সুচরিতা সেন চৌধুরী, ভুবনেশ্বর: হাতের দিকে না তাকালে বোঝার উপায় নেই কেন তিনি প্যারা অ্যাথলিট। মুখের কোণায় মিষ্টি হাসি নিয়ে যখন মেয়েটি এগিয়ে আসে তখন তাঁর চোখে, মুখে শুধুই একরাশ স্বপ্ন। স্বপ্ন অলিম্পিকের। তাই কঠিন আত্মবিশ্বাসী গলা নিয়ে বলে দিতে পারেন, “এবার যদি মেয়েদের কোটা একটু বাড়ে তাহলে আমি যোগ্যতা অর্জন করবই।” এক মুহূর্তে বড্ড আপন করে নেয় এই মেয়ে নিজের স্বপ্ন আর আত্মবিশ্বাস দিয়ে। ট্রেনিং থামিয়ে তিনিও বসে পড়েন আমার পাশে। লাজুক কিন্তু তাঁর প্রতিটি লাইনে শুধুই দেশের হয়ে বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সের মঞ্চ মাতানোর খিদে।
নাম জয়ন্তী বেহরা। ১৯৯৯-এর ১১ জুন পুরীর সাক্ষীগোপাল এলাকায় জন্ম হয়েছিল দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারে সব থেকে ছোট মেয়ে। চার মেয়ে, এক ছেলের পরিবারে কোনও রকমে খেয়ে, পড়ে থাকা সংসারে হঠাৎই ঘটে গেল বড় দুর্ঘটনা। যার শিকার হলেন জয়ন্তী। তখন জয়ন্তীর বয়স মাত্র এক।
ভুবনেশ্বরে কলিঙ্গ স্টেডিয়ামে অভিনব বিন্দ্রা স্পোর্টস সাইন্স সেন্টারে, এখন সেই গল্পও খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলেন জয়ন্তী। বলছিলেন, “আমার যখন এক বছর বয়স তখন আমি জ্বলন্ত উনুনের মধ্যে পড়ে যাই। বাঁদিকের উপরের দিকটা পুড়ে যায়। সেকেন্ড গ্রেড বার্ণ হয়েছিল।” মেয়েকে উনুনে পড়ে যেতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসেন তাঁর মা। কিন্তু পুড়ে যাওয়া আটকাতে পারেননি তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসার পর মেয়ে বেঁচে ফিরলেও বাঁ হাত অকেজ হয়ে যায় জয়ন্তীর। এই অবস্থাতেই মেয়েকে স্কুলে পাঠান তাঁর বাবা-মা।
সেখানেই দেখা হয়ে যায় কোচের সঙ্গে। কোচ বিষ্ণু প্রসাদ মিশ্র আজও তাঁর ব্যক্তিগত কোচ। তিনিই জয়ন্তীকে দেশের জন্য তৈরি করেছেন এবং করে চলেছেন। অকেজ একহাত নিয়ে দূর থেকে ছেলে-মেয়েদের মাঠে দৌঁড়তে দেখে নিজের মধ্যেও ইচ্ছেটা ক্রমশ তৈরি হতে থাকে। যখন তিনি সপ্তম শ্রেণিতে তখন দৌঁড়ে নাম দিয়েই ফেলেন। ওই হাত নিয়ে দৌঁড়তে সেবার বেশ কষ্ট হয়েছিল ঠিকই কিন্তু প্রথম পুরস্কারটা নিয়েই থেমেছিলেন। কিন্তু তাঁর অজান্তেই ততক্ষণে তিনি নজরে পড়ে গিয়েছেন কোচের।
সেই শুরু। জয়ন্তীকে অ্যাথলিট তৈরি করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন কোচ। জয়ন্তীর বাবা-মাকে আর কিছুই ভাবতে হয়নি। নিজের বাড়িতে রেখে, সবরকমের প্রয়োজনীয় সমর্থণ দিয়ে আজও জয়ন্তীর পাশে রয়েছেন কোচ। এর পর একের পর এক সাফল্য তুলে এনে গুরুদক্ষিণা দিয়ে চলেছেন তিনি। এবার তাই লক্ষ্য অলিম্পিক। আপাতত চোট সারিয়ে রিহ্যাব করছেন তিনি। অনেকটাই ফিট। পরের কোয়ালিফিকেশন রাউন্ডের আগে নিজেকে পুরো ফিট করেই নামবেন।
বলছিলেন, “আমার এখন একটাই লক্ষ্য ২০২৪ প্যারা অলিম্পিকে অংশ নেওয়া। এখানে কোয়ালিফিকেশন পর্ব একটু অন্যরকমভাবে হয়। কোটা সিস্টেম। আগের কোয়ালিফিকেশনে মাত্র চারটে কোটা ছিল।আমি অসুস্থ থাকায় অল্পের জন্য সেটা মিস করি। আমি পাঁচ নম্বরে শেষ করি। এবার যদি একটু কোটা বাড়িয়ে ৬-৭টি করে তাহলে তো আমার যোগ্যতা অর্জন করা নিশ্চিত। তার জন্যই প্রস্তুত হচ্ছি।”
এই ছোট বয়সে তাঁর অ্যাচিভমেন্টের তালিকাটাও খুব কম নয়। নিজেই গড় গড় করে বলে যাচ্ছিলেন জয়ন্তী। তাঁর প্রতিটি শব্দ থেকেই সারল্য বেরিয়ে আসে। তবে তাঁর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাফল্য তাঁর পাশাপাশি তাঁর পরিবারেও স্বাচ্ছন্দ এনেছে। ওড়িশায় এখন কোনও ক্রীড়াবিদের থাকাটাই আশীর্বাদের মতো। আর জয়ন্তী তো পুরীরই মেয়ে। তাই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে লাখ লাখ টাকার পুরস্কার। তাই এখন অনেক নিশ্চিন্তে নিজের দৌঁড়ে মন দিতে পারেন।
২০১৮-র ডিসেম্বরে কটকে অনুষ্ঠিত ৬৬তম ওড়িশা রাজ্য অ্যাথলেটিক্স মিটে জয়ন্তী ৪০০ মিটারে স্বর্ণ এবং 800 মিটারে রৌপ্য পদক জিতেছে৷ তিনি ৬৫তম ওড়িশা রাজ্য অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের অনূর্ধ্ব-২০ মেয়েদের ৪০০ মিটার এবং ৮০০ মিটার ইভেন্টে জোড়া স্বর্ণপদক জিতে নেন৷ এর আগেও রাজ্যস্তরে একাধিক পদক জিতেছেন। তাঁর মধ্যে ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে কটকে রাজ্য অ্যাথলেটিক মিটে অনূর্ধ্ব-২০ এবং অনূর্ধ্ব-১৮ স্প্রিন্টিং ইভেন্টে সোনা জিতেছিলেন এবং ১০০ মিটার, ২০০ মিটার এবং ৪০০ মিটার ইভেন্টে রৌপ্য পদক।
জয়ন্তী ২০১৬ সালে হরিয়ানার পঞ্চকুলায় ১৬তম প্যারা-অ্যাথলেটিক্স জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তিনটি স্বর্ণপদক জিতে জাতীয় স্তরে নিজেকে মেলে ধরেন৷ ২০১৮ সালে জাকার্তায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় এশিয়ান প্যারা গেমসে যথাক্রমে মহিলাদের ৪০০ মিটার (৫৯.৭১ সেকেন্ড সময় সহ) এবং ২০০ মিটারে (২৭.৪৫ সেকেন্ড সময় সহ) একটি রৌপ্য এবং একটি ব্রোঞ্জ পদক জেতেন টি৪৫/৪৬/৪৭ ইভেন্টে।
২০১৭ সালে সুইজারল্যান্ডের নটউইলে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জুনিয়র প্যারা অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের টি৪২-টি৪৭ ৪০০ মিটারে স্বর্ণ এবং ২০০ মিটার ইভেন্টে রৌপ্য পদক জেতেন। এছাড়াও তিনি চায়না ওপেন প্যারা অ্যাথলেটিক্স গ্র্যান্ডের ২০০ মিটার ও ৪০০ মিটারে একটি সোনা এবং একটি রৌপ্য জেতেন। জয়ন্তী জুলাই ২০১৭ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব সিনিয়র প্যারা অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন যেখানে তিনি ১৭ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ প্রতিযোগী ছিলেন এবং ৪০০ মিটার ইভেন্টে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেছিলেন। তিনি দুবাইতে এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমস-২০১৭-তে ১৩.৪৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে ১০০ মিটার দৌড়ে রৌপ্য পদক জিতেছিলেন।
ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক, ২০১৮ সালে তৃতীয় এশিয়ান প্যারা গেমসে ব্রোঞ্জ পদক জেতার জন্য জয়ন্তীর জন্য ১০ লক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেন৷ এছাড়াও একাধিক পুরস্কারমূল্য পেয়েছেন। জয়ন্তী বলছিলেন, “যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক স্যার আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁকে অনেক ধন্যবাদ। না হলে এত কিছু করতে পারতাম না।”
বাঁ হাতের কুঁচকে যাওয়া চামরা, কব্জি থেকে পাতা বেঁকে গিয়েছে সারাজীবনের মতো। ভুল করে সেই হাতে কিছু ভারী কাজ করে ফেললে ভুগতে হয়। তবে এই কটেজ হাতকে শরীর থেকে বাদ দিতে নারাজ জয়ন্তী। ডাক্তার বলেছিল এই হাত বাদ দিয়ে দিতে। এবার যেন জয়ন্তীর গলাটা একটু কেঁপে গেল। একটু থেমে বললেন, “ডআক্তআল বলেছিল হাত বাদ দিয়ে দিতে। আমি রাজি হইনি। ছোটবেলা থেকে তো এই নিয়েই সব করেছি। অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। এখন হাত বাদ দিলে আমি পাগল হয়ে যাব।”
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
