মুনাল চট্টোপাধ্যায়: এর আগে কখনও কলকাতা ডার্বি আইএসএলের চ্যাম্পিয়নশিপ নির্ণায়ক ম্যাচ হয়নি। তার বড় কারণ মোহনবাগান লিগ টেবিলের ওপরের দিকে থাকলেও, ইস্টবেঙ্গলকে সবসময় লড়তে হয়েছে নিজেদের অবস্থান ভাল করতে। এবার কিন্তু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রবিবারের আইএসএল ডার্বি খেলতে নামছে ইস্টবেঙ্গল লিগ শীর্ষে থেকে। পয়েন্ট প্রাপ্তির দিক থেকে সমসংখ্যক ম্যাচে পয়েন্ট সমান হলেও, গোল পার্থক্যে ইস্টবেঙ্গল অনেকটাই এগিয়ে মোহনবাগানের তুলনায়। এর অর্থ ইস্টবেঙ্গলের ড্র করলেই চলবে, আইএসএল খেতাব পকেটে পুরতে, কিন্তু মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকে জিততেই হবে চ্যাম্পিয়ন হতে। আর সেকারণেই রবিবাসরীয় ডার্বিকে ফাইনাল হিসেবে দেখছেন সবুজ মেরুনের হেড স্যার সের্জিও লোবেরা ও রক্ষণের অন্যতম মূল স্তম্ভ আলবার্তো রডড্রিগেজ।
জিততেই হবে এই পরিস্থিতিতে নিজের দলের ফুটবলারদের চাপমুক্ত রাখার চেষ্টা করছেন বাগান কোচ লোবেরা। অন্তত শনিবার যুবভারতীর ট্রেণিং গ্রাউন্ডের অনুশীলনে সেই মনোভাবটাই লক্ষ্য করা গেছে। ম্যাচের আগের দিন সাংবাদিক সম্মেলনে কোচ লোবেরার কথায় ফুটে ওঠা আত্মবিশ্বাসী মেজাজটা যদি ফুটবলারদের খেলায় রূপান্তরিত হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে মোহনবাগান গত কয়েকটা ম্যাচের ছন্নছাড়া ভাব কাটিয়ে উঠে ইস্টবেঙ্গলকে ঝামেলায় ফেলে দিতে পারে ডার্বিতে। সসম্যায় জর্জরিত ইন্টার কাশীর বিরুদ্ধে ড্র করে বাগান ফুটবলারদের মধ্যে একটা ঝিমিয়ে পড়া ভাব ধরা পড়েছে শরীরি ভাষায়। কোচ লোবেরা ডার্বির আগে ফুটবলারদের চাগিয়ে চেনা ছন্দে ফেরাতে মরিয়া।
বাগান সমর্থকদের জন্য স্বস্তির খবর, চোট সারিয়ে সম্পূর্ণ ফিট হয়ে মাঝমাঠে ফিরছেন আপুইয়া। বিগত কয়েকটা ম্যাচে আপুইয়ার না থাকা ভুগিয়েছেন বাগান ব্রিগেডকে। প্রতিপক্ষ ইস্টবেঙ্গলের বৈচিত্রময় ও শক্তিশালী মাঝমাঠকে টক্কর দিতে আইপুইয়ার উপস্থিতি ডার্বিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলাই বাহুল্য। কোচ লোবেরা অনুশীলনে শুটিংয়ের ওপর জোর দেওয়ার সঙ্গে সেট পিস অভ্যাসটা বেশি করে ঝালিয়ে নিলেন। এটাই তো মোহনবাগান কোচকে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় রেখেছে। সেটা পিসে গোল করা ও বাঁচানোর দুর্বলতা না কাটাতে পারলে, ইস্টবেঙ্গল আঘাত হানতে পারে ম্যাচে।
এবারের ডার্বি যে আলাদা মাত্রা পেয়েছে, সেটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের অনুশীলনে ক্লাব সভাপতি দেবাশিস দত্তর উপস্থিতি। ফুটবলারদের উজ্জীবিত করার পাশাপাশি দেবাশিস বলেন, প্রয়াত প্রাক্তন সভাপতি টুটু বসুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ডার্বির আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করবেন দু’দলের ফুটবলাররা। এব্যাপারে ফেডারেশনের অনুমতি মিলেছে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখতে এসেছিলেন ফেডারেশন সভাপতি কল্যান চৌবে। তিনি জানালেন, ডার্বি ম্যাচে উপস্থিত থাকার জন্য বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামানিককে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তাঁদের উপস্থিতি ডার্বি ম্যাচে যে আলাদা মাত্রা জোগাবে, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
জিততেই হবে এই পরিস্থিতিকে চাপ বলে মনে করেছেন না মোহনবাগান এসজি কোচ লোবেরা। বলেন, ‘ এইধরনের ডার্বিতে কোচ হিসেবে রিজার্ভ বেঞ্চে থাকাটা সবসময় জীবনে একটা বড় সুযোগ। আর জিতলে দল চ্যাম্পিয়ন হবে, এটা তো বাড়তি মোটিভশেন। সমর্থকদের জন্য ট্রফি জেতা উচিত। গত ম্যাচগুলিতে কী হয়েছে, সেটা এখন আর বিচার্য নয়। ডার্বি সবসময় অন্যধরনের ম্যাচ, ভিন্ন মেজাজের লড়াই। ট্রফি জিততে , ইস্টবেঙ্গলকে হারাতেই হবে। আইএসএলের ইতিহাসে এটা সেরা ইস্টবেঙ্গল দল। অন্য দলগুলোর তুলনায়। তাই ২৬ ম্যাচের আইএসএলের তুলনায় এবারের ১৩ গেমের লড়াইটা অনেক বেশি কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বতামূলক। তবে আমার ফুটবলাররাও তৈরি মাঠে নেমে সেরা দেওয়া। ডার্বি জিতে আইএসএলের প্রথম দল হিসেবে পরপর তিনটি ট্রফি লাভ করে ইতিহাস গড়ার সুযোগ। সেটাই মোটিভেশন।’
গোলের সুযোগ নষ্ট করায় ডার্বির ফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে মোহনবাগানকে। সেকথা মাথায় রাখতে নারাজ কোচ লোবেরা। তাঁর বক্তব্য, ‘ কী হয়েছে সেটা এখন আর বড় ব্যাপার নয়। ৬ ম্যাচ বাকি থাকতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলে তো ভাল হত। সেটা যখন হয়নি, তখন এখন ডার্বি জেতা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই। গোলের সুযোগ এলে কাজে লাগাতে হবে ডার্বির মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জিততে। টিভিতে এইধরনের ম্যাচ উপভোগ করতে ভাল লাগে। কিন্তু মোহনবাগান কোচ হিসেবে ডার্বিতে রিজার্ভ বেঞ্চে বসাটা অবশ্যই অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।’
ইস্টবেঙ্গল কোচ অস্কার ব্রুজোঁ বলেছেন, স্প্যানিশ কোচেরা মূলত অ্যাটাকিং ফুটবলেই ভরসা রাখেন ম্যাচ জিততে। লোবেরাও সেপথে হাঁটবেন নিশ্চয়ই। এনিয়ে লোবেরার প্রতিক্রিয়া, ‘এটা ওঁর মত। আমার নিজস্ব একটা দর্শন আছে। আক্রমণাত্মক খেলার সঙ্গে রক্ষণটা সমান জমাট রাখা জরুরি। গোল না খেয়ে ৯০ মিনিটে গোল করে জয় তুলে নেওয়াটাই হবে মূল লক্ষ্য।’
আইএসএলে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট গোল করেছে ইস্টবেঙ্গলের তুলনায় কম, একইসঙ্গে গোল হজম করেছে কম। এটা কি মোহনবাগান ডিফেন্ডার হিসেবে আপনাকে ডার্বিতে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে? ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণভাগে এজেজারি ও মিগুয়েলের মতো ফুটবলার আছেন। এঁদের নিয়ে কি চিন্তায় আছেন? মোহনবাগান রক্ষণের অন্যতম মূল স্তম্ভ আলবার্তো রডড্রিগেজের জবাব, ‘ অতীত নিয়ে ভেবে লাভ নেই। এখন শুধুই ফোকাস ডার্বিতে। প্রতিপক্ষ দলে কে আছেন, সেটাও বড় ব্যাপার নয়। ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে খেলা, জেতার লক্ষ্যটাই মোটিভেশন। চাপ নয়। কোচ লোবেরা যেমন বলেছেন, এটা ফাইনাল। সেই মানসকিতা নিয়েই ১০০ ভাগ উজাড় করে দিতে মাঠে নামব।’
গত কয়েকটা ম্যাচে ছন্দে নেই মোহনবাগানের গোলমেশিন ম্যাকলারেন, কামিংস, দিমিত্রিয়স, রবসনরা। মনবীর, লিস্টন, সাহালরাও গোলের মাঝে নেই। ডার্বিতে তাঁরা নিজেদের ফর্ম ফিরে পেলে ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ বের করা অসম্ভব হবে না, নইলে সুপার কাপের মতো গোল করতে না পেরে ড্র করে চ্যাম্পিয়নশিপের দৌড় থেকে ছিটকে যেতে হবে বাগান বাহিনীকে। এখনও পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গল কোচ চলতি মরশুমে অস্কারের কোচিংয়ে ডুরান্ডে জয়, শিল্ডে হারের পর সুপার কাপে ড্রয়ের মুখ দেখেছে ইস্টবেঙ্গল। লোবেরার এটাই প্রথম ডার্বি মোহনবগান কোচ হিসেবে। এখন দেখার শেষপর্যন্ত কে কাকে টেক্কা দেন?
