মুনাল চট্টোপাধ্যায়: আগামী বছর জাপানে এশিয়ান গেমসের আসর বসবে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর। ভারতের অন্যান্য খেলাধুলোর অ্যাথলিটদের এশিয়াডে অংশগ্রহণ নিয়ে তেমন চাপ না থাকলেও, ভারতীয় পুরুষ ও মহিলা ফুটবল দলের অংশগ্রহণ নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রকের নতুন বিজ্ঞপ্তি জারিতে।
তাতে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে, এশিয়াডে অংশগ্রহণ করতে ভারতীয় কোনও দলকে এশিয়ার প্রথম ৮য়ের মধ্যে থাকতে হবে, অথবা এএফসি এশিয়ান কাপে কম করে ৮য়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। এখানেই সমস্যা বেধেছে। এই মুহূর্তে ভারতীয় পুরুষ বা মহিলা ফুটবল দল সেই শর্ত পূরণের জায়গায় নেই। বিজ্ঞপ্তির সারমর্ম হল, যদি কেন্দ্রীয় মন্ত্রক ও সাইয়ের মনে হয় কোনও অ্যাথলিট বা কোন দল শুধুমাত্র অংশগ্রহণের লক্ষ্যে এশিয়াডে অংশ নিতে চায়, পদক জয়ের লক্ষ্যে নয়, বা কোনও সম্ভাবনাই নেই, সেই অ্যাথলিট বা দলকে এশিয়াডে পাঠানোর কোনও যুক্তি নেই।
ভারতীয় পুরুষ ফুটবল গতবছর এশিয়ান কাপের মূল পর্বে গ্রুপ লিগেই ছিটকে গিয়েছিল কোনও ম্যাচ না জিতে। বর্তমানে এশিয়ায় সুনীলদের র্যাঙ্ক ২৪, ফিফা ক্রমতালিকায় ১৩৪। যা খুবই হতাশাজনক। এবার সুনীল, সন্দেশরা এএফসি এশিয়ান কাপ কোয়ালিফায়ারে এতটাই খারাপ জায়গায় রয়েছেন, শেষপর্যন্ত ২০২৭ সৌদি আরবের মূল পর্বে আদৌ যেতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সেখানে ভারতীয় মহিলা ফুটবল দলের অবস্থা বেশ আশাব্যঞ্জক। এশিয়াতে সঙ্গীতা বাসফোরদের র্যাঙ্কিং ১২। ২০২২ এশিয়ান কাপে কোভিডের কবলে পড়ে ভারতীয় ফুটবল দলকে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। সেটা না হলে, ভারতীয় মহিলা দলে শেষ আটে যাওয়ার সুযোগ থাকত। গত এশিয়াডে ভারতীয় মহিলা ফুটবল দল অবশ্য গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে পারেনি। তবে এবার আবার এশিয়ান কাপের মূল পর্বে উঠেছেন সঙ্গীতারা কোচ ক্রিসপিন ছেত্রীর হাত ধরে যথেষ্ট ভাল খেলে। শুধু শেষ ৮য়ে নয়, অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠেয় এশিয়ান কাপে ভাল করে আগামী মহিলা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের জোর স্বপ্ন দেখছেন সঙ্গীতারা। তাই তাঁদের জাপান এশিয়াডে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা থাকছে।
তবে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রকের কড়ী নীতি থাকলেও, ফেডারেশন সভাপতি কল্যান চৌবে বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে রাজি করাতে পেরেছিলেন ভারতীয় পুরুষ ও মহিলা দলকে চিনের হ্যাংঝৌ এশিয়াডে পাঠাতে। অনেক প্রতিকূলতা সামলে তৎকালীন ভারতীয় কোচ ইগর স্টিমাচের হাত ধরে সুনীল ও ভারতীয় নবীন ব্রিগেড গ্রুপ লিগ পর্বের গন্ডি পেরিয়ে প্রিকোয়ার্টার ফাইনাল, অর্থাৎ শেষ ১৬য়ে পৌঁছান। প্রিকোয়ার্টারে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে দুরন্ত লড়াই করে শেষপর্যন্ত হেরে এশিয়াড থেকে ছিটকে যান। তবে সেবার যে পরিস্থিতিতে ভারতীয় পুরুষ দল, যেটা মূলত অনূর্ধ্ব ২৩ ফুটবলারে গড়া ছিল, সুনীলের মতো হাতে গোনা সিনিয়র ছাড়া, এশিয়াডের নিয়ম মতো, সেটা প্রশংসনীয়। দুঃখের বিষয়, এশিয়াডের জন্য ক্লাবগুলো ফুটবলারই ছাড়তে চায়নি। শেষপর্যন্ত একটা জোড়াতালি দেওয়া দল নিয়ে এশিয়াডে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন স্টিমাচ। ক্লাবগুলোর অসহযোগী মনোভাবে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন স্টিমাচ। বলেওছিলেন, এই কারণে ভারতীয় ফুটবলের কিছু হবে না।
সেখানে ভারতীয় মহিলা ফুটবল দল লড়ে ২০২৫য়ে অস্ট্রেলিয়ায় ১-২১ মার্চ অনুষ্ঠেয় এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতার্জন করেছে দাপটের সঙ্গে। এক লাফে ফিফা ক্রমতালিকায় ৭ ধাপ ওপরে উঠে এসেছে। সঙ্গীতাদের স্থান এখন ৬৩। এশিয়ান কাপে শেষ ৮য়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা জাগিয়েছেন সঙ্গীতারা নিজেদের সাম্প্রতিক পারফরমেন্সে। এখন সেই ধারাবহিকতা বজায় রাখতে হবে এশিয়াডেও খেলার সুযোগ করে নিতে।
অতীতে এমন নীতির কারণে ও বাড়তি কোনও উদ্যোগ না নেওয়ায় প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি ও প্রফুল প্যাটেল কেবিনেট মন্ত্রী থাকতেও ভারতীয় ফুটবল দল মাঝে একটা লম্বা সময় এশিয়াডে অংশ নেয়নি। অথচ একটা সময় এশিয়াডে অনূর্ধ্ব ২৩ ফুটবল দলের সঙ্গে মাত্র ৩ জন সিনিয়র ফুটবলার খেলানোর নিয়ম বলবত হয়নি। বিজয়নরা তখন তুখোড় ফর্মে। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি তা সত্ত্বেও দল পাঠানোর ব্যাপারে আগ্রহ না দেখানোয়, ভারতীয় ফুটবল আন্তর্জাতিক মঞ্চে অনেকটাই পিছিয়ে যায় ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেই মুল্যায়নের সুযোগ হারানোয় এশিয়াডে না খেলে। পরে প্রফুল প্যাটেলের সময়ও এমন একটা পর্ব গেছে। এতে ভারতীয় ফুটবলের ক্ষতিই হয়েছে।
তবে গতবার এমন কড়া নীতি থাকতেও শেষপর্যন্ত ভারতীয় পুরুষ ও মহিলা দল হ্যাংঝৌ এশিয়াডে অংশ নিয়েছিল। তার জন্য বাড়তি উদ্যোগ অবশ্যই নিয়েছিলেন ফেডারেশন সভাপতি কল্যান চৌবে, নিজের পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে। কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রক ও সরকারকে দল পাঠাতে রাজি করাতে পেরেছিলেন। এবারও কি সেই উদ্যোগ নেবেন, এই প্রশ্নে কল্যানের প্রতিক্রিয়া, ‘ গতবারও তো এমন নীতি থাকতেও দল পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলাম বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে। শুধু সরকারের বিধিনিষেধের বেড়া টপকে বিশেষ অনুমতি আদায় করে এমন নয়, দেশের ক্লাবগুলো কোচের বাছাই করা পছন্দের ফুটবলারদের এশিয়াডের জন্য ছাড়তে না চাওয়ার মতো অসহযোগিতা স্বত্তেও। এবার শেষপর্যন্ত এশিয়াডে দল পাঠানোর অনুমতি মিললে ক্লাবগুলো সহযোগিতা করবে কিনা, সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। কারণ সেসময় ঘরোয়া ফুটবল লিগ চলবে। এবারই তো কাফা নেশনস কাপে খেলার জন্য দেশের নামী ক্লাব ফুটবলার ছাড়েনি। তবু ভারতীয় দল তাদের ছাড়াই ব্রোঞ্জ জিতে গর্বিত করেছে। এখন এএফসি এশিয়ান কাপ কোয়ালিফায়ার ম্যাচের আগেও অনেক দল ফুটবলার ছাড়েনি ভারতীয় শিবিরে। এসব সত্ত্বেও এশিয়াডে দল পাঠানোর চেষ্টা তো করব। ভারতীয় মহিলা দল তো ভাল করছেই, ওদের এশিয়াডে খেলার সম্ভাবনা প্রবল, নিয়মমাফিক শর্তপূরণ করে। ভারতীয় পুরুষ দল বলা ভাল, যুব দল, যেটা মূলত অনূর্ধ্ব ২৩ ফুটবলারে ভরা, তারা সম্প্রতি এএফসি এশিয়ান কাপ কোয়ালিফায়ারে ব্যর্থ হয়ে অল্পের জন্য মূল পর্বে খেলার সুযোগ ফসকেছে। এদের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যত। এরাই ভবিষ্যতের সিনিয়র দলের ভিত। এদের খেলার সুযোগ করে দিতে পারলে ভারতীয় ফুটবল এগোবে।’
তবে এর মাঝে একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, ফেডারেশন সভাপতি পদে কল্যান চৌবের মেয়াদ আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত। তারপর তিনি পুনরায় সভাপতি পদে নির্বাচিত হবেন কিনা, তা নিয়ে ঘোর সংশয় আছে। তাই তিনি না থাকলে, তাঁর তো এশিয়াডে দল পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া সুযোগ থাকবে না। তাঁর জায়গায় যিনি আসবেন, তিনি কি ততটা সক্রিয় ভূমিকা নেবেন? দেখা যাক, শেষপর্যন্ত কী হয়? আশাতেই তো বাঁচে চাষা।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
