেন। দল গুছিয়ে নেওয়ার। বলা ভাল, শিল্ড ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার আগে আরও দু’বার ডার্বিতে মুখোমুখি হয়েছিল দুই প্রধান। ডুরান্ড কাপের গ্রুপ লিগের ম্যাচে ও ফাইনালে। কলকাতা লিগের ডার্বি ধরলে তিনবার। চলতি মরসুমে ডার্বিতে সাফল্যের খতিয়ানের দিক থেকে ইস্টবেঙ্গলের পাল্লা ভারি ছিল শিল্ড ফাইনালের আগে পর্যন্ত।
ডুরান্ডের গ্রুপ লিগের ডার্বিতে মোহনবাগান জয় পেয়েছিল। কিন্তু কলকাতা লিগের ডার্বিতে সিনিয়র ফুটবলারদের খেলিয়েও রিজার্ভ টিমের ফুটবলারদের নিয়ে খেলা ইস্টবেঙ্গলকে হারাতে পারেনি মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। ম্যাচ ১-১ ড্র হয়েছিল। ডুরান্ড ফাইনালের ডার্বিতে মোহনবাগানকে দুরমুশ করে ৪-১ গোলে হারিয়ে ট্রফি জিতেছিল ইস্টবেঙ্গল।
তাই সেদিক থেকে বলতে গেলে শিল্ড ফাইনালে ফেবারিট তকমাটা ছিল ইস্টবেঙ্গলের গায়ে। কারণ শিল্ডের সেমিফাইনালে যেখানে ইস্টবেঙ্গল ৭-২ গোলের বিশাল জয় পেয়েছিল নর্থ ইস্টের বিরুদ্ধে, সেখানে মোহনবাগান এসজি টাইব্রেকারে পাঞ্জাব এফসিকে হারায় গোলকিপার বিশালের হাতে ভর করে। ইস্টবেঙ্গলের তুলনায় মোহনবাগানের খেলায় সংগঠিত ভাবটা নজরে আসেনি।
কিন্তু শিল্ডের ফাইনালে ভিন্ন চেহারায় দেখা গেল মোহনবাগানকে। সবুজ মেরুনের হেড স্যার পানোসের মাথায় ডুরান্ড ফাইনালে ৪ গোল হজম করাটা মাথায় ছিল। তাই তিনি নিজের দলের রক্ষণ জমাট করার পথে আগে হাঁটেন। তাঁর মনে হয়েছিল লেফট ব্যাক শুভাশিস একেবারেই ফর্মে নেই। তাই শুভাশিসকে বসিয়ে তাঁর পজিশনে ভারতীয় দলে খেলা অভিষেককে রেখে রাইটব্যাকে মেহতাবকে খেলান। স্টপারে আলবার্তোর সঙ্গে রাহুল বেকেকে খেলিয়ে রক্ষণ জমাট করেন। জাতীয় দলে খেলা আপুইয়া, অনিরুদ্ধ থাপা, মনবীরদের শুরু থেকে ব্যবহার করেননি পানোস। সম্ভবত পানামা, ব্রাজিল, উরুগুয়ের বিরুদ্ধে হাই ইনটেনসিটি ম্যাচ খেলে তাঁরা ক্লান্ত থাকায়। শুধু প্রথম একাদশে রাখেন সাহালকে। ভরসা রাখেন শিল্ডের আগের ম্যাচে খেলা বাকি ফুটবলারদের ওপর।
উল্টোদিকে, ইস্টবেঙ্গল কোচ হাবাসও জাতীয় দলে খেলা এডমুন্ড আর জয় গুপ্তা ছাড়া আর কাউকে প্রথম একাদশে রাখেননি সম্ভবত ভারতের জার্সিতে খেলা ক্লান্তির কথা মাথায় রেখে। এদিন যেন লাল হলুদ ফুটবলারদের খেলায় সেমিফাইনালের সেই ঝাঁজটা ছিল না। কোনওসময় তাঁদের খেলায় একটা সংঘবদ্ধ ভাব নজরে আসেনি। বরং কেমন যেন একটা বোঝাপড়া ও ঝিমিয়ে পড়া ভাবটা ধরা পড়ে। তবে সবচেয়ে নড়বড়ে ভাবটা নজরে আসে ইস্টবেঙ্গল রক্ষণে আনোয়ার না খেলায়। একজন ফুটবলার না খেলায় এমন অবস্থা ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণের হবে, এটা মানা যায় না।
তবু শুরুটা খারাপ করেনি ইস্টবেঙ্গল। ৬ মিনিটে গোল করে এগিয়ে যাওয়ার নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট করে। জয় গুপ্তার বাড়ানো বল ফাঁকায় পেয়ে গিয়েছিল এডমুন্ড। সামনে অসহায় গোলকিপার বিশাল। এডমুন্ড তাড়াহুড়ো করে গড়ানো শট নিলে গোলকিপার বিশালের গায়ে লেগে বল গোলের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেলে বাঁচে বাগান।
২৩ মিনিটে মেহতাব অবশ্য যে গোল মিস করলেন, তাতে মোহনবাগান সমর্থকরা তাঁকে ক্ষমা করতেন না, ম্যাচ হারলে। অভিষেক সিংয়ের বাঁদিক থেকে তোলা বল বক্সের ভেতর ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্ডারদের টপকে মেহতাবের মাথায় চলে যায়। মেহতাবকে বাধা দেওয়ার মতো কেউ ছিলেন না আশেপাশে। গোলের নীচে প্রমাদ গুনছিলেন লাল হলুদ গোলকিপার ফুরবা লাচেনপা। সবাইকে অবাক করে মেহতাব বাউন্ডুলে বয়ে যাওয়ার ছেলের মতো সেই বলটা হেডে ক্রশপিসের ওপর দিয়ে পাঠিয়ে গোলের সুযোগটা হাতছাড়া করলেন মেহতাব।
৩৬ মিনিটে রশিদের মিস পাস থেকে বল পেয়ে নিজেদের মধ্যে দেওয়া নেওয়া করে বক্সের বাইরে বল পান ছাংতে। জোরালো হাঁটু সমান শট নিলে তা তৎপরতার সঙ্গে ফিস্ট করে ক্লিয়ার করেন ইস্টবেঙ্গল গোলকিপার লাচেনপা কর্নারের বিনিময়ে। পরের মিনিটেই ছাংতের তোলা কর্নার থেকে পিছনে চলে আসা বলে সাহালের দুরন্ত শট অনবদ্য ভাবে রোখেন গোলকিপার লাচেনপা।
এরপর থেকে মোহনবাগানের চাপ বেড়েই চলছিল। ইস্টবেঙ্গল হঠাৎ কেমন যেন ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে মাঝমাঠ ও রক্ষণে। গোলমুখে বারবার হানা দিচ্ছিলেন বাগানের ফুটবলাররা। ইস্টবেঙ্গল রক্ষণভাগের ফুটবলারদের ভুলটা নজর টানছিল। শেষপর্যন্ত সেই ভুলের খেসারত দিয়ে গোল হজম করে ইস্টবেঙ্গল প্রথমার্ধের শেষমুহূর্তে। ইস্টবেঙ্গল মাঝমাঠের জায়গায় এডমুন্ড বল পাস দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন রশিদকে। সেই বল ধরে বাগানের সমীর জেলকোভিচ বাড়িয়ে দেন পাশে থাকা লি এরউইনকে। জিবুলিচের সঙ্গে বল দখলের লড়াইয়ে জিতে, তিনি সামনে বাড়ান সাহালকে। বুদ্ধি করে সেই বল পিছন থেকে বক্সে ঢুকে পড়ে জায়গা করে নেওয়া জেলকোভিচকে উঁচু করে তুলে দিলে, জেলকোভিচ সেই বলে টোকা মেরে গোলকিপার লাচেনপার পাশ দিয়ে গোলের ভেতর পাঠান। ডার্বিতে তাঁর প্রথম গোল।
৫৫ মিনিটের মাথায় শূণ্যে ভেসে আসা বলে ইস্টবেঙ্গলের ডিফেন্ডার সন্দীপ মান্ডি হেড দিতে উঠে ম্যাচের সেরা বাগানের ড্রাডিচের মাথায় সজোরে আঘাত করেন। আঘাত পেয়ে লুটিয়ে পড়েন ড্রাজিচ। সংঘাতের জেরে সন্দীপও। প্রাথমিক শুশ্রুষার পর ড্রাজিচ মাঠে থাকলেও, সন্দীপ বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন চোটের কারণে। তাঁর জায়গায় মাঠে আসেন বিষ্ণু, বিপিনের বদলে লোবা।
৬৮ মিনিটে ছাংতের শট গোলকিপার লাচেনপার নাগাল এড়িয়ে পোস্টের ধার ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। ম্যাচের বাকি সময় মোহনবাগানের আধিপত্য বজায় ছিল। ইস্টবেঙ্গল গোলের চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি বাগানের রক্ষণ জমাট থাকায়। প্রশংসা করতেই হবে আলবার্তো, বেকেদের হার না মানা মনোভাবকে। ডুরান্ড ফাইনালে বিশ্রিভাবে হারের জ্বালা জুড়োলো শিল্ডের জয়ে।
মোহনবাগান: বিশাল, মেহতাব, আলবার্তো, বেকে, অভিষেক, ছাংতে(থাপা), টাংরি, জেলকোভিচ, ড্রাজিচ(সুহেল), সাহাল(মনবীর), এরউইন(লিস্টন)।
ইস্টবেঙ্গল: লাচেনপা, হার্দিক, জিবুলিচ, লালচুংনুঙ্গা, সন্দীপ(বিষ্ণু),বিপিন(লোবা), রামিরেজ, জিকসন, রশিদ, জয়(লুকাস), এডমুন্ড(ডেভিড)।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
