—নিজস্ব চিত্র
সুচরিতা সেন চৌধুরী: প্রিয় দাদুর মৃত্যুর খবরটা বৃহস্পতিবার রাতেই এসেছিল। কিন্তু খেলা ছেড়ে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা একবারও ভাবেননি। আর শুক্রবার টাটা স্টিল কলকাতা দাবা ২০২৬-এর র্যাপিড রাউন্ড জিতে সেই দাদুকেই শ্রদ্ধাঞ্জলী দিলেন নিহাল সারিন। ভারতের এই তারকা গ্র্যান্ডমাস্টার কিন্তু প্রথমে এই টুর্নামেন্টে খেলার আমন্ত্রণ পাননি। শেষ বেলায় ডাক আসে, যখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ডি গুকেশ নাম তুলে নেন এই টুর্নামেন্ট থেকে। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি এখানে না খেলার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানা গিয়েছে। তার পরই ডাক আসে নিহালের কাছে। কথায় আছে, ‘এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন’। নিহালের ক্ষেত্রেও কথাটা একটুও ভুল নয়।
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রথমেই তাঁর জীবনের বড় আবেগের কথাটাই শেয়ার করে নিলেন নিহাল। ম্যাচ চলাকালীন সব থেকে বেশি ছটফটে যাঁকে লাগছিল, তিনি বলেন নিহাল সারিন। খেলতে খেলতে এদিক, ওদিক তাকাচ্ছেন, ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন, আবার সাংবাদিক সম্মেলনে এসে সব প্রশ্নের উত্তরই দিচ্ছিলেন মজা করে। তবে শুরুতেই জয়ের শুভেচ্ছা নেওয়ার পরই জানিয়ে দিলেন, এই জয় তাঁর দাদুর জন্য, যাঁকে তিনি গত রাতেই হারিয়েছেন।
বলছিলেন, ‘‘গতকাল রাতেই জানতে পারি দাদু আর নেই। এই দাদুর কাছেই আমার দাবার হাতেক্ষরী। তবুও আমি বাড়ি ফিরে না গিয়ে শেষ তিনটি রাউন্ড খেলার জন্য থেকে গিয়েছি। কারণ আমি জানি দাদু থাকলে এটাই চাইতেন।’’ এর সঙ্গে তিনি আরও জুড়ে দেন, ‘‘এই অবস্থায় শেষ তিনটি রাউন্ড খেলা সহজ ছিল না। আমি জয়ের কথা ভেবে খেলিনি। যে ভাবে খেলা এগিয়েছে আমি খেলে গিয়েছি।’’ আর তার ফল, বিশ্বনাথন আনন্দকে পিছনে ফেলে টাটা স্টিল দাবা ২০২৬-এর পুরুষদের ওপেন বিভাগে র্যাপিড চ্যাম্পিয়ন নিহাল সারিন।
২০২২-এর এই টুর্নামেন্টে ব্লিৎজ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন নিহাল। সেই সময়কে মনে করে নিহাল বলছিলেন, ‘‘এখানে আমার খেলতে ভালো লাগে। অসাধারণ পরিবেশ। ফ্যানদের সমর্থন দারুণ লাগে।’’ শেষ রাউন্ডে বিশ্বনাথন আনন্দের মুখোমুখি হয়েছিলেন নিহাল সারিন। সেটিই ছিল ফাইনাল রাউন্ড, তখন ৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে নিহাল ও ৫.৫ পয়েন্টে আনন্দ। ম্যাচ ড্র করে র্যাপিড জিতে নেয় নিহাল সারিন। ম্যাচ শেষে সবার মতোই আনন্দের সঙ্গে গল্পে মেতে ওঠেন নিহাল।
এক নম্বর বোর্ডে বসে ঠিক কী কথা হচ্ছিল আনন্দের সঙ্গে প্রশ্ন করায় নিহাল বলেন, ‘‘তেমন কিছু বিশেষ বিষয় নয়। আমাকে শুভেচ্ছা জানালেন। তার বিরুদ্ধে খেলাটা সব সময়ই বাড়তি পাওনা। তবে আমি শেষ ম্যাচে জেতার কথা ভেবে খেলতে বসিনি। খেলতে খেলতে এগিয়ে গিয়েছি। এবার কাল থেকে আমার লক্ষ্য ব্লিৎজ।’’ নিহালের সাংবাদিক সম্মেলনের মধ্যেই ঢুকে পড়লেন বিশ্বনাথন আনন্দ। দু’জনের মধ্যে আরও একবার শুভেচ্ছা বিনিময় হল। আনন্দকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে বিদায় নিলেন নিহাল সারিন।
তবে আনন্দ শুরু করার আগে, তাঁর সম্পর্কে সব থেকে সত্যি কথাটা বলে দিলেন ভারতের দ্বিতীয় তথা বাংলার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার দিব্যেন্দু বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘‘আনন্দ বার বার প্রমান করেন, বয়স শুধু একটা নম্বর মাত্র।’’ আর এটা কীভাবে ধরে রাখেন তিনি সেটাও জানিয়ে দিলেন আনন্দ। আর তার মধ্যে পরিষ্কার করে দিলেন, ‘‘সময় বদলেছে। মর্ডান দাবা আগের থেকে অনেক আলাদা। টিকে থাকতে হলে তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। ৪০ বছর আগে আমরা যেভাবে খেলতাম, এখন সেটা একদম বদলে গিয়েছে।’’
তিনি যে মানিয়ে নিয়েছেন তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বরং তার পাশাপাশি দেশের বর্তমান প্রতিভাদের প্রশংসায় ভরাতে কখনওই ভোলেন না তিনি। তবে এতদিন পর এই টুর্নামেন্টে খেলতে আসার কারণও জানালেন তিনি। বলছিলেন, ‘‘এই টুর্নামেন্টে খেলার জন্য আমরা দরজা সব সময়ই খোলা থাকে কিন্তু গত কয়েক বছর বিভিন্ন কারণে আসা হয়নি। এবার নিশ্চিত ছিলাম আসব। একটা ভালো অনুশীলনও হয়ে যাবে।’’ এর সঙ্গেই মেনে নিলেন, এদিন তাঁর খেলায় বেশ কিছু খামতি ছিল। সেই সব শুধরে নিয়েই পরবর্তী টুর্নামেন্টে খেলতে নামাটাই লক্ষ্যই দেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টারের।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
