ছবি— ইস্টবেঙ্গল এক্স থেকে
ইস্টবেঙ্গল ৩ (আনোয়ার, ক্রেসপো, সোজবার্গ)
বেঙ্গালুরু ৩ (আশিক, সুরেশ, রায়ান)
সুচরিতা সেন চৌধুরী: এক কথায় নৈতিক জয়। ৩-৩ গোলে ম্যাচ ড্র হলেও ১০ জনের ইস্টবেঙ্গলের দুরন্ত লড়াই লেখা থাকবে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে। চেন্নাইয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচ জিতে ঘরের মাঠে একরাশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলতে নেমেছিল ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসে প্রায় জল ঢেলে দিয়েছিলেন স্বয়ং রেফারি। শুরু থেকেই কার্ড, তার থেকেও বেশি অন্যায়ভাবে কার্ড দেখিয়ে খেলাটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে পাঠিয়ে দেন তিনি। এদিন ছয় গোলের ম্যাচে মোট ১০টি কার্ড হল। যার জেরে দুই পক্ষের ঝামেলা, লাল কার্ড, ইস্টবেঙ্গলের ১০ জনে হয়ে যাওয়া ২৪ মিনিটেই। প্রথমে গোল হজম করে, সমতায় ফেরা ইস্টবেঙ্গলের জয়ের দৌঁড় ধরে রাখা রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছিল। বৃহস্পতিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে খেলতে নেমেছিল ইস্টবেঙ্গল। জিতলে লিগ টেবলে দু’য়ে চলে যেত দল। সেই লক্ষ্যেই ১০ জনে প্রায় ৭৫ মিনিটের লড়াই মন জিতে নিল ইস্টবেঙ্গল জনতার। ৯০+৬ মিনিটে বিপিনের থেকে পাওয়া পাস ধরে সোজবার্গের শট গোলে জেতেই সব যন্ত্রণা, আবেগ, উচ্ছ্বাসের বাধ ভেঙে গেল প্রায় ১৫ হাজারের গ্যালারির। ইস্টবেঙ্গলকে হারানোর সব রসদ মজুত ছিল এদিনের যুবভারতীতে। কিন্তু অদম্য জেদ, লড়াই দেখিয়ে দিল এভাবেও ফিরে আসা যায়।
একদিন আগে থেকেই অবশ্য বিতর্কে জরিয়েছিল এই ম্যাচ। একদিন আগেই নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বেঙ্গালুরুর স্যাঞ্চেজকে। যা নিয়ে প্রতিক্রিয়াও দিয়েছিলেন ইস্টবেঙ্গল কোচ। এদিন সেই স্যাঞ্চেজকে প্রথম দলে রেখেই দল সাজিয়েছিল বেঙ্গালুরু। যদিও তাঁকে খুব বেশি দেখা গেল না। প্রায় ৬০ মিনিট মাঠে থেকেও অদৃশ্য থাকলেন সুনীল ছেত্রী। শুরুতেই ইস্টবেঙ্গল রক্ষণের উপর চাপ তৈরি করতে শুরু করে বেঙ্গালুরু। যার ফল ১২ মিনিটে প্রায় প্রতিপক্ষের অর্ধ থেকে সিরোজিদ্দিনের লম্বা ক্রস বক্সের কোনা থেকে দুরন্ত শটে গোলে পাঠান আশিক কুরুনিয়ান। কিছু করার সুযোগ পায়নি ইস্টবেঙ্গল রক্ষণ। ১-০ গোলে এগিয়ে যায় বেঙ্গালুরু এফসি।
ঠিক যতটা দৃষ্টি নন্দন গোল করে বেঙ্গালুরুকে এগিয়ে দিয়েছিলেন আশিক ততটাই অনবদ্য ব্যাকভলিতে ইস্টবেঙ্গলকে সমতায় ফেরান আনোয়ার আলি। ২১ মিনিটে মিগুয়েলের কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে আনোয়ার আলির অনবদ্য ফিনিশিং। ১-১ করে খেলায় ফেরে ইস্টবেঙ্গল। তার পরই ছন্দ পতন। তার আগেই অন্যায়ভাবে হলুদ কার্ড দেখেছেন সৌভিক চক্রবর্তী। আগেই একটা হলুদ কার্ড দেখেছিলেন মিগুয়েলও। ম্যাচের বয়স তখন ২৪ মিনিট। এডমুন্ডকে ফাউল করার পরও প্রতিপক্ষ প্লেয়ারকে কার্ড না দেখানোয় রেফারির কাছে আবেদন জানাতে পৌঁছন এডমুন্ড। কিন্তু রেফারি উল্টে এডমুন্ডকেই কার্ড দেখিয়ে দেন। তাতেই ক্ষেপে ওঠে ইস্টবেঙ্গল দল। শুরু হয়ে যায় ঝামেলা। প্রতিপক্ষ বেঞ্চে গিয়ে ঝামেলায় জরিয়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন মিগুয়েল। মাঠ থেকে বেরনোর সময় সপাটে বেঙ্গালুরু বেঞ্চে বল মেরে বেরিয়ে যান তিনি। এর সঙ্গেই ঝামেলায় জরিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন ইস্টবেঙ্গল কোচ, সহকারি কোচ।
১০ জনে হয়ে গিয়ে কিছুটা হতদ্যম হয়ে পড়ে ইস্টবেঙ্গল। সেই সুযোগে ৩৮ মিনিট সুরেশ সিংয়ের গোলে আবার এগিয়ে যায় বেঙ্গালুরু। রায়ানের বল প্রভসুখন প্রাথমিকভাবে বাঁচিয়ে দিলেও দখলে রাখতে পারেননি। ফিরতি বলে সুরেশ গোল করে বেঙ্গালুরুকে ২-১ গোলে এগিয়ে দেন। তবে এবার গোল হজম করে তেড়েফুড়ে ওঠে ইস্টবেঙ্গল। যার ফল ৫৫ মিনিটে সল ক্রেসপোর দুরন্ত গোলে সমতায় ফেরে ইস্টবেঙ্গল। ডানদিক থেকে বিপিন সিংয়ের ক্রস হেড করে আধা ক্লিয়ার করেছিলেন রাহুল ভেকে। সেই বল বক্সের বাইরে থেকে গোল লক্ষ্য করে শট নেন ক্রেসপো, প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার সেটা ক্লিয়ার করার চেষ্টা করলেও তা আবার পেয়ে যান ক্রেসপো। এবার আর ভুল করেননি। তাঁর মাপা শট সোজা চলে যায় বেঙ্গালুরু গোলে। ১০ জনের ইস্টবেঙ্গল ২-২ গোলে সমতায় ফেরে।
৭১ মিনিটে নিজেদের ভুলেই তৃতীয় গোল হজম করতে হয় ইস্টবেঙ্গলকে। রায়ান উইলিয়ামসকে আটকাতে জায়গা ছেড়ে এতটাই বেরিয়ে এসেছিলেন ইস্টবেঙ্গল গোলকিপার প্রভসুখন সিং যে তাঁকে কাটিয়ে যখন গোলে শট নেন রায়ান তখন তাঁর ফেরার আর উপায় ছিল না। সেই বল নিজেই গড়িয়ে চলে যায় গোলে। ৩-২ গোলে এগিয়ে যায় বেঙ্গালুরু এফসি। এর পর গোলের সুযোগ এসেছিল ইস্টবেঙ্গলের সামনেও। সেই ক্রেসপো কিন্তু বাঁচিয়ে দেন গুরপ্রীত। এখানেই শেষ হয়ে যাবে মনে হয়েছিল এই ম্যাচ। কিন্তু কথায় আছে ফুটবল শেষ বাঁশি পর্যন্ত বেঁচে থাকে। আর এটাই ফুটবলের সৌন্দর্য্য। যা আরও একবার প্রমান করে দিল ইস্টবেঙ্গল। যখন সাত মিনিটের অতিরিক্ত সময়ের শেষ মিনিটে বিপিনের ক্রস থেকে বল জালে জরিয়ে ইস্টবেঙ্গলকে এক পয়েন্ট এনে দিলেন পরিবর্ত হিসেবে নামা সোজবার্গ। তিনবার পিছিয়ে পড়ে ম্যাচে ফিরল ইস্টবেঙ্গল, তার মধ্যে দু’বার ১০ জনে। এই লড়াকু ইস্টবেঙ্গলকে অনেকদিন পরে দেখল সমর্থকরা। অস্কারকে এর জন্য অনেকটা কৃতিত্ব দিতে হবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এর সঙ্গেই আট ম্যাচে ১৫ পয়েন্ট নিয়ে গোল পার্থক্যে তিন নম্বরে উঠে এল ইস্টবেঙ্গল।
ইস্টবেঙ্গল: বিশাল কাইথ, কেভিন সিবলে, আনোয়ার আলি (মহম্মদ রাকিপ), জিকসন সিং (জয় গুপ্তা), বিপিন সিং, সল ক্রেসপো, সৌভিক চক্রবর্তী (ডেভিড), পিভি বিষ্ণু, মিগুয়েল ফেরেরা, এডমুন্ড লালরিনডিকা (নন্ধা কুমার), ইউসুফ এজেজ্জারি (অ্যান্টন সোজবার্গ)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
