মুনাল চট্টোপাধ্যায়: গত মরশুমের পুনরাবৃত্তি। গতবার যুবভারতীতে সিএফএল ডার্বি জিতেছিল ইস্টবেঙ্গল ২-১ গোলে। এবার শনিবাসরীয় কল্যানী স্টেডিয়ামের মাঠে মর্যাদার সিএফএল ডার্বির জমজমাট লড়াইয়েও মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের বিরুদ্ধে জয় তুলে নিল ৩-২ গোলে।
ইস্টবেঙ্গল কোচ বিনো জর্জ যখন ডার্বি জিততে ৭জন সিনিয়রকে যুব ফুটবলারদের সঙ্গে মাঠে নামিয়ে দেন, তখন মোহনবাগান এসজি কোচ ডেগি কার্ডোজো শুরুতে দলে রাখেন ৩জন সিনিয়র ফুটবলারকে। ইস্টবেঙ্গলের প্রথম একাদশে ছিলেন গোলকিপার দেবজিত, মার্তন্ড, প্রভাত, সায়ন,এডমুন্ড, জেসিন, ডেভিড। সবুজ মেরুন জার্সিতে সিনিয়র বলতে শুধুমাত্র দীপেন্দু, কিয়ান, সুহেল। স্বাভাবিকভাবেই লাল হলুদে বাড়তি সিনিয়র ফুটবলারের উপস্থিতি সবুজ মেরুনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
প্রথম ৪৫ মিনিট বল অধিকাংশ সময় ঘোরাফেরা করেছে বাগানের অর্ধে। সবুজ মেরুন ফুটবলারদের মাঝে বোঝাপড়ার অভাবটাও স্পষ্ট নজরে এসেছে। সেখানে লাল হলুদ ফুটবলারদের মধ্যে আক্রমণের চমৎকার বাঁধুনিটা ধরা পড়েছে খেলায়। ফলে যেটা হওয়ার সেটাই ঘটল। প্রমথার্ধেই ২-০ গোলে এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল প্রতিপক্ষ রক্ষণে বারবার আক্রমণ শানিয়ে।
আইএসএলে নজর কাড়া ফুটবল খেলে মোহনবাগান দিবসে সেরা যুব ফুটবলারের পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত স্টপার দীপেন্দুর একার পক্ষে লাল হলুদের ঝাঁঝালো ঝড় সামলানো সম্ভব হয়নি। তাতেই ৯ মিনিটে প্রথম গোল পেয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। ডেভিডের বাড়ানো থ্রু ধরে সায়নের সঙ্গে ওয়াল খেলে বক্সের মাঝে বল পেয়ে ঠান্ডা মাথায় গোলে ঠেলেন জেসিন টিকে।
২০ মিনিটে গোলদাতা জেসিন চোট পেয়ে বেরিয়ে গেলে, তাঁর জায়গায় মাঠে আসেন মার্ক। তিনিও সমান সাবলীল থাকেন নিজের খেলায়। বাগানের ওপর চাপ থাকে অব্যাহত। তার মাঝেই ৩৬ মিনিটে গোল শোধের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন বাগানের সুহেল বাট। পেছন থেকে বাগানের সন্দীপ মালিকের বাড়ানো বল সুহেল সুবিধাজনক অবস্থায় পেয়েও লম্বা টোকা মারায়, একের সঙ্গে এক পরিস্থিতিতে গোলকিপার দেবজিত এগিয়ে এসে, তা আংশিক প্রতিহত করে দেন। আলগা বলে কিয়ানের শট পোস্টে লাগায় সমতা ফেরেনি।
চোট পেলেন বাগানের সালাউদ্দিন। নামলেন তাঁর পরিবর্তে পাসাং। তাতে সেইমুহূর্তে বিশেষ কোনও উন্নতি দেখা যায়নি বাগানের খেলায়। বরং প্রথমার্ধের সংযুক্তি সময়ের ৬ মিনিটে দ্বিতীয় গোল পায় ইস্টবেঙ্গল। বাগানের মিসক্লিয়ারেন্সের সুযোগে আলগা বল পেয়ে এডমুন্ডের সঙ্গে সায়ন ওয়াল খেলে বক্সে পৌঁছে বিনা বাধায় বাগান গোলকিপার দীপ্রভাতকে কাটিয়ে গোলে ঠেলেন সায়ন। গোল করিয়ে ও করে ম্যাচের সেরা সায়নের এর আগে আরএফডিএল ডার্বিতে গোল থাকলেও, সিএফএল ডার্বিতে তাঁর প্রথম গোল। সেরা হওয়ার সঙ্গে প্রাপ্তি ইলিশ। ম্যাচ শেষে ইলিশ হাতে জয়ের হাসিটা মন ছুঁয়ে যাওয়া। একইসঙ্গে কল্যানীর ছেলে প্রভাত লাকরার লাল হলুদ জার্সি গায়ে দুরন্ত লড়াইয়ের কথা উল্লেখ না করলে অণ্যায় হবে।
মনে হয়েছিল, ম্যাচ বুঝি পকেটে পুরে ফেলেছে ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু পিকচার তখনও বাকি ছিল। ২ গোলে এগিয়ে থাকার আত্মতুষ্টি ভর করে থাকতে পারে লাল হলুদ শিবিরে। সেই সুযোগে ৫৫ মিনিটে কিয়ানের কর্ণারে দীপেন্দু বল হেডে নামিয়ে দিলে লিউয়ান কাস্তানা গড়ানো শটে গোল করে বাগানকে লড়াইয়ে ফেরান। গোল করে উজ্জীবিত বাগান তেড়েফুঁড়ে আক্রমণে উঠতে সমতা ফেরে ৬৭ মিনিটে কিয়ানের গোলে, কাস্তানার সেন্টার থেকে।
২ গোল হজম করে সম্বিত ফেরে লাল হলুদে। প্রতিআক্রমণ হানতেই সবুজ মেরুন শিবিরের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে যায় ৬৯ মিনিটে আমন সিকের সেন্টারে হেডে ডেভিড গোল করতেই। ৮৩ মিনিটে বক্সের মাঝে সামনে শুধুমাত্র অসহায় বাগান গোলকিপার দ্বিপ্রভাতকে সামনে পেয়েও অবিশ্বাস্যভাবে বাইরে না মারলে, তখনই ইস্টবেঙ্গলের অনুকূলে ম্যাচ শেষ হয়ে যেত। বাকি সময় ইস্টবেঙ্গল যখন ব্যবধান বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়, তখন সবুজ মেরুন ব্রিগেডের সমতা ফেরানোর প্রচেষ্টায় ত্রুটি ছিল না। কিন্তু সেটা যথেষ্ট ছিল না। ফলে গত মরশুমের মতো এবারও ডার্বি হেরে মাঠ ছাড়তে হল বাগান বাহিনীকে।
জয়ের মাঝে ৯৭ মিনিটে চোনা একটাই। রেফারি আদিত্য পুরকায়স্থ দ্বিতীয়বার হলুদ ও লাল কার্ড দেখিয়ে ইস্টবেঙ্গলের আমন সিকে মাঠ থেকে বের করায়। দৃষ্টিকটূভাবে মাঠ থেকে বেরুনোর সময় যেভাবে স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষের জলের ড্রামে লাথি মারলেন, তাতে আইএফএর শৃঙ্খলারক্ষাকারী কমিটির উচিত আমনকে বড়রকম শাস্তি দেওয়ার। কারণ তাঁর এই আচরণে ম্যাচের শেষদিকে কল্যানীতে হওয়া শান্তিপূর্ণ ডার্বির সমাপ্তিতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারত গ্যালারিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে। ম্যাচ শেষ হতে ২ মিনিট বাকি থাকতে কল্যানী স্টেডিয়ামের একটি বাতিস্তম্ভের আলো নিভে গেলেও রেফারি খেলা থামাননি, বাকি বাতিস্তম্ভের কারণে মাঠে পর্যাপ্ত আলো থাকায়। তাই বলতে দ্বিধা নেই এটুকু বাদ দিলে, কল্যানীতে সিএফএল ডার্বি নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন সংগঠকরা।
ইস্টবেঙ্গল: দেবজিত, সুমন, মার্তন্ড, প্রভাত, বিক্রম, সায়ন(সঞ্জীব), তন্ময়, নসিব, এডমুন্ড(আমন), ডেভিড, জেসিন(মার্ক)(লালরামসাঙ্গা)।
মোহনবাগান: দীপ্রভাত, লিউয়ান(গোগোচা), দীপেন্দু(আদিত্য), বিলাল, রোশন, সালাউদ্দিন(পাসাং), মিংমা, সন্দীপ(টমসিং), কিয়ান, সুহেল, করণ(মার্শাল)।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
