ছবি: ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ
আর্জেন্টিনা ৩(রোমেরো, মেসি, এনজো) মিশর ২(ইয়াসের, মোস্তাফা)
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: মেসি হ্যায় তো সবকুছ মোমকিন হ্যায়। ফুটবল দেবতা যখন বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে বিশ্বের সেরা ফুটবলার মেসির অকাল বিদায় চান না, তখন মিশরের ফারাওয়ের ফুটবলারদের সাধ্য কী মেসির দল কাতারে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে প্রিকোয়ার্টার ফাইনাল পর্যায়ে ছিটকে দেয়। মেসিরা দেখালেন, এভাবেও ঘুরে দাঁড়ানো যায় নিজেদের ওপর বিশ্বাস থাকলে। আটলান্টা স্টেডিয়ামে ০-২ গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ ১১ মিনিটে ২ গোল শোধ করে দুরন্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে, সংযুক্তি সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে তৃতীয় গোল করে ৩-২ ফলে ম্যাচ জিতে কোয়ার্টারফাইনালে পৌঁছে মেসিরা প্রমাণ করলেন, তাঁরা প্রকৃতই চ্যাম্পিয়ন।
একটা সময় মনে হচ্ছিল মদ্রিচ, নেইমার, রোনাল্ডোর পর মেসির খেতাব ধরে রাখার লক্ষ্যপূরণ হবে না। কিন্তু মেসি নিজের ইতিহাস নিজেই লেখেন। ৩৯ বছর বয়সেও তাঁর জয়ের খিদে এতটুকু কমেনি। বরং অনেক নবীন ফুটবলারদের থেকে তা বেশি। মেসির বিদায়ে বিশ্বকাপ তার জৌলুস অনেকটাই হারিয়ে ফেলত। সেটা না হওয়ায় মেসি ভক্তরা তো খুশি হবেনই, ফিফাও কম খুশি হয়নি। আর মেসি নিজেও তো আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন ম্যাচ শেষে। বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার আশঙ্কা যখন চেপে বসেছিল, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জিতে নিজের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পারায় সতীর্থদের জড়িয়ে ধরে মেসি। তাঁর জল ভরা চোখ বলে দিয়েছে, মেসি কতটা স্বস্তি পেয়েছেন দলের জয়ে। কোয়ার্টারফাইনালে কানসাস সিটিতে আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ কলম্বিয়া ও সুইজারল্যান্ডের বিজয়ী দল।
মিশরের হারের কারণ অনভিজ্ঞতা। ২ গোলে এগিয়ে থাকার আত্মতুষ্টির সঙ্গে অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশল মিশরকে ডোবালো। মহম্মদ শালার হারের আরও একটা বড় কারণ, ২ গোলে এগিয়ে যেতে মিশরের যে ফুটবলাররা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নিয়েছিলেন, তাঁদের বসে যাওয়া। মিশরের কোচ যে বদলি ফুটবলারদের নামালেন, তাঁরা দলের বাকিদের সঙ্গে বোঝাপড়া গড়ে তুলতে না পারায়, দলের খেলার শেপ শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যায়। তাতেই রক্ষণের জমাট ভাব ভেঙে পড়ে। সে সুযোগটা পুরো কাজে লাগালেন মেসিরা। প্রশংসা করতে হবে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিকে। তিনি ২ গোলে পিছিয়ে থাকার সময় দিশেহারা না হয়ে, যেকটি বদল করেন দলে, তাতেই বাজিমাত।
১৫ মিনিটে মিশর এগিয়ে গিয়েছিল ইয়াসের ইব্রাহিমের গোলে। কর্নার থেকে বল পেয়ে মারওয়ান আতেয়া আর্জেন্টিনা বক্সে বল ভাসালে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের মাথার ওপর লাফিয়ে হেডে সেই বল জালের ভেতর পাঠান ইব্রাবিম। আর্জেন্টিনা গোলকিপার এমি মার্টিনেজের দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার ছিল না।
আর্জেন্টিনা সমতা ফেরানোর সুযোগ পেয়েছিল ২১ মিনিটে। মিশরের হাসিম হাসান বক্সের মাঝে ফাউল করলে আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পায়। কিন্তু আর্জেন্টিনার কিংবদন্তী তারকা ফুটবলার মেসির নেওয়া পেনাল্টি সঠিকভাবে অনুমান করে বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে রুখে দেন মিশরের গোলকিপার মোস্তাফা সুবের। এরপর সুবের আর্জেন্টিনার আরও দুটি গোলের প্রচেষ্টা রুখে লিড ধরে রাখেন।
৬৭ মিনিটে প্রতিআক্রমণ থেকে দ্বিতীয় গোল করে মিশর হতাশা ও চিন্তা বাড়িয়েছিল আর্জেনটনা শিবিরের। হাসিম হাসান বল কেড়ে নিয়ে গতি বাড়িয়ে ডাল প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ হেনে আর্জেন্টিনা বক্সের সামনে পৌঁছে শালাকে পাস বাড়িয়েছিলেন। শালা সেই বল ফেরত দেন হাসিমকে। তিনি মাইনাস রাখেন পেছন থেকে উঠে আসা মোস্তাফা জিকোকে। গোলকিপার মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন জিকো মাপা শটে। ওই গোলের পর আর্জেন্টিনা সমর্থকদের চোখ মুখ, ভিভিআইপি বক্সে বসা দিয়েগো সিমিওনের উদ্বেগ বলে দিচ্ছিল, এভাবে আর্জেন্টিনার পিছিয়ে পড়া তাঁরা মানতে পারছেন না। কিন্তু প্রকৃত চ্যাম্পিয়নরা খেলার শেষ বাঁশি বাজা নাপর্যন্ত হার মানে না। গত ম্যাচে কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে শেষমুহূর্তে গোল তুলে নিয়ে ম্যাচ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। দু’বার আর্জেন্টিনা গোল করে এগিয়ে গেলেও কেপ ভার্দে দু’বার সমতা ফিরিয়েছিল। তারপরও মেসির নেতৃত্বে সংযুক্তি সময় গোল করে আর্জেন্টিনা ম্যাচ জেতে। সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই মিশরের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো শুরু নির্ধারিত সময় শেষ হতে ১১ মিনিট বাকি থাকতে।
ওই যে আগেই বললাম, মেসি হ্যায় তো সবকুছ মোমকিন হ্যায়। ৭৯ মিনিটে মেসির ক্রশ থেকে বদলি হিসেবে মাঠে নামা ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর গোল নিখুঁত হেডে। আর্জেন্টিনা তো সেই ক্ষুধার্ত সিংহ, যে একবার রক্তের গন্ধ পেলে শিকারকে শেষ না করে ছাড়বে না। ১ গোলের ব্যবধান কমতেই মিশর অতিরক্ষণাত্মক ছকে খোলসে ঢুকে পড়ার সুযোগে বাড়তি উৎসাহ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। ৮৩ মিনিটে গঞ্জালো মন্টিয়েলের ব্যাক পাস থেকে বল পেয়ে বাঁপায়ের দুরন্ত শটে মেসি মিশরের গোলকিপারকে হার মানান। চলতি বিশ্বকাপে মেসির ৮ নম্বর গোল। পরপর ৯ ম্যাচে গোল পেলেন মেসি। বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা এখন ২০। ওই গোলের পর মেসির উচ্ছ্বাস ছিল নজরকাড়া। আসলে ম্যাচের শুরুতে পেনাল্টি নষ্ট করার যন্ত্রণা তাঁকে ভেতরে কুরে কুরে খাচ্ছিল। তাই সমতা ফেরানোর গোল করে মেসি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। পেনাল্টি নষ্টের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারার তৃপ্তি ও স্বস্তি তাঁকে এতটা উদ্বেল করে তুলেছিল।
২ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ২ গোল খেয়ে মিশরের খেলা থেকে যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। যে রক্ষণকে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত দুর্ভেদ্য মনে হয়েছিল, শেষ ১১ মিনিটে সেটা তাসের ঘর মতো ভেঙে পড়ায়, মিশর ছন্নছাড়া হয়ে যায়। সংযুক্তি সময়ে রক্ষণ সংগঠনের শেপ ও শৃঙ্খলা খুইয়ে আক্রমণে উঠে বল খুইয়ে মিশর ফুটবলাররা আর্জেন্টিনার পাল্টা আক্রমণ ঠেকানোর ব্যাপারে আলগা ভাব দেখায়। তারই খেসারত দিয়ে তৃতীয় গোল হজম করে সংযুক্তি সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে। প্রতি আক্রমণ থেকে বল পান লওতারো মার্টিনেজ মিশরের অর্ধের ডানপ্রান্তে। বল নিয়ে খানিকটা উঠে মিশরের বক্সে বল ভাসান তিনি। তখন রক্ষণের পাহারায় মিশরের একজনই মাত্র ডিফেন্ডার ছিলেন। বক্সে ভেসে আসা বল অনুসরণ করে এসে চমৎকার হেডে বল মিশরের জালের ভেতর পাঠান এনজো ফার্নান্ডেজ। মিশরের কফিনে শেষ পেরেকটা পুঁতে বিশ্বকাপ থেকে মহম্মদ শালার দলের বিদায় নিশ্চির করে দিলেন।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
