মুনাল চট্টোপাধ্যায়: দেশজুড়ে ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে চলছে তুমুল মাতামাতি। আর্জেন্টিনার মেসি, স্পেনের ইয়ামাল, ইংল্যান্ডের কেন, না ফ্রান্সের এমবাপে,কার হাতে বিশ্বকাপটা শেষপর্যন্ত উঠবে, তা নিয়ে ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে তুমুল চর্চা, এমনকি রেষারেষি তুঙ্গে উঠেছে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের আগে। উন্মাদনা এমন পর্যায়ে, যেন ভারতই বিশ্বকাপে খেলছে। কিন্তু কঠিন বাস্তবই বলুন, আর দুঃখের কথাই বলুন, বিশ্বকাপ তো দূর অস্ত, এবার এশিয়ান গেমসের আসরেই নেই ভারতীয় পুরুষ ও মহিলা দল। সবচেয়ে বেদনার বিষয় হল, ভারতীয় পুরুষ ও মহিলা দলের সামনে আইচি-নাগোয়া ২০২৬ এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও, কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রক সরকারের কথা অনুযায়ী দু’টি দলকেই এশিয়াডে পাঠাচ্ছে না। অতএব ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীরা ঘরোয়া ফুটবল নিয়েই লাফালাফি করে বেঁচে থাকুক।
এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণের শর্তপূরণ করেছিল ভারতীয় পুরুষ ও মহিলা ফুটবল দল জাপানের আইচি নাগোয়াতে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় প্রতিযোগিতায়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের এশিয়ান গেমসে খেলতে যাওয়ার নিয়মের বেড়াজালে দু’দলকেই এশিয়াড থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিতে হয়েছে। এর থেকে দুর্ভাগ্য ভারতীয় ফুটবল দলের আর কী হতে পারে? এনিয়ে এর আগে ফেডারেশনের প্রথম সারির কর্তারা নানাভাবে কেন্দ্রীয় সরকারকে বুঝিয়ে দল পাঠাতে সক্ষম হলেও, এবার ফেডারেশন সভাপতি পদে প্রাক্তন ফুটবলার কল্যান চৌবে থাকা সত্ত্বেও ও কেন্দ্রে তাঁর নিজের সরকার থাকতেও, ভারতীয় ফুটবল দলকে এশিয়াডে পাঠাতে পারছেন না। কেন্দ্রীয় সরকার গোঁ ধরে আছে, যেহেতু ভারতের পুরুষ ও মহিলা দল এশিয়ার মধ্যে প্রথম ৮ দলের মধ্যে নেই, তাই তাদের এশিয়াডে পাঠানো হবে না। এমনিতেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতীয় ফুটবল অনেক পিছনে, তারওপর এই ধরনের সিদ্ধান্তে তারা আরও পেছাবে। ভারতীয় ফুটবলারদের মনোবল ক্ষুন্ন হবে। ভাল কিছু করার মোটিভেশন নষ্ট হবে এখন থেকে আরও বেশি করে।
এই ধরনের শর্তের কারণে, অর্থাৎ এশিয়ার প্রথম ৮ দলের মধ্যে না থাকায় ২০১৮ জাকার্তা এশিয়ান গেমসে ফুটবল দল পাঠায়নি ভারত সরকার। একই কারণে ২০২৩ হ্যাংঝৌ এশিয়াডেও প্রথমে ফুটবল দল পাঠাবে না বলে জেদ ধরে থাকলেও, শেষপর্যন্ত একবারে শেষমুহূর্তে দল পাঠাতে রাজি হয় তারা। এতে ভারতীয় ফুটবল দলের পারফরমেন্সে বিরাট প্রভাব পড়ে। ভারত সরকার ও ফুটবল ফেডারেশনের এই টানাপোড়েনের কারণে দলগঠন করতে হিমসিম খেয়েছিলেন তৎকালীন জাতীয় কোচ ইগর স্টিমাচ। অসহযোগিতা করছিল বিভিন্ন ক্লাব ফুটবলার ছাড়তে। শেষপর্যন্ত জোড়াতালি একটা দল নিয়ে এশিয়াডে খেলতে যান স্টিমাচ। আশা করি, সকলের মনে আছে, এশিয়াডে চীনের বিরুদ্ধে ম্যাচের দিন সকালে দীর্ঘ বিমানযাত্রার পর হ্যাংঝৌ খেলতে নেমেছিল ভারতীয় দল।
এখানেই দুর্দশার শেষ নয়। এবার এএফসি এশিয়ান কাপের মূল পর্বে নিজেদের যোগ্যতার জোরে মূল পর্বে ওঠার পর ফেডারেশনের নানা ভুল কাজকর্মে ভুগতে হয় ভারতীয় মহিলা ফুটবল দলকে। যিনি ভারতীয় মহিলা ফুটবল দলকে এশিয়ান কাপের মূল পর্বে তুলেছিলেন, সেই ক্রিসপিন ছেত্রীকে সরিয়ে দিয়ে টুর্নামেন্টের এক মাস আগে বিদেশি কোচকে দায়িত্ব দিয়ে দলের ভরাডুবি করেন ফেডারেশন কর্তা। তারওপর, ভাবা যায়, এশিয়ান কাপের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামার আগে সঙ্গীতা বাসফোরদের সঠিক ম্যাচ কিটসই পৌঁছয়নি। এনিয়ে মহিলা ফুটবলাররা সমালোচনায় সরব হয়েছিলেন। সেটা ধামাচাপা দিতে তড়িঘড়ি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্থানীয় এক ক্রীড়াসরঞ্জাম প্রস্তুতকারী সংস্থাকে ধরে সাদামাটা কিটস দিয়ে ম্যানেজ করেন ফেডারেশনের কর্তারা। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। ফুটবলারদের মন ভেঙে গিয়েছিল ফেডারেশনের এই উদাসীনতায়। একে বিদেশি কোচের ভুল কৌশল, তারওপর ফুটবলারদের ফোকাস নড়ে যাওয়াতে মহিলা ফুটবল দল শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়।
আইচি নাগোয়া এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণের শর্ত অনুযাযী চলতি বছরে এএফসি অনূর্ধ্ব ২৩ এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলা ১৬ দলের মধ্যে ১৫ দলের সামনে খেলার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, এএফসি মহিলা এশিয়ান কাপে অংশ নেওয়া ১২ দলের মধ্যে ১১ দলের সেই সুযোগ আছে। ভারতের পুরুষ ও মহিলা দল সেই শর্তপূরণ করেছিল। কিন্তু ভারত সরকার অনঢ়, ভারতীয় পুরুষ ও মহিলা ফুটবল দল এশিয়ার মধ্যে প্রথম ৮য়ে না থাকায়, তাদের পাঠিয়ে অর্থব্যয় করা হবে না। হায় রে দুর্ভাগা দেশ, আর এদেশের ফুটবল ও ফেডারেশন কর্তারা।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
