অলস্পোর্ট ডেস্ক: এএফসি এশিয়ান কাপ-এর শেষ ম্যাচেও হারতে হল ভারতকে। ফিফা ক্রমতালিকায় তাদের চেয়ে ১১ ধাপ এগিয়ে থাকা সিরিয়া ১-০-য় জিতে টুর্নামেন্টের শেষ ষোলোয় খেলার যোগ্যতা অর্জন করল তারা। অনেক আশা জাগিয়ে কাতারে যাওয়া ভারতকে খালি হাতেই দেশে ফিরতে হচ্ছে। শুধু জয়হীন নয়, এই টুর্নামেন্টে ভারত কোনও গোলও করতে পারল না।
এ দিন যেমন যথেষ্ট আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ভারত, তেমনই রক্ষণেও নিজেদের উজাড় করে দেন ভারতীয় ডিফেন্ডাররা। কিন্তু সিরিয়ার আক্রমণের তীব্রতা ছিল আরও বেশি। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে গোল পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। কারণ, এই ম্যাচে জিততে পারলে তাদের শেষ ষোলোয় জায়গা পাকা করে ফেলার সম্ভাবনা ছিল। ৭৬ মিনিটের মাথায় পরিবর্ত ফরোয়ার্ড ওমর খ্রবিনের গোলে সেই লক্ষ্যপূরণ হয় তাদের। এর আগে উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র করে তারা। সেই এক পয়েন্ট ও এই ম্যাচে অর্জন করা তিন পয়েন্ট, মোট চার পয়েন্ট নিয়ে প্রথমবারের জন্য এশিয়ান কাপের প্রি কোয়ার্টারে উঠে পড়ল সিরিয়া।
ভারতও এই প্রথম এএফসি এশিয়ান কাপের মূলপর্বে কোনও গোল না করে দেশে ফিরছে। যা প্রায় আশাতীত। ২০১১-য় তারা তিন গোল করেছিল। ২০১৯-এ চার গোল করেছিল ভারত। কিন্তু এ বার সুনীল ছেত্রীদের গোলের সংখ্যা শূন্য। সে দিক থেকে দেখতে গেলে ২০১৯-এই ভারত সবচেয়ে ভল ফল করেছিল। সে বার অন্তত একটি ম্যাচে জেতে তারা। চারটি গোল দিয়ে চারটি গোল খায়। গোল পার্থক্য ছিল শূন্য। ২০১১-য় গোলপার্থক্য ছিল -১০। সেবার ১৩ গোল খেয়েছিল তারা। কোনও ম্যাচ জিততে পারেনি। কিন্তু এ বার এক ঝাঁক গোলের সুযোগ তৈরি করা সত্ত্বেও একটিও গোল করতে না পারায় ভারতীয় ফুটবলে এক নতুন সমস্যা উঠে এল।
বল পজেশনে এগিয়ে থাকা (৫২-৪৮) সিরিয়া এ দিন আক্রমণেও এগিয়ে ছিল। তাদের মোট কুড়িটি শটের মধ্যে চারটি ছিল গোলের লক্ষ্যে। সেখানে ভারত আটটি শট নেয়, তার মধ্যে একটি ছিল গোলে। তবে রক্ষণে এই ম্যাচেও ভারত অসাধারণ ছিল। ১৮টি ট্যাকল ও ৩৬টি ক্লিয়ারেন্স করে তারা। নিখুঁত পাসিংয়ে (৭০%) প্রতিপক্ষের সমান হলেও বিপক্ষের অর্ধে ভারতের পাসিং অ্যাকিউরেসি ছিল ৫০%। সারা ম্যাচে ক্রসের সংখ্যাতেও ভারত ছিল অনেক পিছিয়ে (১৭-৩২)। সিরিয়া যেখানে ন’টি কর্নার আদায় করেছে, সেখানে ভারত তিনটি কর্নারের সুযোগ পেয়েছে।
গত ম্যাচের দলে তিনটি পরিবর্তন করে এ দিন প্রথম এগারো নামান ভারতের কোচ ইগর স্টিমাচ। নিখিল পূজারি, সুরেশ ওয়াংজাম ও অনিরুদ্ধ থাপার জায়গায় এ দিন দলে ছিলেন শুভাশিস বোস, দীপক টাঙরি ও লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে।
শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ভারত। তারা এতটা গতিময় ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলবে, তা বোধহয় ভাবতেই পারেননি সিরিয়ার ফুটবলাররা। তাদের ঘন ঘন ও আকস্মিক আক্রমণ সামলাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন সিরিয়ান ডিফেন্ডাররা। প্রথমার্ধে ভারত পাঁচটির মধ্যে একটি শট গোলে রাখে। সিরিয়ার ১২টির মধ্যে তিনটি শট ছিল গোলে।
চতুর্থ মিনিটেই ডানদিক দিয়ে বল নিয়ে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে গোলে কোণাকুনি শট নেন নাওরেম মহেশ। কিন্তু গোলকিপার আহমাদ মাদানি তা ক্ষিপ্রতার সঙ্গে আটকে দেন। এর দু’মিনিট পরেই মাঝমাঠ পেরিয়ে মহেশ বল দেন মনবীরকে, যা নিয়ে এগোলে তিনি সুযোগ পেতে পারতেন। কিন্তু তিনি বলের নাগাল পাননি। ২৫ মিনিটের মাথায় গোলের সামনে পাঠানো মহেশের উড়ন্ত বলে ঠিকমতো হেড দিতে পারলে হয়তো গোল পেতেন সুনীল ছেত্রী। কিন্তু পারেননি। প্রথমার্ধের স্টপেজ টাইমে বক্সের বাইরে থেকে সুনীলের বাঁ পায়ের শট গোলের সামান্য বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়।
ক্রমশ ম্যাচে ফেরে সিরিয়া এবং তাদের অ্যাটাকরারাও একাধিক সুযোগ তৈরি করে নেন। কিন্তু প্রতিবারই ভারতের ত্রাতা হয়ে গোলমুখী শট আটকে দলকে বাঁচান গোলকিপার গুরপ্রীত সিং সান্ধু। প্রথমে সাত মিনিটের মাথায় পাবলো সাবাগের গোলমুখী হেড আটকান তিনি। ১৯ মিনিটের মাথায় ইব্রাহিম হেসারের দূরপাল্লার গোলমুখী শট বাঁ দিকে ডাইভ দিয়ে সেভ করেন গুরপ্রীত। ফিরতি বলে ফের শট নিলেও তা ব্লক করেন শুভাশিস।
৩৯ মিনিটের মাথায় প্রথম গোলের সবচেয়ে কাছাকাছি চলে আসে সিরিয়া। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গুরপ্রীতের পরপর দু’টি পাঞ্চ সিরিয়াকে প্রায় অবধারিত গোল থেকে বঞ্চিত করে। প্রথমটি বাঁ দিক থেকে নেন আম্মার রামদান ও দ্বিতীয়টি মারেন আল আজান। প্রথমার্ধের শেষ দিকে রীতিমতো আক্রমণের ঝড় তোলে সিরিয়া এবং তাদের আটকাতে নিজেদের উজাড় করে দেন ভারতীয়রা।
প্রথমার্ধের নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষে সাবাগকে আটকাতে গিয়ে সন্দেশ ঝিঙ্গন গুরুতর আহত হন এবং বেশ কয়েক মিনিট ধরে মাঠেই পড়ে থাকেন। কিছুক্ষণ চিকিৎসা চলার পর সুস্থ হয়ে খেলায় ফেরেন তিনি। তবে বিরতির পর খেলা শুরু হতেই মাঠে লুটিয়ে পড়েন এবং মাঠের বাইরে চলে যান। তাঁর জায়গায় নামেন নিখিল পূজারি।
প্রথমার্ধে সিরিয়ার বল পজেশন ছিল ৫৪ শতাংশ। সারা মাঠ জুড়ে এ দিন খেলেন ভারতীয় ফুটবলাররা। প্রথমার্ধে তারা যেখানে ১৫৫টি পাস খেলে, সেখানে সিরিয়া ১৬৫টি পাস খেলে। নিখুঁত পাসিংয়ের হার ভারতের ছিল সাড়ে ৭৩ শতাংশ ও সিরিয়ার ৭৬ শতাংশ।
বিরতির পরে মহেশকে ছাড়াই খেলতে নামে ভারত। তাঁর জায়গায় নামেন উদান্ত আর সন্দেশ ঝিঙ্গনের জায়গায় নামেন নিখিল। অর্থাৎ, আক্রমণ ও রক্ষণ দুদিকেই পরিবর্তন হয়। তবে দুই দলই কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু ৬২ মিনিটের মাথায় আকাশ মিশ্রর পা থেকে বল ছিনিয়ে নিয়ে ভারতের বক্সের বাঁ দিক থেকে যে ক্রসটি তোলেন হেসার, তা দ্বিতীয় পোস্টের সামনে ঠিকমতো হেড করতে পারলে অবধারিত গোল পেতেন ওমর খ্রবিন। কিন্তু তাঁর হেড বারের ওপর দিয়ে চলে যায়। ৬৭ মিনিটে বাঁ দিকে দিয়ে উঠে বক্সে ঢুকে সাইড নেটে বল মারেন রামাদান। এই সময় থেকেই গোল পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে তারা।
৭৩ মিনিটের মাথায় ফের ভারতকে বিপদের হাত থেকে বাঁচান গুরপ্রীত। বাঁ দিক থেকে ওঠা আলা দালি কোণাকুনি শট প্রথমে চাপড় মেরে আটকান তিনি। ছিটকে সামনে চলে যাওয়া বলেরও দখল নেন তিনি। এই সময়ে প্রায় প্রতি মুহূর্তে মুহুর্মুহু আক্রমণে উঠতে শুরু করে সিরিয়া এবং তাদের আটকে রাখতেই ব্যস্ত ছিল ভারত।
প্রবল চাপে থাকা ভারতের রক্ষণ শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে ৭৬ মিনিটে, যখন গোল করে দলকে এগিয় দেন পরিবর্ত ফরোয়ার্ড খ্রবিন। বক্সের বাঁ দিক থেকে হেসারের ক্রসে বল পেয়ে গোলে শট নেন তিনি, যা গুরপ্রীতের ডানদিকে মাটি ঘেঁষে গোলে ঢুকে যায় (১-০)। রাহুল ভেকে তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করেও পারেননি। নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটেও গোলের সামনে বল পেয়ে যান খ্রবিন। কিন্তু বলে পৌঁছতে পারেননি।
এই গোলের মিনিট দশেক আগে মনবীরের জায়গায় নামেন সহাল আব্দুল সামাদ ও দীপক টাঙরির জায়গায় নামেন সুরেশ ওয়াংজাম। কিন্তু ভারত তখন এতটাই কোণঠাসা ছিল যে, তাঁদের আক্রমণাত্মক ভূমিকা কোনও কাজে আসেনি। শেষ দিকে ভারত বারদুয়েক আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করলেও নিজেদের গোলের সামনে কার্যত দেওয়াল তুলে দেয় সিরিয়া। স্টপেজ টাইমের শেষ মিনিটে বাঁ দিক থেকে উড়ে আসা লম্বা ক্রসে সুনীল ছেত্রী পৌঁছতে পারার আগেই বলের দখল নিয়ে নেন গোলকিপার। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ডানদিক থেকে ছাঙতের ক্রস ধরার জন্য ছিলেন না তাঁর কোনও সতীর্থ।
এ দিন গ্রুপের অন্য ম্যাচে ১-১ ড্র করে অস্ট্রেলিয়া ও উজবেকিস্তান। তবে তাতে সাত পয়েন্ট নিয়ে এক নম্বর দল হিসেবে শেষ ষোলোয় যাওয়া আটকায়নি অজিদের। পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় সেরা দল হিসেবে পরের রাউন্ডে উঠল উজবেকিস্তান।
ভারতীয় দল: গুরপ্রীত সিং সান্ধু (গোল), আকাশ মিশ্র, শুভাশিস বোস, সন্দেশ ঝিঙ্গন (নিখিল পূজারি-৪৭), রাহুল ভেকে, দীপক টাঙরি (সুরেশ ওয়াংজাম-৬৪), লালেঙমাউইয়া রালতে আপুইয়া (অনিরুদ্ধ থাপা-৮১), নাওরেম মহেশ সিং (উদান্ত সিং-৪৬), মনবীর সিং (সহাল আব্দুল সামাদ- ৬৪), লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে, সুনীল ছেত্রী
(লেখা আইএসএল ওয়েব সাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
