অলস্পোর্ট ডেস্ক: আইএসএল ২০২৩-২৪ মরশুমে ভাল শুরু করেও ইন্ডিয়ান সুপার লিগের শুরুটা ততটা ভাল করতে পারেনি ইস্টবেঙ্গল এফসি। তিন রাউন্ডের পর লিগ টেবলে এখন তাদের অবস্থান সাত নম্বরে। একটি জয়, একটি হার ও একটি ড্র— প্রথম তিন ম্যাচে সব রকম ফলের স্বাদই পাওয়া হয়ে গিয়েছে তাদের। কিন্তু এ বারের লিগে তাদের ভাল কিছু করতে হলে এমন মিশ্র ফল হলে তো চলবে না। বরং আর হতে হবে কার্লস কুয়াদ্রাতের দলকে। যেমন তারা ছিল মরশুমের শুরুতে, ডুরান্ড কাপে।
শুধু ৫৫ মাস পরে ডার্বি জয় নয়, টানা চার ম্যাচে অপরাজিত থেকে ডুরান্ডের ফাইনালে ওঠে তারা। ফাইনালে ফের চিরপ্রতিদ্বন্দী না এসজি-রই মুখোমুখি হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফাল জিতে নেয় মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। খেতাবী ম্যাচে জিততে না পারলেও সারা মরশুমে যে চিরপ্রতিদ্বন্দীদের সমানে সমানে টক্কর দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা, তার ইঙ্গিত প্রথম টুর্নামেন্টেই দিয়ে রেখেছে ইস্টবেঙ্গল।
গত তিন মরশুমে লিগ টেবলের একেবারে নীচের দিকে থাকলেও ইস্টবেঙ্গল এফসি এ বার অন্তত সেরা ছয়ে থাকার লক্ষ্য নিয়ে দলে আমূল পরিবর্তন এনেছে। একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ কোচ যেমন এনেছে তারা, তেমনই কয়েকজন ভাল বিদেশি ফুটবলারকেও আনা হয়েছে, যাদের ওপর ভরসা করা যায়। স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড হাভিয়ে সিভেরিও ও সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার সল ক্রেসপোকে সই করিয়েছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব। এ ছাড়া হায়দরাবাদ এফসি থেকে স্প্যানিশ মিডফিল্ডার বোরহা হেরেরা গঞ্জালেসকেও নিয়ে আসা হয়। যোগ দেন আর এক স্প্যানিশ ডিফেন্ডার হোসে পার্দো। এ ছাড়া গত মরশুমের দলে থাকা বিদেশি স্ট্রাইকার ক্লেটন সিলভা আছেন এ বারেও।
তাতেও অবশ্য গোলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়াতে পারেনি তারা। গত মরশুমে কুড়িটি ম্যাচে ২২টি গোল করে ৩৮টি গোল খেয়েছিল তারা। এ বার আইএসএলের প্রথম তিন ম্যাচে তারা তিনটি গোল দিয়ে তিনটি গোল খেয়েছেও। এই বিষয়ে এখনও তেমন কোনও উন্নতি না হলেও গতবারের চেয়ে লড়াকু মানসিকতা, সংগঠিত পারফরম্যান্স, পরিকল্পনা, গতিময় ফুটবল ও শেষ মিনিট পর্যন্ত হাল না ছাড়ার মানসিকতায় উন্নতি দেখা যাচ্ছে। যা গতবার কম ম্যাচেই দেখা গিয়েছিল।
ইস্টবেঙ্গলকে যে গোলসংখ্যা বাড়াতে হবে, এই নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু শুধু হাভিয়ে সিভেরিও, সল ক্রেসপো, বোরহা হেরেরা, ক্লেটন সিলভারাই কি ইস্টবেঙ্গলকে প্রচুর গোল এনে দিতে পারবেন? বোধহয় না। গোল করার জন্য তাদের সহায়তা দরকার, যে দায়িত্ব পালন করতে হবে দলের ভারতীয়দেরই। মূলত দুই উইঙ্গার নাওরেম মহেশ সিং ও নন্দকুমার শেখরকে। কারণ, দুই উইং থেকে মাপা ক্রস যত বেশি হয়, ততই গোলের সম্ভাবনা বাড়ে। এটা ফুটবলের চিরকালীন নিয়ম।
গত তিন ম্যাচে কুয়াদ্রাত দলকে খেলিয়েছেন মূলত ৪-৩-২-১ ছকে। কখনও কখনও সেটা ৪-৫-১-ও হয়েছে আবার কখনও ম্যাচের মাঝামাঝি ৪-৩-৩-ও হয়ে গিয়েছে। কিন্তু রক্ষণে বেশিরভাগ সময়ই অন্তত চারজনকে রেখে খেলছে ইস্টবেঙ্গল, যার ফলে প্রয়োজন হলেও মাঝমাঠ ও আক্রমণে পিছন থেকে লোক বাড়াতে পারে না তারা। এক্ষেত্রে গোলের সংখ্যা বাড়ানোর সবচেয়ে ভাল উপায় হল দুই উইং দিয়ে ঘন ঘন আক্রমণে ওঠা, যা খুব বেশি হচ্ছে না তাদের।
এ জন্য তাদের ভরসা মহেশ এবং নন্দকুমার। গত তিন ম্যাচেই এই দু’জনকেই উইঙ্গারের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মহেশের দিক দিয়ে আক্রমণ হয়েছে। নন্দকুমারের দিক থেকে তুলনায় কম আক্রমণ হয়েছে। চলতি আইএসএলে মহেশ এ পর্যন্ত তিনটি ম্যাচে একটি গোল করেছেন। পাঁচটি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। গোলে মোট তিনটি শট মেরেছেন তিনি, যার মধ্যে দু’টি ছিল লক্ষ্যে ও একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এই তিন ম্যাচে মোট সাতটি ক্রস দিয়েছেন মহেশ, যার মধ্যে তিনটি সফল হয়। গত মরশুমে মহেশের ৮৭টি ক্রসের মধ্যে ১৫টি সফল হয়েছিল।
অন্য দিকে, নন্দকুমার এখন পর্যন্ত তিনটি ম্যাচে একটিও গোল পাননি, তবে একটি গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। তিনিও তিনটি শট মেরেছেন। কিন্তু একটি লক্ষ্যে ছিল, বাকি দুটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। চারটি গোলের সুযোগ তৈরি করেন নন্দ। কোচ চান তামিল তারকা আরও তৎপর হোন। তাই নিশ্চয়ই এই দুই খেলোয়াড়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন তিনি।
মহেশ বেশিরভাগ ম্যাচেই বাঁ দিক থেকে ওঠেন। সেক্ষেত্রে নন্দকুমারকে ডানদিকটা সামলাতে হয়। যদিও দু’জনে দিক বদলে বদলে খেলেন। ফলে তাদের প্রতিপক্ষদের কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়। যত বেশি এই ব্যাপারটা করতে পারবেন তাঁরা, তত বেশিই লাল-হলুদ বাহিনীর গোলের দরজা খুলবে।
ভারতীয় দলে এখন নিয়মিত সদস্য মহেশ এবং দেশের হয়ে তিনি গোলও করছেন নিয়মিত। সদ্য মারডেকা কাপের একমাত্র ম্যাচে ভারতকে প্রথম গোল এনে দেন তিনিই। এ বছর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় ম্যাচে নেপালের বিরুদ্ধে ভারত যে দু’গোলে জেতে, সেই দুই গোলেই মহেশের অবদান ছিল। একটি তো তিনি নিজেই করেন, অন্যটি তাঁর পাস থেকেই করেন সুনীল ছেত্রী। তার আগের দুই ম্যাচেও পরিবর্ত হিসেবে নেমে ভারতীয় দলের কোচ স্টিমাচকে যথেষ্ট খুশি করেছিলেন তিনি। ইস্টবেঙ্গলের কোচ কুয়াদ্রাতও মহেশকে নিয়ে রীতিমতো খুশি।
ফুটবল মাঠে যতটা আক্রমণাত্মক ও ছটফটে ২৪ বছর বয়সী এই লেফট উইঙ্গার, মাঠের বাইরে ততটাই লাজুক ও কম কথার মানুষ মহেশ। যা বলেন, নিজের পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই বলেন। যেমন বলেছিলেন গত হিরো আইএসএল মরশুমে। দেশের এক নম্বর লিগে তাঁর দল ইস্টবেঙ্গল ভাল ফল করতে না পারলেও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখান মহেশ। মোট ১৯টি ম্যাচে তিনি দুটি গোল করেন ও সাতটি গোলে অ্যাসিস্ট করেন। একই ম্যাচে তিনটি অ্যাসিস্টের রেকর্ডও আছে তাঁর, যা আর কোনও ভারতীয় ফুটবলারের নেই। ভারতীয় ফুটবলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট করেন তিনিই। মহেশের কনভারশন রেটও ছিল উল্লেখযোগ্য, ১৩ শতাংশ।
নন্দকুমারের সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি করেছে কলকাতার ক্লাব। গত মরশুমে ওডিশা এফসি-র হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখান তামিলনাড়ু থেকে উঠে আসা এই ফুটবলার। এ মরশুমও শুরুটা দারুণ করেন তিনি। গোল করে ইস্টবেঙ্গলকে সাড়ে চার বছর পর ডার্বি জয় এনে দেন তিনিই। ডুরান্ড কাপের সেমিফাইনালে নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে দু’গোলে পিছিয়ে থাকার পর তাঁর গোলেই সমতা আনে ইস্টবেঙ্গল।
গত বছর আইএসএলে ছ’টি গোল করেন ও একটিতে অ্যাসিস্ট করেন নন্দকুমার। সুপার কাপেও পাঁচটি ম্যাচে চারটি গোল করে দলকে চ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্য করেন তিনি। একটিতে জোড়া গোল ছিল তাঁর। উইং দিয়ে আক্রমণে উঠে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাটল ধরিয়ে গোল করার ক্ষমতাসম্পন্ন এই ফুটবলারকে নিয়ে এ বার লাল-হলুদ জনতার অনেক আশা। কিন্তু ডুরান্ড কাপের পর যেন কিছুটা ভাটা পড়েছে নন্দকুমারের পারফরম্যান্সে। চলতি আইএসএলে তিনি তিনটি ম্যাচে ১৪টি ক্রস দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এতগুলি ক্রসের মধ্যে মাত্র একটি ক্রস সফল হয়েছে। গত মরশুমে তার ৫৮টি ক্রসের মধ্যে ন’টি সফল হয়েছিল।
নন্দও এখন ভারতীয় দলের নিয়মিত সদস্য। তবে মহেশকে যেমন শুরু থেকেই খেলান স্টিমাচ, তাঁকে পরিবর্ত হিসেবে ব্যবহার করেন। মারডেকা ম্যাচে যেমন শেষ দশ মিনিটের জন্য তাঁকে নামান ভারতীয় কোচ। আসলে তাঁকে আরও ধারাবাহিক হতে হবে। কোনও কোনও ম্যাচে ভাল খেলছেন তিনি। কিন্তু টানা ভাল খেলে যেতে হবে। তবেই তাঁর কার্যকরিতা বাড়বে। কুয়াদ্রাত এখন দলের প্রত্যেককেই সময় দিচ্ছেন। নন্দকুমারকেও যথেষ্ট সময় দিয়েছেন। আরও সময় হয়তো পাবেন। এই সময়ের মধ্যে মহেশের সঙ্গে এবং সতীর্থ ফরোয়ার্ডদের সঙ্গে বোঝাপড়া ও রসায়ন তৈরি করাটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
গতবার ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড ক্লেটন সিলভা ও মহেশের জুটিই লাল-হলুদ শিবিরকে অধিকাংশ গোল এনে দেয়। দলের ২২টি গোলের মধ্যে ১৩টিতে ক্লেটনের ও ন’টিতে মহেশের অবদান ছিল। গত মরশুমে মহেশের সঙ্গে ছিলেন শুধু ক্লেটন। ভিপি সুহের, জর্ডন ও’ডোহার্টি, অ্যালেক্স লিমা, চ্যারিস কিরিয়াকুরা তাঁদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাল খেলতে পারলে ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণ কিন্তু আরও ধারালো হত। কিন্তু তাঁরা তা পারেননি। সারা লিগে জেতার জায়গায় গিয়েও ১১ পয়েন্ট খোয়ায় তারা।
এ বার সে রকম হওয়ার কথা নয়। কারণ, ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণ বিভাগ মোটেই খারাপ নয়। বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই যদি ফর্মে থাকেন এবং কোচ কার্লস কুয়াদ্রাত যদি এঁদের ঠিকমতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করতে পারেন, তা হলে সাফল্য নিশ্চয়ই আসবে। সেই চেষ্টা করে চলেছেন কুয়াদ্রাত। কিন্তু মাঠে নেমে তো তাঁর দলের ফুটবলারদেরই খেলতে হবে, কোচকে নয়।
(লেখা আইএসএল ওয়েব সাইট)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
