অলস্পোর্ট ডেস্ক: আইএসএল ২০২৩-২৪-এর শুরুটা যে রকম করেছে ইস্টবেঙ্গল এফসি, ততটা ভাল করতে পারেনি বেঙ্গালুরু এফসি। বরং বলা যায় একেবারেই ভাল শুরু করতে পারেনি তারা। এরকম শুরু তারা কোনও আইএসএলেই এর আগে করেনি। ইস্টবেঙ্গলের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তা-ই। তবে ইতিবাচক দিক দিয়ে। এত ভাল শুরু আবার ইস্টবেঙ্গল কখনও করেনি লিগের ইতিহাসে। প্রথম দুই ম্যাচ থেকে চার পয়েন্ট তারা কখনও অর্জন করতে পারেনি।
তাই বুধবার যখন ঘরের মাঠে বেঙ্গালুরু এফসি তাদের মরশুমের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামবে, তখন তারা লিগের প্রথম পয়েন্ট অর্জনের জন্য যে মরিয়া হয়ে উঠবে, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ইস্টবেঙ্গলের আবার ঘরের চেয়ে বাইরের মাঠে ফল ভাল। এ বার যদিও ঘরের মাঠেও অপরাজিত থেকে শুরু করেছে তারা। তাই ঘরের মাঠের ছন্দ যদি এই ম্যাচেও বজায় থাকে, তা হলে তারা লিগ টেবলে একাধিক ধাপ ওপরে উঠে যাবে। এখন তাদের স্থান পাঁচে। পরের ম্যাচে জিতলে সাত পয়েন্ট পেয়ে উঠে যাবে সবার ওপরে। তাই এই ম্যাচে দুই দলেরই তাগিদ প্রায় সমান।
তবে ইস্টবেঙ্গলের কোচ কার্লস কুয়াদ্রাতের তাগিদটা আবার অন্যরকমের। ২০১৬ থেকে ২০১৮কোচ হিসেবে ভারতে তাঁর প্রথম পর্বে কুয়াদ্রাত বেঙ্গালুরু এফসি-র সহকারী কোচের পদে ছিলেন ও তাদের ফেডারেশন কাপ, প্রথম হিরো সুপার কাপ জিততে সাহায্য করেন। ২০১৮-য় প্রধান কোচ হিসেবে বেঙ্গালুরু এফসি-র দায়িত্ব নিয়ে প্রথম মরশুমেই (২০১৮-১৯) দলকে প্রথম আইএসএল চ্যাম্পিয়ন করেন। তাঁরই প্রশিক্ষণে বেঙ্গালুরু একই মরশুমে লিগসেরা ও ট্রফিজয়ী দুইই হয়। সেই বেঙ্গালুরু এফসি-র বিরুদ্ধে এ বার দল নামাতে চলেছেন তিনি। কোনও কিছু প্রমাণ করার নেই ঠিকই। কিন্তু তিনি যে একই রকম খুরধার মস্তিষ্কের কোচই রয়েছেন, সেটা প্রমাণ করতে নিশ্চয়ই চাইবেন। গতবার স্টিফেন কনস্টানটাইনের ইস্টবেঙ্গল বেঙ্গালুরুকে ঘরে-বাইরে দুই ম্যাচেই হারিয়েছিল। এ বার তাদের চেয়ে ভাল দল নিয়ে নামছেন কুয়াদ্রাত। তাই এই ম্যাচে খাতায় কলমে তাঁর দলই ফেভারিট। কিন্তু আইএসএল এমন এক লিগ, যেখানে ফেভারিট বলে কিছু হয় না। কবে কার দিন আসবে, তা কেউ বলতে পারে না।
দুই শিবিরের খবর
বেঙ্গালুরু এফসি:ভারতীয় দলের হয়ে যখন এশিয়ান গেমসে খেলতে যান সুনীল ছেত্রী,তখন শুরুতে তাঁর অনুপস্থিতির অভাব ভাল মতোই টের পেয়েছে বেঙ্গালুরু এফসি। এমনিতেই এ মরশুমে সন্দেশ ঝিঙ্গন, রয় কৃষ্ণা, উদান্ত সিংয়ের মতো তারকাদের ছেড়ে দিয়েছে বেঙ্গালুরু এফসি। বেশির ভাগই নতুন মুখের ভীড় এ বারের দলে। তাই নতুন দলের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি হতে একটু সময় লাগছে। হয়তো সেই কারণেই প্রথম দুই ম্যাচে দলকে খুব একটা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলানোর পক্ষে ছিলেন না কোচ গ্রেসন। মোহনবাগান এসজি-র বিরুদ্ধে লাল কার্ড দেখায় এই ম্যাচে খেলতে পারবেন না সুরেশ সিং ওয়াংজাম ও রওশন সিং। তবে কোচ সাইমন গ্রেসনের আশা, ঘরের মাঠে মুখর সমর্থকদের সামনে উজ্জীবিত ফুটবল খেলে জয়ে ফিরে আসবে তাঁর দল। জাতীয় দল থেকে ফিরে সুনীল ছেত্রী ও রোহিত দানু দলের অনুশীলনে যোগ দিয়েছেন। তাঁরা চলে আসায় সতীর্থরা নিশ্চয়ই আরও উৎসাহ পাবেন। আক্রমণ বিভাগে যে অভাব ছিল তাঁদের, এই দুই স্ট্রাইকার চলে আসায় সেই অভাব নিশ্চয়ই পূরণ হবে। এ ছাড়া রায়ান উইলিয়ামস, শিবশক্তি নারায়ণনরা তাঁদের সঙ্গে থাকতে পারেন। রক্ষণে দুই বিদেশি স্লাভকো দামিয়ানোভিচ, আলেকজান্দার জোভানোভিচরাই প্রধান ভরসা। এ ছাড়া অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার হাভিয়ে হার্নান্ডেজ, ইংল্যান্ড থেকে আসা ফরোয়ার্ড কার্টিস মেনগ্রেসনের ভরসা।
ইস্টবেঙ্গল এফসি: লাল-হলুদ বাহিনীরস্প্যানিশ ফরোয়ার্ড হাভিয়ে সিভেরিও ও সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার সল ক্রেসপোর সঙ্গে হায়দরাবাদ এফসি থেকে আসা স্প্যানিশ মিডফিল্ডার বোরহা হেরেরা গঞ্জালেসপ্রত্যেকেই ভাল ফর্মে রয়েছেন। আর এক স্প্যানিশ তারকা ডিফেন্ডার হোসে পার্দোও রক্ষণকে ভরসা জোগাচ্ছেন। এ ছাড়া গত মরশুমে দলে থাকা বিদেশি স্ট্রাইকার ক্লেটন সিলভা তো এ বারেও আছেন। গত ম্যাচে তাঁর জোড়া গোলেই হায়দরাবাদ এফসি-কে হারায় ইস্টবেঙ্গল। এঁদের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য উইঙ্গার নাওরেম মহেশ সিং, সিনিয়র ডিফেন্ডার হরমনজ্যোৎ সিং খাবরা, মান্দার রাও দেশাই, ওডিশা এফসি থেকে আসা উইঙ্গার নন্দকুমার শেখর, কেরালা ব্লাস্টার্স থেকে আসা ডিফেন্ডার নিশু কুমার ও পাঞ্জাবের গোলকিপার প্রভসুখন গিলও রয়েছেন দলে। মহেশের সঙ্গে ২০২৭ পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণা ইস্টবেঙ্গল করেছে সম্প্রতি। এই ঘোষণায় আরও উজ্জীবিত ফুটবল খেলছেন তিনি। এঁরাই তিন মরশুম পরে ডুরান্ড কাপে রানার্স আপ হয়ে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবকে সাফল্যের মুখ দেখান। আইএসএএলের শুরুটাও খারাপ করেননি।
সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স
বেঙ্গালুরু এফসি: ডুরান্ড কাপের গ্রুপ পর্বেভারতীয় বায়ূসেনার দলের সঙ্গে ১-১ ড্র করে মরশুম শুরু করে গতবারের আইএসএল ফাইনালিস্ট বেঙ্গালুরু এফসি। সেই টুর্নামেন্টে কেরালা ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধেও ২-২ ড্র করে তারা। শেষে গোকুলাম কেরালা এফসি-কে ২-০-য় হারালেও কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারেনি তারা। আইএসএলের শুরুতেও ধাক্কা খায় গতবারের ফাইনালিস্টরা, গতবার যাদের ফাইনালে ওঠাটা ছিল অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। প্রথমে কেরালা ব্লাস্টার্সের কাছে ১-২-এ ও দ্বিতীয় ম্যাচে মোহনবাগান এসজি-র কাছে ০-১-এ হেরে যায় তারা। গত মরশুমে টানা আটটি ম্যাচে জিতে দশ থেকে চার নম্বরে উঠে লিগ শেষ করে প্লে অফে পৌঁছয়তারা। শেষ পর্যন্ত ফাইনালেও ওঠে। এ বারেও সে রকম লড়াই দেখা যাবে কি না সুনীল ছেত্রীদের কাছ থেকে, সেটাই দেখার।
ইস্টবেঙ্গল এফসি: গত তিন মরশুম ধরে টানা একতরফা ব্যর্থতার পর এ বছর ডুরান্ড কাপের ফাইনালে উঠে ইস্টবেঙ্গলকে নতুন দিশা দেখিয়েছেন কুয়াদ্রাত ও তাঁর দলের ফুটবলাররা। অসাধারণ এক গোল করে দলকে বহু আকাঙ্খিত ডার্বি-জয় এনে দেন দলের নতুন ‘হিরো’ নন্দকুমার শেখর।শুধু এই জয় নয়, টানা চার ম্যাচে অপরাজিত থেকে ডুরান্ডের ফাইনালে ওঠে তারা। ফাইনালে ফের চিরপ্রতিদ্বন্দী মোহনবাগান এসজি-রই মুখোমুখি হয়। তবে জিততে পারেনি। কিন্তু ডুরান্ডের সেই ছন্দ জামশেদপুর এফসি-র বিরুদ্ধে (গোলশূন্য ড্র) প্রথম ম্যাচে ধরে রাখতে না পারলেও দ্বিতীয় ম্যাচে ক্লেটন সিলভা ফর্মে ফিরতে দলও জয়ে ফেরে।ব্রাজিলীয় তারকার জোড়া গোলে চলতি লিগের প্রথম জয় পায় তারা। বেঙ্গালুরুতে এই ছন্দ ধরে রাখাই ইস্টবেঙ্গলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পরিসংখ্যানবিদরা বলছেন
বেঙ্গালুরু এফসি-র বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গলের সাফল্যের শতকরা হার ৫০ শতাংশ। ইন্ডিয়ান সুপার লিগের অন্যান্য দলের চেয়ে বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে তাদের সাফল্যের হারই সবচেয়ে বেশি। চলতি মরশুমে ট্যাকলে সবচেয়ে বেশি সাফল্যের হার ইস্টবেঙ্গলেরই। ২৮টির মধ্যে ২১টি ট্যাকল সফল হয়েছে তাদের। অর্থাৎ সাফল্যের শতকরা হার ৭৫%। মুম্বই সিটি এফসি-রও এই হার ৭৫%।
চলতি মরশুমে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্লিয়ারেন্স ইস্টবেঙ্গলেরই। ৪২টি ক্লিয়ারেন্স করেছে তারা। তার মধ্যে ২১টিই হেড করে। ক্লেটন সিলভা তাঁর প্রাক্তন ক্লাব বেঙ্গালুরু এফসি-র বিরুদ্ধে তিনটি গোল করেছেন। প্রতি ৬০ মিনিট অন্তর একটি করে গোল করেছেন তিনি। চলতি মরশুমে ইস্টবেঙ্গলের খেলোয়াড়রা ওপেন প্লে থেকে ৩৬টি ক্রস দিয়েছেন, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, চেন্নাইন এফসি-র পরেই। এর মধ্যে নন্দকুমার শেখর একাই দশটি ক্রস দিয়েছেন।
বেঙ্গালুরুর কোচ সাইমন গ্রেসন বেঙ্গালুরুতে যোগ দেওয়ার পর এখন পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গলকে হারাতে পারেননি। কুয়াদ্রাত তাঁর প্রাক্তন আইএসএল ক্লাব বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে এই প্রথম মাঠে দল নামাবেন।
দ্বৈরথের ইতিহাস
আইএসএলে বেঙ্গালুরু এফসি ও ইস্টবেঙ্গল এফসি-র মধ্যে যতবারই দেখা হয়েছে, জমে উঠেছে ফুটবলের লড়াই। ছ’বারের মুখোমুখিতে বেঙ্গালুরু জিতেছে দু’বার। ইস্টবেঙ্গল তিনবার। বাকি একবার ড্র হয়েছে। গত মরশুমে লিগের প্রথম ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলের ১-০জয়ের কথা নিশ্চয়ই ভোলেননি সমর্থকেরা ফিরতি ম্যাচেও ২-১-এ জেতে তারা। ২১-২২ মরশুমে একবার ১-১ ড্র হয় ও পরের বার সুনীল ছেত্রীর গোলে জেতে বেঙ্গালুরু। ২০২০-২১ মরশুমে প্রথমে ম্যাটি স্টাইনমানের গোলে জেতে লাল-হলুদ বাহিনী ও ফিরতি লিগে দেবজিৎ মজুমদারের নিজ গোল ও ক্লেটন সিলভার গোলে জেতে বেঙ্গালুরু।
নজরে যাঁরা
ক্লেটন সিলভা: গত মরশুমে লাল-হলুদ বাহিনীকে ১৪টি গোল এনে দিয়েছিলেন এই ব্রাজিলীয়। এ ছাড়াও চারটি গোলে অ্যাসিস্টও করেন এই সুযোগসন্ধানী ফরোয়ার্ড। এ মরশুমে তিনি সবচেয়ে দেরি করে দলের প্রাক মরশুম শিবিরে যোগ দেন। গত ম্যাচের আগে পাঁচটি ম্যাচে ১৩৬ মিনিটের জন্য তাঁকে মাঠে নামান ইস্টবেঙ্গল কোচ কার্লস কুয়াদ্রাত। কিন্তু একটিও গোল করতে পারেননি। কোচ বলেছিলেন, ক্লেটন তৈরি হয়েছে মনে হলেই তাঁকে শুরু থেকে নামাবেন। কথায় বলে, জহুরির চোখ সঠিক সোনা চেনে। ক্লেটন চেনা ছন্দে ফেরার জায়গায় চলে এসেছেন বুঝেই গত ম্যাচে তাঁকে শুরু থেকে নামান ইস্টবেঙ্গল কোচ। এই সিদ্ধান্তে যে নির্ভুল, তা প্রমাণ করেন ৩৬ বছর বয়সী ব্রাজিলীয় স্ট্রাইকারই। দশ মিনিটের মাথায় প্রথম গোল ও ম্যাচের একেবারে শেষে স্টপেজ টাইমে দ্বিতীয় গোল করে দলকে বহু আকাঙ্খিত জয়টি এনে দেন ম্যাচের সেরা তারকা। ক্লেটন ফর্মে চলে এসেছেন মানে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় খবর। প্রাক্তন ক্লাব বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে তিনটি গোল রয়েছে তাঁর। বুধবারের ম্যাচে সেই সংখ্যাটা আরও বাড়ে কি না, সেটাই দেখার।
স্লাভকো দামিয়ানোভিচ:গত মরশুমে জানুয়ারির দলবদলে ফ্লোরেন্তিন পোগবার জায়গায় এই সার্বিয়ান ডিফেন্ডারকে নিয়ে আসে তৎকালীন এটিকে মোহনবাগান। এ বার তাঁকেই সই করিয়েছে বেঙ্গালুরু এফসি। ২০২১-২২ মরশুমে চেন্নাইন এফসি-র হয়ে ১৯টি ম্যাচ খেলেন স্লাভকো। সেই আইএসএল মরশুমের পর তিনি সার্বিয়ার সুপার লিগ ক্লাব নোভি পাজরে যোগ দিলেও শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেন ভারতের এক নম্বর ফুটবল লিগে। বুধবার ইস্টবেঙ্গলের ফরোয়ার্ডদের কী ভাবে রুখবেনছ’ফুটের ওপর উচ্চতার এই ডিফেন্ডার, সেটাই দেখার এবং তাঁর কাছেও এটা বড় পরীক্ষা।
ম্যাচ-বেঙ্গালুরু এফসি বনাম ইস্টবেঙ্গল এফসি
ভেনু-শ্রী কান্তিরাভা স্টেডিয়াম, বেঙ্গালুরু
সময়-৪ অক্টোবর, ২০২৩, বুধবার, রাত ৮টা
সরাসরি সম্প্রচার ও স্ট্রিমিং
টিভি: ডিডি বাংলা ও কালার্স বাংলা সিনেমা- বাংলা, স্পোর্টস ১৮ খেল- হিন্দি, স্পোর্টস ১৮ ১ এসডি ও এইচডি- ইংলিশ, ভিএইচ ১ এসডি ও এইচডি- ইংলিশ, সূর্য মুভিজ- মালয়ালাম
স্ট্রিমিং: জিও সিনেমা ও ওয়ানফুটবল
(লেখা আইএসএল ওয়েব সাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
