অলস্পোর্ট ডেস্ক: স্কটল্যান্ড থেকে ইংল্যান্ড হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছেন তিনি। তিন দেশেরই ক্লাব ফুটবলে চুটিয়ে খেলেছেন। খেলেছেন স্কটিশ ও অজিদের জাতীয় দলের হয়েও। এখন তিনি এসেছেন ভারতের ক্লাব ফুটবল মাতাতে। এর আগে যে সব দেশগুলিতে খেলেছেন, সেখানে ফুটবলের মান ভারতের চেয়ে ভাল হতে পারে, কিন্তু একটা ব্যাপারে যে কলকাতাই সেরা, এ কথা স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের নতুন বিদেশি তারকা জেসন কামিংস । তিনি একবাক্যে স্বীকার করেন কলকাতার সমর্থকদের মতো এমন আবেগপ্রবণ, প্রাণোচ্ছ্বল ও স্বতস্ফূর্ত সমর্থক তিনি আর কোনও দেশে দেখেননি।
ইন্ডিয়ান সুপার লিগের ইউটিউব চ্যানেলে ‘ইন দ্য স্ট্যান্ডস’ অনুষ্ঠানে কামিংস সম্প্রতি যে খোলামোলা আড্ডা দেন, তাতেই তিনি মোহনবাগান সমর্থকদের ভূয়ষী প্রশংসা করে বলেন, “আমি এখানকার সমর্থকদের দেখে বেশ অবাক হয়েছি। ওদের আবেগ যেন অন্য একটা স্তরের! এর আগে অনেক বড় ক্লাবে খেলেছি, সেখানকার আবেগপ্রবণ সমর্থকদেরও দেখেছি। কিন্তু এদের মতো এত আবেগপ্রবণ সমর্থক আর কখনও দেখিনি! এরা অক্লান্ত। হোটেলে, শপিং মলে বা রাস্তায় প্রত্যেকেই। ট্যাক্সি ড্রাইভার থেকে শুরু করে সবাই সমর্থক! প্রত্যেকেই ফুটবল নিয়ে আলোচনা করছে, পরের ম্যাচ নিয়ে কথা বলছে”।
যে দিন কলকাতায় প্রথম এসে নামেন কামিংস, সে দিনই রাত তিনটে নাগাদ কয়েকশ সমর্থক তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে হাজির হয়ে যান, যা দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে যান অস্ট্রেলীয় ফরোয়ার্ড। সে দিনের সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কামিংস বলেন, “আমার তখন জেটল্যাগ ছিল! এতটা আশা করিনি। যদিও আগেই শুনেছি, এখানকার সমর্থকেরা খুব আবেগপ্রবণ! যতটুকু খোঁজখবর নিয়েছিলাম, তাতে ভেবেছিলাম দু-তিনজন আসবে হয়তো। কিন্তু ভোর তিনটে-চারটের সময় দেখি এক ঝাঁক মানুষ হাজির! সত্যিই আমি দেখে চমকে যাই, আমাকে স্বাগত জানাতে এত লোক! তখনই বুঝতে পেরেছি, এখানকার ফুটবলপ্রেমীরা কতটা আবেগপ্রবণ। সত্যি বলতে, এর আগে আমার সঙ্গে এমন কখনও হয়নি”।
এ-লিগে সেন্ট্রাল কোস্ট মেরিনার্সের হয়ে খেলে ২০২২-২৩ মরশুমে ২৯টি ম্যাচে ২১টি গোল করেন ও ছ’টি গোলে অ্যাসিস্ট করেন তিনি। লিগের চারটি ম্যাচে জোড়া গোল করেন কামিংস এবং ফাইনালে মেলবোর্ন সিটি-র বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করে দলকে ৬-১-এ জিতে চ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্যও করেন। এই ক্লাবের হয়ে মোট ৫০টি ম্যাচ খেলে ৩১টি গোল করেন তিনি। অ্যাসিস্ট করেছেন ১২টি গোলে। ক্লাব ফুটবলে এ পর্যন্ত সাড়ে তিনশোরও বেশি ম্যাচ খেলে ১৪৫টি গোল ও ৪৮টি অ্যাসিস্ট রয়েছে তাঁর। যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন, নিজের জাত চিনিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ২৭ বছর বয়সী কামিংস। কলকাতায় এসেও ইতিমধ্যেই চারটি ম্যাচে তিনটি গোল করে ফেলেছেন তিনি।
প্রথম গোলটি করেন এএফসি কাপের প্রাথমিক পর্বের প্লে অফে, নেপালের মাচিন্দ্রা এফসি-র বিরুদ্ধে। ভারতে এসে তাঁর প্রথম গোল নিয়ে কামিংসের অনুভূতি, “প্রথম গোল পাওয়ার মুহূর্তটা অবশ্যই বিশেষ। ওই যে কথায় বলে, বুকের ওপর থেকে একটা পাথর নেমে গেল যেন। প্রথম গোলটা যখন হয়েই গেল, মনে হল, এ বার আরও গোল পাব। তবে নিজের সেরাটা বার করে আনতে সময় লাগে, একটা নতুন দেশে এসে সেখানকার স্টাইলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। নতুন কোচ, নতুন সতীর্থ খেলোয়াড়, এখানকার আর্দ্রতা, মাঠের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে”।
নতুন ক্লাবের সতীর্থদের সঙ্গেও বেশ ভাল সম্পর্ক ও বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে বলে জানান অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ দলের ফুটবলার। এএফসি কাপের দ্বিতীয় প্লে-অফ ম্যাচে ঢাকা আবাহনীর বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে এই আড্ডায় সতীর্থদের নিয়ে তিনি বলেন, “একদল ভাল ছেলের মাঝে এসে পড়লে ওদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা সহজ হয়। দলে অনেক বিদেশি আছে আর দু’জন অস্ট্রেলিয়ান, দিমি আর ব্রেন্ডান, যেখানে রয়েছে, সেখানে মানিয়ে নেওয়া আরও সোজা। তাছাড়া হুগোও আছে। ও ফরাসি, আর আমিও একটু আধটু ফরাসি বলতে পারি। ওর সঙ্গে আমি অল্পস্বল্প ফরাসিতে কথা বলার চেষ্টা করি। আমরা একসঙ্গে গলফও খেলি। আর রয়েছে আমার সতীর্থ স্ট্রাইকার, আরমান্দো”।
দলের ভারতীয় সতীর্থদের সম্পর্কেও উচ্ছ্বসিত তিনি। তাঁদের ফুটবল-দক্ষতার প্রশংসা করে কামিংস বলেন, “আমি ওদের খেলায় অভিভূত। ভারতীয় খেলোয়াড়দের অনেক গুন আছে। ওরা সত্যিই খুব ফিট। ওদের দক্ষতা আছে, খেলার মানও ভাল। আমার মনে হয়, আমরা ভাগ্যবান যে, মোহনবাগানে লিগের সেরা খেলোয়াড়দের আমরা পেয়েছি। আমি ভাগ্যবান যে, ভারতের সেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলার সুযোগ পাচ্ছি। তাই এই মরশুমে আমরা অনেকটা এগিয়েই থাকব মনে হচ্ছে। প্রত্যেকদিন এদের অনুশীলনে দেখা এবং ওদের কাছ থেকে জানা, ওরা সবাই খুবই ভাল, আমি মুগ্ধ ওদের খেলার মান দেখে”।
বিশেষ করে আনোয়ার আলির কথা উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, “সে দিন (মাচিন্দ্রা এফসি-র বিরুদ্ধে) ও একাই দু-দু’টো গোল করল! আনোয়ার দারুন ছেলে, ওর খেলা দেখে আমি মুগ্ধ। ওর গুন, সব সময় বলের সঙ্গে সঙ্গে থাকা। এবং একেবারে স্ট্রাইকারের পায়ে বল তুলে দেওয়া। জানেন, ওকে দেখলে আমার সের্গিও রামোসের কথা মনে পড়ে যায়! আমি ওকে বলেওছি, ‘তুমি ভারতের সের্গিও রামোস’। লিস্টনেরও মধ্যেও অনেক গুন আছে, ওকে ট্রেনিংয়ে দেখি। ৩০-৪০ গজ দূর থেকে গোল করে! গ্ল্যান, থাপা, সহাল, শুভাশিস, এরা সবাই খুব ভাল ফুটবলার। তার চেয়েও বড় কথা ওরা মানুষ হিসেবে ভাল। মনবীর, দীপক সবাই। এদের সঙ্গে একটা ভাল মরশুম কাটাতে চলেছি আমি। এবং আমার মনে হয়, সফলও হব আমরা”।
অস্ট্রেলিয়ার ক্লাবে খেললেও তাঁর জন্ম স্কটল্যান্ডে ও পেশাদার ফুটবল জীবন শুরু করেন স্কটিশ প্রিমিয়ারশিপ ক্লাব হিবারনিয়ান এফসি-র হয়ে খেলে। ওখানেই পেশাদার জীবনের সবচেয়ে বেশি সময় কাটান তিনি। এর পরে ইংল্যান্ডের নটিংহাম ফরেস্ট, স্কটিশ ক্লাব রেঞ্জার্স, ইংল্যান্ডের পিটারবোরো ইউনাইটেড, লুটন টাউন, শ্রুসবেরি টাউন এবং স্কটল্যান্ডের ডানডি এফসি-র হয়ে খেলার পরে চলে আসেন অস্ট্রেলিয়ায় ও সেন্ট্রাল কোস্টে যোগ দেন।
হিবারনিয়ানেই কেরিয়ারের সবচেয়ে ভাল সময় কাটিয়েছেন বলে জানান কামিংস। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “হিবারনিয়ান এফসি-তে টানা তিন মরশুমে প্রতিবার কুড়ির ওপর গোল করেছি। সত্যিই খুব ভাল সময় কাটিয়েছিলাম ওখানে, খুব উপভোগ করেছিলাম, স্কটিশ কাপও জিতেছিলাম। ওই সময় ফুটবলকে খুব ভাল লেগে গিয়েছিল। ওখানে ম্যানেজার (কোচ) খুব ভরসা করতেন আমার ওপর, প্রতি ম্যাচে খেলাতেন”।
অস্ট্রেলিয়ায় খেলা নিয়ে বলেন, “সেন্ট্রাল কোস্ট মেরিনার্সের ম্যানেজারও আমার ওপর খুব ভরসা করতেন। আমি সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছি, কুড়ি গোল করে। ওই সময়ও আমি খুব উপভোগ করেছি। দারুন একটা দলের সঙ্গে গ্র্যান্ড ফাইনাল জেতা ভাল ম্যানেজার, ভাল স্টাফ, অনেকটা রূপকথার মতো। তবে হ্যাঁ, এর মধ্যেও অনেক সময় এসেছে, যেখানে ভাল, খারাপ দু’রকমই সময় এসেছে, চড়াই-উতরাইও দেখেছি অনেক। ফুটবল এ রকমই”।
আসন্ন এএফসি এশিয়ান কাপ হয়তো অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলের হয়ে ভারতের বিরুদ্ধে খেলতে দেখা যাবে তাঁকে। সে কথা মনে করিয়ে দিতে কামিংস বলেন, “আশা করি। আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে খেলব। যদি আমি ডাক পাই আর এরাও ডাক পায়, ব্যাপারটা বেশ উত্তেজনাপূর্ণ হবে। সতীর্থদের সঙ্গে এই নিয়ে কথাও হয়েছে। ওদের বিরুদ্ধে খেললে আমি কিন্তু কাউকে ছাড়ব না, ওদের দুরমুশ করব! ভারতে মাত্র তিন সপ্তাহ হল এসেছি। মনে হয় যেন বাড়িতেই আছি! মানুষ যে ভাবে স্বাগত জানাচ্ছে এখানে, ওরা খুবই বন্ধুবৎসল। এটা একটা বিশেষ ব্যাপার হবে। অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকেরা আর ভারতের সমর্থকেরা আমার খেলা দেখবে আর আমার জন্য গলা ফাটাবে। দারুন হবে কিন্তু”!
তাঁর ভারতে ফুটবল খেলতে আসার অন্যতম কারণ যে এখানকার সমর্থকেরা, তা জানিয়েই কামিংস জানান, তাঁর কাছ থেকে যেমন সমর্থকদের প্রত্যাশা অনেক, তেমনই সমর্থকদের কাছ থেকেও তাঁর প্রত্যাশা অনেক। তিনি বলেন, “ভারতে আসার প্রস্তাবটা আমার খুব রোমাঞ্চকর লেগেছিল। আর আমি নিজেকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে ভালবাসি। ভিডিওতে দেখেছিলাম, এই ক্লাবের যে ঐতিহ্য রয়েছে। এটা একটা ইতিহাস, এটা সত্যিই এক প্রতিষ্ঠিত ক্লাব। বিভিন্ন প্রজন্মের সমর্থক রয়েছে। যখন দেখলাম এখানকার সমর্থকদের আবেগ সীমাহীন। ওরাই আমার কাজটা সহজ করে দেয়, ওরা রোজ আমাকে মেসেজ করত। ওরা আমার টুইটারে, ইনস্টাগ্রামে চলে আসে এবং প্রতিদিন মেসেজ পাঠাতে শুরু করে। আমার মনে হল, এ সবের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে নেওয়া উচিত। এখানে এসে এই ক্লাবের অন্যতম কিংবদন্তি হয়ে উঠতে চাই আমি! এটাই এখানে আসার কারণ”!
সমর্থকদের উদ্দেশ্যে যে বার্তা দিয়ে শেষ করেন তিনি, তা হল, “আমরা প্রতিটা ট্রফি জিততে চাই এবং সে জন্য আমরা নিজেদের উজাড় করে দেব। আমাদের শুধু চাই তোমাদের সমর্থন, জানি তোমরা আমাদের তা দেবে। জয় মোহনবাগান!”
(লেখা আইএসএল ওয়েবসাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
