অলস্পোর্ট ডেস্ক: ঘরের মাঠে টানা সাফল্যের পর এ বার বিদেশের মাটিতে ভারতীয় ফুটবল দলের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার থেকে। কিন্তু এই পরীক্ষার প্রথম প্রশ্নপত্রই তাদের পক্ষে বেশ কঠিন হতে চলেছে। অবশ্য আগামী কয়েক মাসে এমন একাধিক কঠিন প্রশ্নপত্রের সমাধান করে ভাল ফল করার চ্যালেঞ্জ ভারতের সিনিয়র ফুটবল দলকে। সেই অভিযান শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের চিয়াং মাইয়ে, কিংস কাপ ২০২৩-এর সেমিফাইনালে।
চলতি বছরে ভারত এ পর্যন্ত ১১টি ম্যাচ খেলেছে। তার মধ্যে ন’টিতে জিতেছে এবং দু’টিতে ড্র করেছে। অর্থাৎ এই বছরে এখন পর্যন্ত হারের মুখে দেখেনি ক্রোয়েশিয়ান কোচ ইগর স্টিমাচের প্রশিক্ষণাধীন ভারত। টানা আটটি ম্যাচে গোল না খাওয়ার পর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গ্রুপ পর্বে কুয়েতের বিরুদ্ধে গোল খায় তারা, তাও আত্মঘাতী গোল। এমন ধারাবাহিকতা অনেকদিন দেখাতে পারেনি ভারতীয় ফুটবল দল। এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের ফলে ফিফার বিশ্ব ক্রমতালিকায় ৯৯ নম্বরে উঠে এসেছে ভারত। কিন্তু এই সাফল্য ধরে রাখার জন্য প্রস্তুত কি না ভারতীয়রা, তা বোঝা যাবে আগামী কয়েক দিনে, যখন তারা পরপর বিদেশের মাটিতে খেলবে কিংস কাপ, এশিয়ান গেমস এবং মারডেকা কাপ।
বৃহস্পতিবার তারই প্রথম ধাপ নিতে চলেছে ক্রোয়েশিয়ান কোচ ইগর স্টিমাচের ভারত। প্রথমেই তারা ইরাকের মুখোমুখি। যারা ফিফা ক্রমতালিকায় তাদের চেয়ে ২৯ ধাপ এগিয়ে এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে যথেষ্ট শক্তিশালীএবং এই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে।
দেশের মাঠে ধারাবাহিক সাফল্যের মধ্যে
আগামী জানুয়ারিতে কাতারে এএফসি এশিয়ান কাপের মূলপর্বে ভারতকে লড়তে হবে এশিয়ার তাবড় ফুটবল শক্তির বিরুদ্ধে। সেখানে ভারত কতটা এগোতে পারবে, তা নিয়ে অনেকেরই মনে সন্দেহ ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাসে যে দাপট নিয়ে ফুটবল খেলেছে ভারতীয় দল, তার পরে অনেকেই এশিয়ান কাপে ভাল ফল করার ব্যাপারে ক্রমশ আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।
চলতি বছরে ফিফা ক্রমতালিকায় একেবারে কাছাকাছি থাকা দল লেবাননকে ভারত তিনবারের মুখোমুখিতে যে ভাবে দু’দু-বার হারিয়েছে ও একবার ড্র করেছে, তার কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। এরপরে কুয়েত। যাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে এক ম্যাচে ড্র করে (শেষ মুহূর্তে নিজেদের অসাবধানতায় হওয়া নিজ গোলে) এবং সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে এক গোলে পিছিয়ে থেকেও অবশেষে টাই ব্রেকারে জেতে।
এই ধারাবাহিক সাফল্যের পর এ বার তাদের বড় পরীক্ষা বিদেশে। গতবারের কিংস কাপ (২০১৯) ছিল ভারতীয় কোচ হিসেবে স্টিমাচের প্রথম টুর্নামেন্ট, যেখানে ভারত আয়োজক থাইল্যান্ডকে হারিয়ে ব্রোঞ্জ জেতে। তবে গত চার বছরে ভারতীয় দল অনেক পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বুধবার তিনি সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, “চার বছর আগে আমরা এই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিলাম। এই চার বছরে আমরা বুঝে নিয়েছি, আমাদের ক্ষমতা ও সম্ভাবনা কতটা এবং ভারতীয় দল কতদূর পৌঁছতে পারে। ইরাকের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ভাল কিছু করার জন্য মাঠে আমরা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দেব। ওমান, কাতার, সৌদি আরবকে হারিয়ে ওরাআরবিয়ান গালফ্ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আগামী এশিয়ান কাপেও ওরা অন্যতম ফেভারিট। তাই আমাদের পক্ষে ম্যাচটা বেশ কঠিন হতে চলেছে। তবে আমার আশা, ছেলেরা ম্যাচটা উপভোগ করবে”।
সুনীলের অভাবই সবচেয়ে বড় সমস্যা?
ভারতীয় দলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে সেরা তারকা সুনীল ছেত্রীর অনুপস্থিতি। পারিবারিক কারণে (সদ্য বাবা হয়েছেন) তিনি এই টুর্নামেন্টে খেলছেন না। সুনীলের উপস্থিতিই যেখানে ভারতীয় দলকে দারুণ ভাবে উজ্জীবিত করে, সেখানে তিনি না থাকার ফলে দলের বাকি ফুটবলাররা কতটা উজ্জীবিত ও ভাল ফুটবল খেলতে পারবেন, সেটাই দেখার।
যদিও দলের অন্যতম সেরা তারকা লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে বলছেন, “দলের পরিবেশ খুবই ভাল। গত কয়েক মাসে আমরা টানা সাফল্যের মধ্যে ছিলাম। আশা করি সেই ছন্দ ধরে রাখতে পারব। তবে এটাই আমাদের আসল পরীক্ষা। কারণ, দেশের বাইরে এসে খেলছি আমরা এবং এশিয়ার অন্যতম সেরা দলের বিরুদ্ধে খেলছি। আমাদের কোচ দলের মধ্যে দারুন একটা পরিবেশ তৈরি করে রেখেছেন। সে মাঠে হোক বা মাঠের বাইরে”।
২০১৯-এর কিংস কাপ দলেও ছিলেন ছাঙতে। চার বছরে অনেক পরিণত ২০২২-২৩ মরশুমের বর্ষসেরা ভারতীয় ফুটবলারটি বলেন, “অনুশীলনে আমরা যা শিখেছি, তা মাঠে কতটা প্রয়োগ করতে পারব আমরা, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আমরা শুধু অংশগ্রহণ করতে আসিনি, জিততে এসেছি। এই টুর্নামেন্টকে আমরা খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। ইরাকের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচটা খুবই কঠিন হতে চলেছে। আশা করি, এই ম্যাচে একটা ইতিবাচক ফল হবে। চ্যালেঞ্জটা নিতে আমরা তৈরি”।
শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ইরাক
ইরাক গত এক বছরে বিভিন্ন মহাদেশের সেরা দলগুলির বিরুদ্ধে খেলেছে। ২০২৩-এ তারা সাতটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে। তার মধ্যে পাঁচটিই ছিল আরবিয়ান গালফ্ কাপে। সেই টুর্নামেন্টে পাঁচটির মধ্যে চারটি ম্যাচেই জেতে তারা। কাতার, সৌদি আরব ও ইয়েমেনকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে এবং ওমানের বিরুদ্ধে রোমাঞ্চকর ম্যাচে ৩-২-এ জিতে খেতাব জয় করে। এর পরে তারা মার্চ ও জুনে যথাক্রমে রাশিয়া ও কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলে এবং দুই ম্যাচেই হেরে যায়। রাশিয়ার কাছে ০-২ ও কলম্বিয়ার কাছে ০-১-এ হারে তারা। কিন্তু এই ম্যাচগুলি থেকে যে অভিজ্ঞতা হয় তাদের, তা যথেষ্ট মূল্যবান।
শুনে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি যে, এ রকম এক শক্তিশালী দলের কোচ ইয়েসুস কাসাস ভারতীয় দলকে যথেষ্ট সমীহ করছেন। গত বছরই ইরাকের জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়া স্প্যানিশ কোচ বলেন, “ভারত মোটেই সহজ প্রতিপক্ষ নয়। আমরা ওদের ম্যাচ দেখেছি। খুব ভাল ও গোছানো দল। ওরা আক্রমণের অনেক উপায় জানে। শর্ট বল ও লং বল, দু’রকমই খেলতে পারে ওরা। আমাদের লক্ষ্য এই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ও বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের প্রস্তুতি নেওয়া”। খেলোয়াড়জীবনে ইয়েসুসের সঙ্গে একই ক্লাবে তিনি খেলেছেন বলে জানান স্টিমাচ। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত স্টিমাচ যখন স্পেনের কাদিজ সিএফ-এ খেলতেন, তখন ইয়েসুস ছিলেন সেই ক্লাবের যুব দলের সদস্য।
বুধবার সাংবাদিক বৈঠকে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ছবি দেখা গেলেও বৃহস্পতিবার যে মাঠে দুই দলের মধ্যে মোটেই সে রকম সম্পর্ক থাকবে না, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। সুনীলের অনুপস্থিতিতে দলের আক্রমণের হাল ধরতে হবে মনবীর সিং, রহিম আলি, রাহুল কেপি, সহাল আব্দুল সামাদ, আশিক কুরুনিয়ান, নাওরেম মহেশ সিং ও ছাঙতে-দের।
রক্ষণ মজবুত রাখাও খুবই জরুরি। টানা দেশের মাঠে আট ম্যাচে গোল না খাওয়া ভারতীয় দলের রক্ষণ সন্দেশ ঝিঙ্গনের নেতৃত্বে ও আশিস রাই, নিখিল পূজারি, আনোয়ার আলি, মেহতাব সিং, লালচুঙনুঙ্গা, আকাশ মিশ্র ও শুভাশিস বোসদের তৎপরতায় কতটা দুর্ভেদ্য হয়ে উঠতে পারে, সেটাই দেখার। মাঝমাঠে বড় পরীক্ষা দিতে হবে জিকসন সিং, সুরেশ ওয়াংজাম, ব্র্যান্ডন ফার্নান্ডেজ, অনিরুদ্ধ থাপাদের। মরশুমের শুরুতেই ডুরান্ড কাপ ও এএফসি কাপের প্রাথমিক পর্বে টানা ম্যাচ খেলে এঁরা কতটা তরতাজা রয়েছেন, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।
ইরাকের আক্রমণে সবচেয়ে বিপজ্জনক ২৭ বছর বয়সী স্ট্রাইকার আইমেন হুসেন, যিনি ইরাকের হয়ে ৬২ ম্যাচে ১৪ গোল করেছেন। নিজের শারীরিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে ডিফেন্ডারদের কাছে রীতিমতো ত্রাস হয়ে ওঠাই তাঁর কৌশল। বাকিটা করেন দক্ষতা দিয়ে। দুই উইং দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে ঝড় তোলা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ইব্রাহিম বায়েশকেও কড়া নজরে রাখা ভারতীয়দের একটা বড় কাজ হবে। ২৩ বছর বয়সী এই ফুটবলারও ভারতীয় রক্ষণে ত্রাস হয়ে উঠতে পারেন। ইরাককে ৪০ ম্যাচে হাফ ডজন গোল দিয়েছেন তিনি।
ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের সমর্থকেরা জিদান ইকবালকে চিনতে পারেন। ম্যান ইউয়ের অ্যাকাডেমি থেকে উঠে আসা এই মিডফিল্ডার তাদের সিনিয়র দলের হয়েও খেলেছেন। এখন খেলেন এফসি ইউট্রেখটে। কঠিন পরিস্থিতি থেকেও গোল তৈরিতে তিনি বিশেষজ্ঞ। সেন্টার লাইন ও বিপক্ষের বক্সের মাঝখানে তিনি যে কখন কী করবেন, এক সেকেন্ড আগেও তা বুঝতে পারেন না অনেকে। ভারতীয় ফুটবলারদের তাঁকেও বুঝতে হবে এবং আটকাতেও হবে। গোলকিপার গুরপ্রীত সিং সান্ধুর মতো অভিজ্ঞ গোলকিপার যেখানে রয়েছেন, সেখানে ভারতের রক্ষণ অনেক নিশ্চিন্ত মনে নিজেদের কাজ করে জেতে পারে ঠিকই। কিন্তু ইরাক আক্রমণের তুফান তুললে তা কী ভাবে সামলায় ভারত, সেটাই হবে এই ম্যাচের প্রধান আকর্ষণ।
ভারতীয় দল:
গোলকিপার:গুরপ্রীত সিং সান্ধু, অমরিন্দর সিং ও গুরমীত সিং; ডিফেন্ডার:আশিস রাই, নিখিল পূজারি, সন্দেশ ঝিঙ্গন, আনোয়ার আলি, মেহতাব সিং, লালচুঙনুঙ্গা, আকাশ মিশ্র ও শুভাশিস বোস; মিডফিল্ডার: জিকসন সিং, সুরেশ ওয়াংজাম, ব্র্যান্ডন ফার্নান্ডেজ, সহাল আব্দুল সামাদ, অনিরুদ্ধ থাপা, রোহিত কুমার, আশিক কুরুনিয়ান, নাওরেম মহেশ সিং, লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে;ফরোয়ার্ড: মনবীর সিং, রহিম আলি, রাহুল কেপি; কোচ- ইগর স্টিমাচ।
কিংস কাপ, ২০২৩, সেমিফাইনাল
ম্যাচ- ভারত বনাম ইরাক
ভেনু- 700th অ্যানিভার্সারি স্টেডিয়াম, চিয়াং মাই, থাইল্যাান্ড
কিক অফ- ৭ সেপ্টেম্বর, বিকেল ৪.০০
সম্প্রচার- ইউরোস্পোর্ট, ফিফা প্লাস
(লেখা আইএসএল ওয়েবসাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
