সুচরিতা সেন চৌধুরী: দুটো সত্তাই একই সঙ্গে কাজে লাগাতে পারেন সপ্তর্ষি রায় । সে কারণেই খেলোয়াড় সপ্তর্ষি আর কোচ সপ্তর্ষির মধ্যের লড়াইটা চলতেই থাকে দিন-রাত। তা-ও আপাতত বেছে নিয়েছেন কোচিংকেই। সব পরিকল্পনা সঠিক পথে গেলে আবার খেলার বোর্ডেও হয়তো ঝড় তুলবেন বাংলার এই গ্র্যান্ডমাস্টার। কিন্তু নিজেকে নিয়ে মোটেও প্রচারে রাজি নন তিনি।
প্র: দাবা শুরু কী ভাবে?
সপ্তর্ষি: আমি তখন খুব ছোট। এই বাড়িতেই থাকতাম। আর এই যে ঘরে বসে আছি, এখানে বসেই দাদা ওঁর বন্ধুদের সঙ্গে দাবা খেলত। দাদার বয়স তখন নয়, আর আমার সাড়ে চার। দেখতে দেখতে আমার খুব আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু ওঁরা আমাকে খেলায় নিত না! ছোট বলে। তখন মায়ের কাছে বায়না জুড়লাম, আমি খেলব। তখন মা আমাকে শেখাতে শুরু করে।
প্র: প্রাথমিক কোচিং তা হলে মায়ের কাছেই?
সপ্তর্ষি: এখানে একটা মজার গল্প আছে। আমার বাড়ির ঠিক উল্টো দিকে একটা ব্যায়ামের ক্লাব রয়েছে। আমি তাক করে বসে থাকতাম, কখন ওখানে কেউ ব্যায়াম করতে আসবে। আর যেই আসত, সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসতাম আমার সঙ্গে দাবা খেলার জন্য। আমার সঙ্গে দাবা না খেলে কেউ ব্যায়াম করতে যেতে পারত না। এ ভাবেই আমার দাবা খেলা শেখা।
প্র: কত বছর বয়সে প্রথম টুর্নামেন্ট খেলা?
সপ্তর্ষি: আমি যখন প্রথম টুর্নামেন্ট খেলি, তখন আমার বয়স সাড়ে ছয় থেকে সাত। সেটা ছিল অনূর্ধ্ব ৮ রাজ্য প্রতিযোগিতা। সে বার আমি চতুর্থ হই। তার পরের বছর আরও বড় করে প্রস্তুতি নিই। পরের বছরেই রাজ্য চ্যাম্পিয়ন। তার পর জাতীয় স্তরে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়ের মধ্যেই থাকতে শুরু করি। তা দেখে আমার অভিভাবকেরা বুঝতে পারেন যে দাবায় আমার আগ্রহ রয়েছে।
প্র: আপনার ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার আর গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার মধ্যে অনেকটা সময়ের ব্যবধান। সেটা কেন?
সপ্তর্ষি: দাবায় এখন সব থেকে বড় সমস্যা টাকার। একটা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়াটা খুবই কঠিন। কারণ, গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার জন্য অনেক বিদেশি টুর্নামেন্ট খেলতে হয়। এক বার বা দু’বার বিদেশে গিয়ে খেলেই গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে যাব, এই ভাবনাটা ভুল। বাঙালিদের সমস্যা হল, আমরা ভাবি টাকা ইনভেস্ট করার সঙ্গে সঙ্গে ফল পাব। সেটা কখনওই সম্ভব নয়। আর গ্র্যান্ডমাস্টার আর ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার্সের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। যাঁরা করেন তাঁরা সেটা ভাল জানেন। ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার হয়ে গিয়েছে বলেই সে গ্র্যান্ডমাস্টার হতে পারবে, সেটাও নয়। কারণ রেটিংয়ের বড় পার্থক্য রয়েছে। আমি আইএম খুব দ্রুত হয়েছিলাম। প্রথম রেটিং আসে ২০০০ সালে, সেটা ছিল ২১২০। ২০০২-এ আমি ২২০০ হই, ২০০৩-এ ২৩০০ আর ২০০৪-এ ২৪০০ রেটিং পেয়ে যাই।
প্র: সেই সময় আপনার বয়স কত ছিল?
সপ্তর্ষি: তখন আমার বয়স ১৪ বছর। আর আইএম হই ১৬ প্লাসে। এটাও আমাকে বিদেশে গিয়ে খেলেই করতে হয়েছে। তখন অনেক রকমের নিয়ম ছিল। নির্ধারিত কিছু বিদেশি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলতে হবে… ইত্যাদি। এখন এই সব নিয়মের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এত গ্র্যান্ডমাস্টার টুর্নামেন্ট ভারতে হত না সেই সময়। খুব বেশি হলে দুটো বা তিনটে হত। এখনও যা যা হয় তাতেও জিএম হওয়া কঠিন। এখনও বিদেশে গিয়ে বার বার না খেললে জিএম নর্ম পাওয়া সম্ভব নয়।
প্র: বিদেশে গিয়ে খেলার ক্ষেত্রে টাকার অভাব একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আপনাকেও তেমন কোনও সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছিল?
সপ্তর্ষি: ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার হওয়ার পর আমি অনেকগুলো দিন টাকার অভাবের মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। একটা টুর্নামেন্ট খেলে যে পুরস্কার মূল্য পেতাম সেটা নিয়েই বিদেশে চলে যেতাম টুর্নামেন্ট খেলতে। সেই পর্যায়ের কোচিং আমি পাইনি। সেই সময় আইএম, জিএমরা এখনকার মতো কোচিং দিতেন না। যাঁরা দিতেন, তাঁদের মূল্য এতটাই বেশি ছিল যা দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমাকে খেলতে খেলতেই তাই শিখতে হয়েছে। এবং নিজেকে তৈরি করতে হয়েছে। দেশে-বিদেশে শ’য়ের উপর জিএমের সঙ্গে দাবা খেলে আমি খেলাটাকে আয়ত্তে এনেছিলাম। তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তার পর তাঁদের সঙ্গে কাজ করে খেলা নিয়ে অ্যানালিসিস করতে করতে বুঝেছি। সেই সময় যেটা হয়েছিল, আমি আইএমদের হারাতে পারছি, কিন্তু জিএমদের পুরোপুরি হারাতে পারছিলাম না। ড্র করছিলাম। যেমন একটা টুর্নামেন্টে দু’জন জিএম-কে হারাচ্ছি আবার জিএম নর্ম করতে গেলে চারটে জিএম-কে হারাতে হবে। তার পর তিনটে জিএমে পৌঁছলাম তার পর চারটে জিএম হল। যাতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেল।

প্র: এর মধ্যেই আপনার কোচিংয়ে ঢুকে পড়া। সেটা শুধুই ভালবেসে, না কি টাকার অভাব মেটানোর জন্য?
সপ্তর্ষি: হ্যাঁ, জিএম হওয়ার আগেই আমি কোচিং শুরু করে দিই। কারণ, টাকার অভাবে অনেক কিছু আটকে যাচ্ছিল। সেটা একমাত্র মেটাতে পারত কোচিং। সেই সময় কোচিং করাতে শুরু করি। তাতে লাভও হয়। সেই টাকা দিয়েই বিদেশে খেলতে যেতাম। তার পর ধিরে ধিরে ২০১৭-তে গিয়ে আমি জিএম হই।
প্র: কোচ হিসেবে আপনি এখন অনেকটাই সফল। খেলার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বহু খেলোয়াড়ের সঙ্গে সম্পর্ক। খেলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগছে?
সপ্তর্ষি: এখন ছোট ছোট বাচ্চাদের সকলের প্রায় ল্যাপটপ রয়েছে। আমি ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার হওয়ার পর ল্যাপটপ কিনেছিলাম। ওই পর্যায়ে পৌঁছতে আমার ল্যাপটপের প্রয়োজন হয়নি। কারণ, বাড়িতে যা অনুশীলন করতাম তা দিয়েই সহজে জিততে পারতাম। কিন্তু বিশ্ব ঘুরে টের পেলাম সমস্যাটা কোথায়? আমি সমস্যার মুখে পড়লাম। কারণ, বিশ্ব স্তরে প্রতিটি প্লেয়ারের সঙ্গে কোচ আসতেন গ্র্যান্ডমাস্টার। আর ভারত থেকে পাঠানো হত ২২০০, ২৩০০ বা আইএম। তখন দেখলাম ওঁদের গ্র্যান্ডমাস্টার কোচেরা এমন নোভেল্টি তৈরি করে পাঠাতেন, যাতে আমরা দাঁড়াতেই পারতাম না ওঁদের সামনে। তখন মনে হল যে সমস্যার মুখে আমি পড়ছি সেটা যেন পরের প্রজন্মকে ফেস করতে না হয়। সেই থেকেই কোচিং শুরু। আমার খেলার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে অনেক কাজে লেগেছে।
প্র: আপনার কৃতি ছাত্রদের কথা যদি কিছু বলেন?
সপ্তর্ষি: সায়ন্তন বা দীপ্তায়নদের শেখাতে গিয়ে আমার জানাটা যখন প্রয়োগ করলাম, তখন দেখলাম, সেটা কাজে লাগছে। সায়ন্তনের বাবা-মাকে বলে দিয়েছিলাম, আমি যদি ওকে দেখাই, তা হলে ওয়ার্ল্ড টাইটেল জিতবে। আমি ওকে দিয়েই ছাড়ব ওই টাইটেল। আমি যেটা পাইনি, সেটা আমার ছাত্র পাবে। সায়ন্তন ২০০৮ বা ২০০৯-এ অনূর্ধ্ব-১২-তে ওয়ার্ল্ড টাইটেল জেতে। যাঁদের সঙ্গে ওর খেলার কথা ছিল, তাঁদের সকলের সম্পর্কে স্টাডি করেছিলাম। তাঁদের সব তালিকা করে সায়ন্তনকে পাঠিয়েছিলাম। তার পর থেকেই আত্মবিশ্বাসটা বেড়ে যায়।
প্র: আপনি রেলে চাকরি করেন। চাকরিটা কি বাধ্য হয়েই নিতে হয়েছিল?
সপ্তর্ষি: কলেজ পড়ার সময়ই চাকরি পেয়ে যাই। আমি বুঝতেই পারছিলাম না, কেন চাকরি করব সেই সময়। কিন্তু বাবা এবং অন্য আত্মীয়েরা বললেন, যে হেতু সরকারি চাকরি তাই আমাকে ওটা নিতেই হবে। টিপিক্যাল চিন্তাভাবনা ছাড়া কিছুই নয়। সরকারি চাকরিই শেষ কথা। বাধ্য হয়েই চাকরিতে যোগ দিই। কিন্তু যোগ দেওয়ার পর হতাশা বেড়ে যায়। মনে হয় এটার জন্য আমি জন্মাইনি। বিভিন্ন রকমের লোকজন কাজ করেন। তাঁরা শুধু মাইনের জন্যই কাজ করছেন। কোনও লক্ষ্য নেই। আমার মনে হয়েছিল সময় নষ্ট করছি।
প্র: চাকরি করতে গিয়ে খেলায় সমস্যা হয়েছিল?
সপ্তর্ষি: খেলার জন্যই চাকরি। কিন্তু খেলার জন্য ছুটি নেই। দেশের মধ্যে তা-ও ছাড় পাচ্ছিলাম। কিন্তু বিদেশে খেলতে যেতে পারছিলাম না। পুরো ব্যাপারটা ঘেঁটে গেল তখন। এমন লোকজনের উপর নির্ভর করতে হচ্ছিল, যাঁরা দাবা খেলাটাই বোঝেন না। গুরুত্বও দেন না। তখন মনে হল, কেরিয়ারটাই আটকে গেল। ইন্ডিয়ান অয়েলে যাঁরা আছেন, তাঁরা ভাগ্যবান। তাঁদের এই সমস্যার মুখে পড়তে হয় না। বেশির ভাগ সরকারি জায়গায় এই সমস্যা রয়েছে। যদি আজকেও বলি, আমি তিন মাসের জন্য বিদেশে খেলতে যাব, তা হলে আমার যে অফিসার রয়েছেন তিনি আকাশ থেকে পড়বেন।
প্র: এ সব সমস্যার মধ্যেই আপনি মুম্বই পাড়ি দিয়েছিলেন কোচিংয়ের জন্য। সেটা কী ভাবে সামলালেন?
সপ্তর্ষি: সেই সময় অফিস আমাকে বেতন দেয়নি। মুম্বইয়ের সময়টা আমার কেরিয়ারের সেরা সময়। যখন আমি চাকরি আর দাবার মধ্যে খাবি খাচ্ছি। তখন আমার কাছে অফার আসে, একটা বাচ্চা আছে, যাঁকে রাজ্য চ্যাম্পিয়ন করতে হবে। আমার হাতে ৬ মাস সময়। তার আগের বছর সেই ছেলেটি রাজ্য প্রতিযোগিতায় ৪০তম স্থানে শেষ করেছিল। সেখান থেকে চ্যাম্পিয়ন করতে হবে। তখন আমি বাচ্চাটিকে দেখতে চাই। ওর বয়স তখন ৯ বছর। তাঁকে অনূর্ধ্ব-১০-এ চ্যাম্পিয়ন করতে হবে! সব রকম ছাড় দেওয়া হয়েছিল। চলে যাই।

প্র: কিন্তু এত বড় একটা ঝুঁকি কী করে নিলেন? এক জনের সেরা হওয়ার পিছনে তো তারও প্রতিভা থাকতে হবে!
সপ্তর্ষি: আমি সহজে কথা দিই না। কিন্তু যখন দিই, তখন সব দিক খতিয়ে দেখেই দিই। আমি ওর ১০টা গেম দেখেছি তার আগে। ওর মানসিকতা, ধৈর্য্যের অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়েছি। আমি অনেক বাচ্চার সঙ্গে কাজ করেছি। তাই সাইকোলজিটা ভাল বুঝি। ও খুব শান্ত ছিল। আমি বুঝতে পারি, ওর পিছনে যদি ৮-১০ ঘণ্টা সময় দিই, তা হলে ওকে অনূর্ধ্ব-১৮-তে চ্যাম্পিয়ন করে দিতে পারব রাজ্য স্তরে। অবশ্য এই কথা আমি কখনওই দেব না যে, আমি ওকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করব। যেটা আমি মুম্বইয়ের এই ছাত্রের ক্ষেত্রে করেছিলাম। তার পর ওরা আমাকে ছাড়েনি। ২০১৩ থেকে ২০২০ পর্যন্ত আমি মুম্বইয়ে ছিলাম। তার পর কোভিডের সময় রীতি মতো ম্যানেজ করে পালিয়ে এসেছি।
প্র: মু্ম্বইয়ে থাকার সময় কি শুধু এক জন ছাত্রকে নিয়েই ছিলেন? না কি আরও ছাত্রছাত্রী ছিল?
সপ্তর্ষি: না! ওখানে অনেক বাচ্চার সঙ্গে কাজ করেছি। অনেককে এশিয়ান টাইটেল, জাতীয় টাইটেল দিয়েছিল। ওখানে আমার জীবনটা খুব ভাল ছিল। সবার সঙ্গে কাজ করাটাও দারুণ ছিল। কারণ, প্রত্যেক পরিবার উচ্চবিত্ত। স্টুডেন্টদের বিভিন্ন এক্সপোজার ট্রিপে বিদেশে নিয়ে যাওয়া যেত। বাবা-মায়েরা ভরসা করে তাঁদের সন্তানদের আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দিতেন। আমি রেলে যে মাইনে পেতাম, তার থেকে ১০ গুণ বেশি টাকা রোজগার করেছি সেই সময়।
প্র: আবার ফিরতে চান মুম্বইয়ে?
সপ্তর্ষি: এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এটা বলা খুব মুশকিল। আমি নিজেই জানি না। তবে এটা বলতে পারি, আমি আমার কোচিং কেরিয়ারকে খুবই ভালবাসি। আবার যদি এমন ইন্টারেস্টিং অফার আসে, তা হলে হয়তো কিছু দিনের জন্য যাব। ওই জীবনটা অন্য রকম।
প্র: প্লেয়ার সপ্তর্ষি আর কোচ সপ্তর্ষির মধ্যে কাকে কত রেট করবেন?
সপ্তর্ষি: এই উত্তর আমার পক্ষে দেওয়া খুবই মুশকিল। এটা তাঁরাই দিতে পারবেন, যাঁরা আমাকে চেনেন। এটা বলতে পারি, আমি দাবায় এমন কিছু গেম খেলেছি যা স্মরণীয় হয়ে আছে। ওটা আমার জন্য শুধুই খেলা নয়। আমি সব গেম এমন ভাবে খেলি যাতে সেটা যখন পরবর্তী প্রজন্ম দেখবে তাঁরা কিছু শিখতে পারে। সে ভাবে খেলেই আমি অনেক গ্র্যান্ডমাস্টকে হারিয়েছি।
প্র: তেমন কয়েকটা জয়ের কথা যদি শেয়ার করেন?
সপ্তর্ষি: আমার সব থেকে স্মরণীয়, নাইজেল শটকে হারানো। সেটা ছিল ব্যাঙ্কক ওপেন। স্পেনে আমি প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম করি ২০১৩-এ। ওখানে জিমি কুটাস আলেকজান্ডার নামে একজন গ্র্যান্ডমাস্টার ছিলেন. তাঁকে একদম অন্য পথে হারিয়েছিলাম, খুব তাড়াতাড়ি। ২৪ মুভেই ওকে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। ওভার দ্য বোর্ড দু’জনেই খেলছিলাম। কিন্তু কেউ লাইন নিয়ে নিশ্চিত ছিলাম না। স্বাভাবিক লাইনের বাইরে বেরিয়ে কাউকে হারানোটা অন্য রকম।
প্র: কোচ হিসেবে কোনটা আনন্দ দেয়?
সপ্তর্ষি: এক জন কোচের কাছে সব থেকে আনন্দের তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সাফল্য। হয়তো তাঁরা অনেক কোচের সঙ্গেই কাজ করবেন ভবিষ্যতে। এখনও করছেন একাধিক কোচের সঙ্গে। আমার পাওনা এখান থেকে এটুকুই। আমি যাঁকে যে স্টাইলটা দিয়েছি, সে সেটা নিয়েই সারা জীবন খেলছে এবং সাফল্য পাচ্ছে। আমি দেখি, স্টুডেন্ট ওপেনিং আর খেলার স্টাইল যদি আমারটা নেয়, তা হলে সেটা আমার প্রাপ্তি।
প্র: প্লেয়ার হিসেবে এই মুহূর্তে কোনও লক্ষ্য আছে?
সপ্তর্ষি: সত্যি কথা বলতে কী, গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পর প্লেয়ার হিসেবে লক্ষ্যটা অনেকটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছে। গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পর যেটা স্বাভাবিক ভাবে লক্ষ্য হয়, সেটা হল বিদেশে গিয়ে পড়ে থাকা আর ২৬০০ রেটিং করা। পাঁচ-ছ’বছর বাদে যদি সম্ভব হয় এই চেষ্টাটা করতে পারি। তবে এখনই কোনও লক্ষ্য নেই। পরিকল্পনা করেছি। সেটা সফল হলে নিশ্চই ২৬০০ করব। আপাতত চাকরি করার জন্য আটকে যাচ্ছি।
প্র: দাবায় একটা সময়ের পর কোচিং নেওয়াটা সাধ্যের বাইরে চলে যায়। কী ভাবছেন সেটা নিয়ে?
সপ্তর্ষি: এটা প্রথম থেকেই ছিল। এবং এখনও আছে। আমি বাংলার ছাত্রছাত্রীদের জন্য একদম কম টাকা নিই। কলকাতার কোনও কোনও আইএম-ও আমার থেকে বেশি পারিশ্রমিক নেন। আমার একটাই শর্ত, কোথাও গিয়ে শেখাব না। শিখতে হলে আমার বাড়িতে এসে শিখতে হবে। সিনিয়র বা গ্র্যান্ডমাস্টারদের ক্ষেত্রে আগে যা পরিস্থিতি ছিল এখন কিন্তু তেমনটা নেই। এখন অনেক টুর্নামেন্ট হয়।
প্র: তাহলে কী বলছেন রাস্তাটা অনেকটা সহজ হয়ে গিয়েছে?
সপ্তর্ষি: সহজ না হলেও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। এখন জিএম হওয়ার মানচিত্রটা ঘরে বসে আঁকা যায়। আগে বিদেশে গিয়ে টানা তিনটি টুর্নামেন্ট খেলতে খরচ হত দু’লাখ টাকা। সেটার এখন মূল্য আট লাখ টাকার কাছাকাছি হবে। কিন্তু এখনও দু’লাখ টাকায় বিদেশে গিয়ে টুর্নামেন্ট খেলা যায়। এখন অনেক টুর্নামেন্ট হয় দেশেও। স্পনসরও আসছে। সব মিলে অনেকটাই ক্লিয়ার হয়েছে রাস্তাটা।
হয়তো সমস্যাগুলোর সঙ্গে লড়াই করতে করতেই নিজেকে কোচ করে তোলা সপ্তর্ষির, যাতে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথ চলাটা সহজ হয়। নিজের তৈরি করা ‘নভেল্টি’ যত্ন করে রেখেছেন পরের প্রজন্মের জন্য। প্রায় তিন হাজার ‘নভেল্টি’ নিজের গ্র্যান্ডমাস্টার নর্মের জন্য তৈরি করেছিলেন সপ্তর্ষি। তার মধ্যে ব্যবহার করেছেন ৭০০-৮০০ ‘নভেল্টি’। বাকি ২২০০ এখনও তাঁর কাছে রয়েছে। যেগুলো তিনি তাঁর ছাত্রদের দেন। আর তা দিয়েই সাফল্য পান তাঁরা। এটিকেই নিজের কোচিং কেরিয়ারের সাফল্য বলছেন সপ্তর্ষি।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
