মুনাল চট্টোপাধ্যায়: বদলে যাওয়া বঙ্গে, রাজনৈতিক পালা বদলের পর এমন জমজমাট ডার্বি প্রতক্ষ করল কলকাতার মানুষ অনেকদিন পর। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের ওপরের দুটো গ্যালারি ভরে যাওয়া নতুন ব্যাপার নয়। কিন্তু লোয়ার টায়ারেও ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই ভিড়, এমন অবস্থা শেষ কবে দেখা গেছে মনে পড়েনি। আসলে এবারের ডার্বির গুরুত্বই ছিল আলাদা। এর আগে কোনওদিন আইএসএল ডার্বি চ্যাম্পিয়নশিপ নির্ণায়ক ম্যাচ হয়নি। মোহনবাগান আইএসএলে সবসময় টেবিলের ওপরের দিকে থেকেছে, ইস্টবেঙ্গল সেখানে লড়াই চালিয়ে গেছে নীচের দিকে ভাল জায়গায় থাকতে। চলতি আইএসএলের ছবিটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। ডার্বি খেলতে নেমেছিল ইস্টবেঙ্গল, লিগ টেবিলের এক নম্বরে থেকে। মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট দু’নম্বরে। স্বাভাবিকভাবে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই দেখতে যুবভারতী যে ভরে উঠবে, সেটা জানাই ছিল।
দু’দলের সবুজ মেরুন ও লাল হলুদ সমর্থকদের সব পথ গিয়ে মিশেছিল যুবভারতীতে। কলকাতার রাস্তায় ফিরেছিল চেনা চেহারা ও মেজাজটা। দক্ষিণ থেকে উত্তর থেকে দলে দলে দু’দল সমর্থকরা প্রিয় দলের জার্সি গায়ে, পতাকা হাতে, মাথায় সবুজ মেরুন, লাল হলুদ ফেট্টি বেঁধে ম্যাটাডোর, বাইক, ট্রেণে, বাসে চেপে যুবভারতীতে ভিড় জমাতে শুরু করেন ম্যাচের দু’ঘন্টা আগে থেকে। পথের মাঝে দু’দলের সমর্থকরা মুখোমুখি হলে উঠেছে ‘ জয় মোহনবাগান’, ‘ জয় ইস্টবেঙ্গল’ ধ্বনি। একদল যখন চিৎকার করেছে , ‘ ডার্বি জিতবে কে, ইস্টবেঙ্গল আবার কে?’, তখন অন্যদল পাল্টা জবাব দিয়েছে, ‘ মোহনবাগান আবার কে?’
ডার্বির সকাল থেকেই একটা পোস্ট সোসাল মিডিয়ায় ঘুরপাক খেয়েছে। মোহনবাগানের প্রয়াত সমর্থক রাজুলের বাবা-মার দেওয়া বেদনাভরা আবেদন। রাজুলের বাবা সবুজ মেরুন ও মা লাল হলুদ জার্সি গায়ে পোস্ট করেছেন,‘ রাজুল মোহনবাগান ম্যাচ দেখতে মাঠে গিয়েছিল। ওর ইচ্ছে ছিল যুবভারতীতে ডার্বি ম্যাচ দেখার। র্যাগিংয়ের শিকার হয়ে রাজুলের প্রাণ গেছে। রাজুল আজ পৃথিবীতে নেই। কিন্তু ছেলের ছবি নিয়ে আমরা মাঠে যাব ডার্বি দেখতে। সেসুযোগটা ক্লাব কর্তারা করে দিয়েছেন। সকলের কাছে আবেদন রাখব, ম্যাচ উপভোগ্য হোক, যে দলই জিতুক, মাঠে যেন শান্তি বজায় থাকে, জেতে যেন ফুটবল।’ এটাই তো ডার্বির আসল মাহাত্ম।
ডার্বি শুরুর আগে মাঠের পরিবেশটাও মন কেড়েছে। সৌজন্যের টিফো নেমেছিল যুবভারতীতে মোহনবাগান গ্যালারিতে। টিফোতে মোহনবাগানের সদ্য প্রয়াত প্রাক্তন সভাপতি টুটু বসুর সঙ্গে ইস্টবেঙ্গলের প্রয়াত প্রাক্তন সচিব পল্টু দাসের একসাথে আড্ডা দেওয়ার ছবি। ছবির তলায় লেখা, ‘সেঞ্চুরি অফ রাইভালরি বাউন্ড বাই রেস্পেক্ট।’ ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতেও নামেও অর্থবহ টিফো। তাতে লেখা,দ্য ফ্লেমস বার্নস দ্য ব্রাইট কিং অফ গুড টাইমস। ম্যাচ শুরুর আগে মোহনবাগানের প্রয়াত প্রাক্তন সভাপতি টুটু বসুর প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন যুবভারতীতে উপস্থিত দু’দলের ফুটবলার, কোচ, কোচিং স্টাফ ও সদস্য-সমর্থকরা। ফুটবল মাঠের মেজাজটা তো এমনই হওয়া উচিত। লড়াইটা হোক মাঠের মাঝে দু’দল ফুটবলারদের মাঝে, দক্ষতা তুলে ধরার, মাঠের বাইরে গ্যালারি বা পথে ঘাটে যেন তার কোনও প্রভাব না পড়ে।
রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলায় এটাই ছিল প্রথম ডার্বি। নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামানিক এর উত্তেজনা আর উত্তাপ থেকে দূরে থাকেন কীভাবে? তাই তিনিও ম্যাচ দেখতে হাজির যুবভারতীতে। যতই ক্রিকেট নিয়ে উন্মাদনা থাক, সব খেলার সেরা বাঙালির প্রাণের ফুটবল।
