ছবি: ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬
অলস্পোর্ট ডেস্ক: ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। ফুটবল কখনও কখনও এমন নিষ্ঠুর হয়, যা একটা গোটা দেশের মানুষের যাবতীয় স্বপ্ন নিমেষে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। এমনটাই ঘটল ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপে সেনেগালের সঙ্গে। রাউন্ড অফ ৩২য়ের ম্যাচে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২ গোলে এগিয়ে ছিল সেনেগাল। যখন সকলে ধরে নিয়েছেন বেলজিয়ামের হার নিশ্চিত, ঠিক তখনই নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে ২ গোল হজম করে সেনেগাল। আর ১২৫ মিনিটে ইউরি টেলেম্যানসের দেওয়া বিতর্কিত পেনাল্টি গোলের সুবাদে শেষপর্যন্ত ২-৩ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল তারা। ভার প্রয়োগ করে রেফারি সৈয়দ মার্টিনেজের পেনাল্টি দেওয়া নিয়ে বিতর্ক চলবে, কিন্তু তাতে সেনেগালের কোনও লাভ নেই, তাতে ফল বদলাবে না, আর সেলেগালের ক্ষতিপূরণ হবে না।
বিশ্বকাপের আসরে চোকার্স নামে পরিচিত বেলজিয়াম এই প্রথমবার ২ গোলে পিছিয়ে পড়েও নিজেদের চোকার্স বদনাম ঘুচিয়ে ২ গোল করে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় ছিনিয়ে নিতে পেরেছে। যদিও রেফারির দাক্ষিণ্য তারা পেয়েছে ম্যাচের অন্তিম লগ্নে। প্রিকোয়ার্টারফাইনালে ৬ জুলাই তাদের প্রতিপক্ষ আমেরিকা। তারা বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনাকে ১০ জনে খেলেও ২-০ গোলে হারিয়েছে। এখন দেখার ওই পর্বে বেলজিয়াম নিজের জাত চিনিয়ে জয়ের ধারা অক্ষুন্ন রাখতে পারে, নাকি চোকার্স তকমা নিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়? বারবার যে রেফারির দাক্ষিণ্য মিলবে এমন তো নয়।
সিয়াটেলের মাঠে পাপে থিওয়াওর সেনেগাল আক্রমণের ঝড় তুলে শুরু করেছিল বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে। ২৪ মিনিটে হাবিব ডিয়ারা ও ৫১ মিনিটে ইসমাইলা সারের গোলে সেনেগাল ২-০ এগিয়ে যাওয়ার পর অতিবড় বেলজিয়াম সমর্থক-ভক্তের দল ভাবেননি, ওই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো বা বিশ্বকাপে টিঁকে থাকা সম্ভব। কিন্তু ফুটবল দেবতার অন্যরকম ভাবনা ছিল। বিশ্বকাপে সাদিও মানের সেনেগালের বদলে বেলজিয়ামকে টিঁকিয়ে রাখার।
বেলজিয়ামের পক্ষে ম্যাচটা ঘুরে যায় ৮৬ মিনিটে করা রোমেলু লুকাকুর গোলে। পুরোন চাল যে ভাতে বাড়ে, সেটা আবার প্রমাণ করে দিলেন অভিজ্ঞ এই স্ট্রাইকার। এর আগেও অনেক ম্যাচে পরিত্রাতার ভূমিকা নেওয়া লুকাকুকে বিরতিতে চার্লস ডি কেটালারের জায়গায় নামিয়েছিলেন বেলজিয়াম কোচ রুডি গার্সিয়া। এই বিশ্বাসে লুকাকু কিছু একটা করবেন। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত তেমন কিছু নজরে আসেনি লুকাকুর খেলায়। এল ৮৬ মিনিটে। টমাস মুনিয়ের ডানপ্রান্ত দিয়ে বল নিয়ে দৌড়ে একটা নীচু ক্রশ বাড়ান সেনেগাল বক্সে, লুকাকু সেই বল জালের ভেতর জড়িয়ে দেন। ওতেই আত্মবিশ্বাস ফিরল বেলজিয়াম শিবিরে, আর সেনেগালের রক্ষণের জমাট ভিতটা হঠাৎই নড়বড়ে হয়ে গেল।
নির্ধারিত সময় শেষ হতে ১ মিনিট বাকি। লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের ভাসানো বলে ইউরি টেলেম্যানস হেডে গোল করে সমতা ফিরিয়ে বেলজিয়ামকে বিশ্বকাপে টিঁকে থাকার অক্সিজেন জোগান। তবে ২-২ হয়ে যাওয়ার পরও লড়াই ছাড়েনি সেনেগাল। সাদিও মানের দল বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময় গোল করে ম্যাচ পকেটে পোরার সুযোগ পেয়েছিল। তা কাজে লাগাতে না পারার খেসারত দিল। গোটা বিশ্ব যখন টাইব্রেকারেই ম্যাচের নিষ্পত্তি হবে, এমনটা ধরে নিয়েছে, ঠিক তখনই বিতর্কিত পেনাল্টির সিদ্ধান্ত সেনেগালের হৃদয় ভেঙে দিল। ১২৫ মিনিট অর্থাৎ অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে সংযুক্তি সময়ের পঞ্চম মিনিটে বক্সে টেলেম্যানসকে ট্যাকল করেন সেনেগালের ল্যামিনে কামারা। আপাতদৃষ্টিতে সেটা পেনাল্টি ছিল বলে মনে হয়নি। এমনকি টিভি ধারাভাষ্যকার থেকে ফুটবল বিশেষজ্ঞরাও একমত ওটা পেনাল্টি দেওয়ার মতো ট্যাকল নয়। কিন্তু রেফারির ঠিক উল্টোটা মনে হয়। তিনি নিশ্চিত হতে ভার-এর সাহায্য নেন। দীর্ঘক্ষণ টিভি রিপ্লে দেখে বেলজিয়ামের পক্ষে পেনাল্টির নির্দেশ দেন।
এটাই হয়ত ভাগ্যের মার। আফ্রিকান নেশনস কাপের ফাইনালে মরক্কোর সঙ্গে ম্যাচে সেনেগালের বিরুদ্ধে ওই ম্যাচের রেফারি পেনাল্টি দিয়েছিলেন। সেটা নামতে না পেরে দল নিয়ে মাঠে ছেড়ে সাজঘরে চলে গিয়েছিলেন সেনেগাল কোচ। একমাত্র মাঠে থেকে গিয়েছিলেন কিংবদন্তী ফুটবলার সাদিও মানে। তিনি পরে সতীর্থদের বুঝিয়ে শুনে মাঠে ফেরত আনেন। অনেকটা সময় নষ্টের পর মরক্কোর হয়ে পেনাল্টিতে গোল করে ম্যাচ জেতানোর সুযোগ হাতছাড়া করেছিলেন মরক্কোর ফুটবলার। পরে সেনেগাল অতিরিক্ত সময় গোল করে ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তবে আফ্রিকান ফুটবল ফেডারেশন পরে সবদিক বিবেচনা করে সেনেগালের খেতাব কেড়ে নিয়ে মরক্কোকেই চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে।
সিয়াটেলে অবশ্য ভাগ্য বেলজিয়ামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। ১২৫ মিনিটে পেনাল্টি স্পটে বল নিয়ে অপেক্ষা করছিলনে লুকাকু শট নেওয়ার জন্য। শেষ মুহূর্তে তিনি সরে যান। টেলেসম্যান পেনাল্টি শট গোলের ভেতর রাখতে কোনও ভুল করেননি। তাঁর গোলে ৩-২ জিতে বেলজিয়াম বিশ্বকাপ জেতার আশা জিইয়ে রাখল।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
