Cart Total Items (0)

Cart

All Sports India

মুনাল চট্টোপাধ্যায়:‌ ছেলেবেলায় পড়া ডেভিড আর গোলিয়াথের গল্পটা মনে পড়িয়ে দিল ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে ডুরান্ড সেমিফাইনালে ডায়মন্ড হারবারের ঐতিহাসিক জয়। মেষপালক বালক ডেভিড স্রেফ সাহস ও বুদ্ধির জোরে গুলতির পাথরের টিপে দৈত্য গোলিয়াথকে ঘায়েল করেছিল। একশবছর পেরিয়ে আসা ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের তুলনায় চারবছরের ডায়মন্ড হারবার ক্লাব তো নেহাতই শিশু। তাই ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে ডুরান্ড ফাইনালে ডায়মন্ডের ওঠা কোনওঅংশে রূপকথার কাহিনীর চেয়ে কিছু কম নয়।

রেফারির শেষ বাঁশি বাজা মাত্র যুবভারতীর লাল হলুদ গ্যালারি জুড়ে যখনই শুধু হতাশার হাহাকার, মাত্র দু’‌দিন আগে ডার্বি জেতার আনন্দের আস্ফালন উধাও, সেখানে গ্যালারির এককোনে হাতে গোনা ডায়মন্ড হারবার সমর্থকের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস নজর কাড়ল। জয় নিশ্চিত হওয়ার পরই ডায়মন্ড হারবার কোচ কিবু ভিকুনাকে নিয়ে ফুটবলাররা উল্লাসে ফেটে পড়েন। গ্যালারিতে থাকা নিজেদের সমর্থকদের দিকে ছুটে যান হাত তুলে। সাময়িক কিবুও আবেগের জোয়ারে ভেসে যান নিজের দলের ফুটবলার ও সাপোর্ট স্টাফের সঙ্গে। অবশ্য দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক আচরণে ফিরতে দেরি করেননি দলের ডায়মন্ড কোচ কিবু। তিনিই তো দলের আসল হীরে।

কিবুই তো ফুটবলারদের মধ্যে বিশ্বাসটা জাগাতে পেরেছিলেন, ‘‌নাথিং ইজ ইমপসিবল’‌ মন্ত্রে। ইস্টবেঙ্গলের মুখোমুখি হওয়ার আগের দিন সাংবাদিক সম্মেলনে কিবু বলেছিলেন, ফুটবলে নাথিং ইজ ইমপসিবল। খাতায় কলমে ইস্টবেঙ্গল যতই এগিয়ে থাক, রবিবাসরীয় ডার্বিতে মোহনবাগানকে হারাক, তাঁরা সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ দলকে এক ইঞ্চি জমিও বিনা লড়াইয়ে ছাড়বেন না। সেটাই প্রমাণ করে ছাড়লেন। যেমনটা শোনা গিয়েছিল গ্রিসের জার্মান কোচ অটো রেহগালের গলায়। ২০০৪ ইওরো কাপের ফাইনালে লুই ফিলিপ স্কোলারির প্রশিক্ষণে থাকা রোনান্ডোর পর্তুগালকে তাদেরই মাঠে হারানোর পর।

ডায়মন্ড হারবারের কোচ কিবুর কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, মোহনবাগান কোচ হিসেবে আইলিগ জিতেছিলেন। এবার ইস্টবেঙ্গলের মতো দলকে হারিয়ে ডুরান্ড ফাইনালে যাওয়াটা কি বেশি তৃপ্তি দিচ্ছে?‌ কোনওরকম রাখঢাক না করেই কিবুর প্রতিক্রিয়া,‘‌ আজ আমি খুব খুশি। একটু বেশিই। কারণ মোহনবাগান বা ইস্টবেঙ্গলের মতো দলের ঐতিহ্য, ক্ষমতা ও শক্তি অনেক বেশি। তাদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সত্যি খুব কঠিন। বিশেষ করে ডায়মন্ড হারবারের মতো ক্লাবের পক্ষে, যাদের বয়স মাত্র ৪ বছর। মোহনবাগানের বিরুদ্ধে বড় ব্যবধানে হারের পর যেভাবে অ্যাওয়ে ম্যাচে জামশেদপুরকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল দল, তাতে ভেতরে ভেতরে একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের আগে। ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে ম্যাচটা একপ্রকার ছিল আমাদের কাছে অ্যাওয়েই। কারণ যুবভারতীতে ওদের সমর্থক ছিল ভরতি। তবু খেলার আগে আমার ফুটবলারদের হীনমন্যতায় ভোগার কোনও সুযোগ দিইনি। বরং ওদের বলেছিলাম, তোমরা এখনও পর্যন্ত যা করেছ, তা অনেক। তোমাদের নতুন করে কিছু প্রমাণ করার নেই। মাঠে বাড়তি কিছু দেখাতে যেও না। নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা তুলে ধর। মোহনবাগানের বিরুদ্ধে যে ভুলগুলো হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি যেন ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে না হয়, সেটা খেয়াল রেখো। আর রেখো নিজেদের ওপর বিশ্বাস। ফুটবলে এভরিথিং ইজ পসিবল, নাথিং ইজ ইমপসিবল। মাঠে নেমে সেটা দেখিও দাও। ওরা সেটা করেছে। আমি শুধু ওদের কিছু নির্দেশ দিয়েছিলাম। কৌশলগত খেলায় বদল এনেছিলাম। কিন্তু আসল কাজটা ফুটবলাররাই করেছে।’‌

কিবু যে সত্যি কোচ হিসেবে দক্ষ তাই নন, আপাদমস্তক ভদ্রলোক সেটা এদিন আবার প্রমাণ করে দিলেন। ম্যাচ শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে ইস্টবেঙ্গল কোচ অস্কার ব্রুজোঁ হারের জন্য দায়ি করেন রেফারিকে। তাঁর মতে, ডায়মন্ডের দুটি গোলই অন্যায্য ভাবে পাওয়া। প্রথমটা ফাউল আর দ্বিতীয়টা হ্যান্ডবলের অপরাধ হলেও রেফারি তা এড়িয়ে যান। রেফারির সিদ্ধান্তের শিকার ইস্টবেঙ্গল বারবার হয়েই চলেছে। এনিয়ে কিবুকে জিজ্ঞসা করলে খুব শান্ত গলায় ডায়মন্ড হারবার কোচ বলেন, ‘‌ অস্কার আমার খুব ভাল বন্ধু। প্রচারমাধ্যমকে কী বলেছেন উনি তা নিয়ে কোনও মন্তব্য করব না। সেটা সৌজন্যের পরিপন্থী হবে। এটুকু বলতে পারি, ম্যাচ শেষে অস্কার আমাকে ম্যাচ জেতার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন আন্তরিকভাবে। করমর্দনের সময় বলেনও, আমার দল ভাল খেলে জিতেছে, যোগ্য দল হিসেবেই ফাইনালে উঠেছে।’‌

মিকেল কোরটাজার ও জবি গোলের ভূয়সী প্রশংসা কিবু ভিকুনার গলায়। বলেন,‘‌ মিকেল শুধু ডিফেন্সের দারুন খেলেছে তাই নয়, ওর করা দর্শনীয় গোলটা গোটা দলকে উজ্জীবিত করেছিল। মুহূর্তের অসতর্কতায় একমিনিটের মধ্যে ইস্টবেঙ্গল গোল শোধ করে দিলেও, লড়াই ছাড়েনি ফুটবলাররা। শেপ ও শৃঙ্খলা ঠিক রেখে দ্বিতীয় গোলের জন্য ঝাঁপায়। জবির সময়োচিত গোলটা জয় এনে দিয়েছে।’‌ কিবু এদিন জানান, জয়ের জন্য মাঝমাঠ ও ডিফেন্ডারদের ভূমিকা কিছু কম নয়। তাঁর নির্দেশ ছিল বিপিন, এডমুন্ড, দিয়ামান্তাকোস, মিগুয়েল আর মহেশকে ব্লক করার। যেন কোনসময়ই তাঁরা ফাঁকা জমি সামনে না পায় রান করার বা থ্র পাস বাড়ানোর। এটা তাঁর ফুটবলাররা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে।

এবার সামনে ফাইনালে নর্থ ইস্ট ইউনাইটেড। যাদের দলে আলাদিন আজারের মতো গোলগেটার আছে। কতটা আত্মবিশ্বাসী নর্থ ইস্টকে হারিয়ে ডুরান্ড কাপ জেতার ব্যাপারে?‌ কিবুর উত্তর, ‘‌ মোহনবাগান ম্যাচটা ছাড়া বাকি সব ম্যাচে আমরা আধিপত্য দেখিয়েই জিতেছি। এমনকি মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ১০ জন হয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সমানে সামনে লড়েছিল আমার ফুটবলাররা। আমরাই বেশি আইএসএলের দলের বিরুদ্ধে খেলে ফাইনালে পৌঁছেছি। আত্মবিশ্বাস অটুট থাকল, কিন্তু আত্মতুষ্টি নৈব নৈব চ। ফাইনালে নর্থ ইস্টের বিপক্ষেও আমার ফুটবলাররা একইরকম জোস ও মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামবে। কাপ জেতার লক্ষ্যে।’‌

দেখাই যাক না, শনিবারের ম্যাচে শেষ হাসি কারা হাসে?‌ সবচেয়ে বড় কথা, ডুরান্ড ফাইনালে বাংলার একটা দল খেলছে। দলমত নির্বিশেষে তাদের সমর্থন করতে যুবভারতীতে ভিড় জমাবেন কি কলকাতার ফুটবলপ্রেমীরা?‌

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *