Cart Total Items (0)

Cart

All Sports
এএফসি কাপ গ্রুপ

অলস্পোর্ট ডেস্ক: শেষ পর্যন্ত সবুজ-মেরুন বাহিনীতে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারলেন না হুয়ান ফেরান্দো । মোহনবাগান সুপার জায়ান্টে তাঁর ভাল দিন শেষ হয়ে গেল বুধবারই, যখন ক্লাব ঘোষণা করে দেয় তাঁকে আর সিনিয়র দলের প্রধান কোচের পদে রাখা হচ্ছে না। তাঁকে সরিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ও প্রাক্তন কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসকে। 

গঙ্গাপাড়ের সবুজ-মেরুন শিবিরে এই ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। দলের ব্যর্থতার দায় নিয়ে এর আগে মোহনবাগান ক্লাব থেকে সরে যেতে হয়ে বহু কোচকে। তাঁদের তালিকা করলে, সেটা নেহাৎ ছোট হবে না। দেশীয় থেকে বিদেশি, সব রকম কোচের নামই এই তালিকায় অবশ্যই থাকবে।

তাই মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের মতো বড় ক্লাবের দায়িত্ব গ্রহণ করার সময়ই কোচেরা জানেন, যতদিন সাফল্য তাঁদের পাশে থাকে, ততদিন তাঁদের অস্তিত্বও থাকে। সাফল্য তাঁদের পাশ থেকে সরে গিয়ে ব্যর্থতার উদয় হওয়া মানেই কোচের বিদায় ঘণ্টা বাজা শুরু করা। এ শুধু মোহনবাগান নয়, কলকাতার আর এক ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ইস্টবেঙ্গলেরও নীতি এই একই। ২০২০-তে যখন কলকাতার দুই প্রধান আইএসএলে যোগ দেয়, তখন থেকে এ পর্যন্ত লাল-হলুদ শিবিরে হাফ ডজন কোচ (সাময়িক দায়িত্ব-সহ) এসেছেন ও গিয়েছেন। সুতরাং কোচ-বদল কলকাতার ক্লাবে নতুন নয়।

২০২১-২২ মরশুমে ডিসেম্বরে মুম্বই সিটি এফসি-র বিরুদ্ধে ১-৫ গোলে হারার পর থেকে তৎকালীন এটিকে মোহনবাগান জামশেদপুরের কাছে ১-২-এ হারে, চেন্নাইন এফসি-র বিরুদ্ধে ১-১ ড্র ও বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে ৩-৩ ড্র করে। এর পরই কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসকে অব্যহতি দিয়ে হুয়ান ফেরান্দোকে কোচ হিসেবে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয় মোহনবাগান কর্তৃপক্ষ।

দুঃসময়ে ত্রাতা

যে সময়ে এফসি গোয়া থেকে ফেরান্দোকে নিয়ে আসে কলকাতার ক্লাব, সেই সময়ে আইএসএলে ক্লাবের অনেকটা একই রকম দুর্দশা চলছিল, যা ফিরে এসেছে এ বারও। সে বার প্লে অফে তারা জায়গা করে নিতে পারবে কি না, এই নিয়েই সন্দেহ দেখা গিয়েছিল। এ বারও অবস্থা প্রায় সমান। ওই সময় তাদের ওই অবস্থা থেকে টেনে তোলার জন্য এমন একজন কোচ প্রয়োজন ছিল, যিনি দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অক্সিজেন জোগাতে পারবেন এবং খেলোয়াড়দের তথা গোটা দলটাকে ছন্দে ফেরাতে পারবেন।

দলের দায়িত্ব নিয়ে ঠিক সেই কাজটাই করেন ফেরান্দো। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর টানা ১৩টি ম্যাচে হারেনি সবুজ-মেরুন বাহিনী। শেষে অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জামশেদপুর এফসি-কে হারাতে না পারার লিগশিল্ড হাততছাড়া হয় তাদের এবং সেমিফাইনালে হায়দরাবাদের কাছে হেরে নক আউটের খেতাবও জিততে পারেনি তারা। তবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় যে ভরাডুবির উপক্রম হয়েছিল, সেই ভরাডুবির হাত থেকে ক্লাবকে বাঁচিয়ে কর্তাদের ভরসার যোগ্য হয়ে ওঠেন স্প্যানিশ কোচ।

সে বার এএফসি কাপেও গ্রুপ শীর্ষে থেকে জোনাল সেমিফাইনালে ওঠে এটিকে মোহনবাগান। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এএফসি কাপের ইন্টার জোনাল সেমিফাইনালে কুয়ালালামপুর এফসি-র কাছে ১-৩-এ হেরেছিল এটিকে মোহনবাগান। ৯০ মিনিট পর্যন্ত এক গোলে পিছিয়ে থাকার পর ফারদিন আলি মোল্লার গোলে সমতা আনে তারা। কিন্তু স্টপেজ টাইমে পরপর দু’গোল খেয়ে ম্যাচ হেরে যায়। তার পরেও অবশ্য ফেরান্দোর ওপর ক্লাবের ভরসা কমেনি।

সেই ভরসার তিনি দামও দেন গত মরশুমে দলকে আইএসএল কাপ চ্যাম্পিয়ন করে। যদিও গত বারের লিগের শেষটা যে রকম রোমহর্ষক ও ধারাবাহিক সাফল্য দিয়ে করে তারা, লিগ পর্বে তাদের চলার পথ অতটা মসৃণ ছিল না। এমনকী প্লে অফ পর্বেও ফাইনালের আগে তাদের পারফরম্যান্স সমর্থকদের বেশ চিন্তায় রেখেছিল। দুই সেমিফাইনালের একটিতেও নির্ধারিত সময়ে কোনও গোল করতে পারেনি তারা। হায়দরাবাদ এফসি-র বিরুদ্ধে প্রথম লেগে ০-০ করার পরে দ্বিতীয় লেগেও একই ফলে শেষ করে তারা। অতিরিক্ত সময়েও কোনও গোল করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুট আউটে ৪-৩ জিতে ফাইনালে ওঠে তারা।

কঠিন লড়াইয়ে সঙ্গী

একটা সময় যে রকম গোলখরা দেখা গিয়েছিল এটিকে মোহনবাগান শিবিরে, তাতে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল আদৌও তারা প্লে-অফ পর্বে উঠতে পারবে কি না। কিন্তু লিগের শেষ বেলায় সঠিক ছন্দ ও ফর্মে ফিরে আসায় অবশেষে বাজিমাত করেন পেট্রাটস, হুগো বুমৌসরা। তাদের লিগপর্বের দৌড় সমর্থকদের কখনওই খুব একটা স্বস্তি দেয়নি। এই জয় তো এই হার, এই কার্ড সমস্যা তো এই চোট-আঘাত। ধারাবাহিকতার অভাব খুব বেশি রকমই ছিল তাদের। তবু এই পরিস্থিতি সামলেই দলকে কাপ চ্যাম্পিয়ন করেন ফেরান্দো।

তখন বারবার প্রশ্ন উঠেছিল, রয় কৃষ্ণার মতো স্ট্রাইকারকে ছেড়ে দিয়ে কোনও বিশেষজ্ঞ ফরোয়ার্ড ছাড়াই কেন দল মাঠে নামাচ্ছেন ফেরান্দো? মরশুমের মাঝখানে জানুয়ারিতে বিশেষজ্ঞ ফরোয়ার্ড নিয়ে এসে দলের আক্রমণ বিভাগকে শক্তিশালী করে তোলার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেই সুযোগ কাজে লাগাননি তিনি। নিজের জেদ বজায় রেখে বড় ঝুঁকি নিয়ে শুধু দিমিত্রিয়স পেট্রাটস, মনবীর সিংদের ওপর ভরসা রেখে দল চালিয়ে যান। ফলে গোলের খরা দেখা দেয় সবুজ-মেরুন শিবিরে। প্লে অফে গোলকিপার ও ডিফেন্ডারদের দক্ষতায় দল সফল না হলে হয়তো ফেরান্দোর বিদায় ঘণ্টা গত মরশুমের পরেই বেজে যেত।   

গতবার এএফসি কাপে ফাইনালের মুখ থেকে অপ্রত্যাশিত ভাবে ফিরে আসার পরে এ মরশুমে সবুজ-মেরুন বাহিনীর সামনে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল এএফসি কাপ। তাই গত বছর ক্লাবের সঙ্গে নতুন চুক্তি করার পরই স্প্যানিশ কোচ হুয়ান ফেরান্দো বলে দেন, “আইএসএলে এ বারও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি আমাদের লক্ষ্য থাকবে এএফসি কাপে আরও ভাল ফল করা”।

নতুন সূচনা

আক্রমণ বিভাগকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য কাতার বিশ্বকাপে নামা সেন্টার ফরোয়ার্ড জেসন কামিংস ও আলবানিয়ার জাতীয় দলের হয়ে ইউরো ২০১৬-য় খেলা সেন্টার ফরোয়ার্ড আরমান্দো সাদিকুকে নিয়ে আসেন ফেরান্দো। অর্থাৎ গত মরশুমেই যেটা করতে পারতেন, তা করেন চলতি মরশুমের আগে। নিজের ভুল নিজেই শুধরের নেন এ ভাবে। ওঁরা ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার তারকা অ্যাটাকার দিমিত্রিয়স পেট্রাটস ও ফরাসি অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হুগো বুমৌস তো ছিলেনই সবুজ-মেরুন শিবিরে।  

রক্ষণের জন্য নিয়ে আসেন ক্রিশ্চিয়ান রোনাল্ডোর বিরুদ্ধে খেলা স্প্যানিশ ডিফেন্ডার হেক্টর ইউস্তেকে। এ ছাড়াও এফসি গোয়া থেকে সবুজ-মেরুন শিবিরে নিয়ে আসেন ভারতীয় দলের নিয়মিত ডিফেন্ডার আনোয়ার আলি। যিনি মরশুমের শুরু থেকেই ছিলেন ফর্মের তুঙ্গে। কিন্তু পরে চোট পেয়ে ছিটকে যান। যাঁকেই চেয়েছেন ফেরান্দো, ক্লাব ম্যানেজমেন্ট তাঁকেই এনে দিয়েছে।

আনোয়ারের মতো ভারতীয় দলের আরও কয়েকজন নিয়মিত তারকাকেও সই করায় সবুজ-মেরুন ব্রিগেড। ভারতীয় দলের আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার অনিরুদ্ধ থাপার সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করে সবুজ-মেরুন বাহিনী। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন কেরালার আর এক নির্ভরযোগ্য তারকা সহাল আব্দুল সামাদও। ভারতীয় দলের সঙ্গে এএফসি এশিয়ান কাপে তাঁর দলের মোট সাতজন ফুটবলার গিয়েছেন দোহায়।

মরশুমের শুরুতেই ডুরান্ড কাপের গ্রুপ লিগে চিরপ্রতিদ্বন্দী ইস্টবেঙ্গলের কাছে হেরে যায় ফেরান্দোর দল। যা ছিল ৫৫ মাস পরে তাদের প্রথম ডার্বি-হার। সেটাই ছিল মরশুমের শুরুতে তাদের ঘুম ভাঙানোর অ্যালার্ম। ঘুম ভাঙে এবং টানা চারটি ম্যাচ জিতে ডুরান্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। কোয়ার্টার ফাইনালে মুম্বই সিটি এফসি-কে হারায়, যা ছিল মুম্বইয়ের ক্লাবের বিরুদ্ধে তাদের সর্বপ্রথম জয়। সেমিফাইনালে এফসি গোয়াকেও হারায় তারা এবং ফাইনালে ডার্বি হারের বদলাও নিয়ে নেয়।

বিপর্যয়েই লড়াই শেষ

আইএসএলের দশম মরশুমে দলের একাধিক নির্ভরযোগ্য তারকাকে ছাড়াই সাতটি ম্যাচে অপরাজিত ছিল তারা। দুর্দান্ত একটা দল নিয়ে মরশুম শুরু করলেও প্রথমেই দুঃসংবাদ আসে, ভারতীয় দলের হয়ে খেলতে গিয়ে চোট পেয়ে কার্যত সারা মরশুমের জন্যই ছিটকে যান আশিক কুরুনিয়ান। এখান থেকেই বিপর্যয়ের শুরু। আশিকের পর চোট পেয়ে যান আনোয়ার আলিও। তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের রক্ষণ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। যিনি ক্রমশ ফর্মে ফিরছিলেন, সেই মনবীর সিংও মরশুমের মাঝখানে চোট পেয়ে ছিটকে যান। এমনই অবস্থা দাঁড়ায় যে, এএফসি কাপের শেষ ম্যাচে মলদ্বীপে দ্বিতীয় সারির দল পাঠাতে হয় ফেরান্দোকে। 

অস্ট্রেলীয় স্ট্রাইকার পেট্রাটসও চোটের তালিকায় নাম লিখিয়েছিলেন। তবে মাঠে ফিরেও আসেন। জেসন কামিংস, আরমান্দো সাদিকুরা ক্রমশ ফর্ম হারান। দলকে নিয়মিত গোল করে সাহায্য করতে পারেননি তাঁরা। সব শেষে সর্বনাশটি হয় মুম্বই সিটি এফসি-র বিরুদ্ধে ম্যাচে। লাল কার্ড দেখে আশিস রাই, হেক্টর ইউস্তে ও লিস্টন কোলাসো সাসপেন্ড হয়ে যান। বছরের শেষে এফসি গোয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে তারা খেলতে পারেননি। কেরালা ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধে প্রথম দু’জন ফিরলেও কোলাসো ফিরতে পারেননি, চার ম্যাচের জন্য সাসপেন্ড হওয়ায়।

পরপর এই বিপর্যয়েই ক্রমশ নীচের দিকে নামতে থাকে মোহনবাগান এসজি। বছরের শেষে লিগে সাময়িক অবকাশ শুরুর আগে সবুজ-মেরুন শিবির থেকে নেমে আসে পাঁচ নম্বরে। এই অধঃপতনই মেনে নিতে না পেরে ফেরান্দোকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নেন ক্লাবের কর্তারা। কারণ, তাঁরা হয়তো এই জায়গা থেকেই নতুন কোচকে দিয়ে শক্ত হাতে হাল ধরাতে চান। যাতে দল একেবারে লিগ টেবলের তলানিতে চলে না যায়।

বিদায় নেওয়ার আগে আইএসএলে সবুজ-মেরুন বাহিনীকে ৫০টি ম্যাচে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন ফেরান্দো। এর মধ্যে দল জিতেছে ২৬টি ম্যাচ ও হেরেছে ১১বার। তাঁর আমলে মোহনবাগান ড্র করেছে ১৩বার। অর্থাৎ জয়ের শতকরা হিসাব ৫২ শতাংশ। যা তাঁর আইএসএলের সার্বির জয়ের শতকরা হিসাবের (৪৪.৮৭) চেয়েও বেশি। আইএসএলে এ পর্যন্ত একাধিক দলকে ৭৮টি ম্যাচে প্রশিক্ষণ দিয়ে ৩৫টিতে জিতিয়েছেন ফেরান্দো। ২৬টিতে ড্র হয়েছে ও ১৭টিতে হার। তাঁর প্রশিক্ষণে মোহনবাগান ৭৩টি গোল করেছে ও ৪৯টি গোল খেয়েছে। আইএসএলে এই পরিসংখ্যান ১১৫-৮৭। একজন কোচ হিসেবে গর্ব করার মতোই পরিসংখ্যান তাঁর ঝুলিতে রয়েছে।

(লেখা আইএসএল ওয়েব সাইট থেকে)

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *