সুচরিতা সেন চৌধুরী: অনেকদিন পর এমন একটা ডার্বি, যা ঘিরে গত কয়েকদিন ধরেই উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। আর সেই উত্তেজনাকে সঙ্গে নিয়েই ডার্বির রবিবার যুবভারতী ভরিয়েছিলেন সমর্থকরা। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী একদিন আগেই ৬২,২০০ টিকিট পুরো শেষ হয়ে গিয়েছিল। হাজির ছিলেন স্বয়ং ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ অধিকারী ও এআইএফএফ সভাপতি কল্যাণ চৌবে। এদিন যুবভারতীর গ্যালারি দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। তিনটি টিফো নামালেন সমর্থকরা। আয়োজন ছিল পুরো দস্তুর কিন্তু খেলায় যেন উধাও সেই প্রাণ। যে ম্যাচ জিতলেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে ইস্টবেঙ্গল, সেই ম্যাচে অস্কারের ছেলেদের সেই খেলা দেখা গেল না। মোহনবাগানের জন্য যখন মাস্ট উইন ম্যাচ তখনও সেই লড়াই দেখা গেল না সবুজ-মেরুন ব্রিগেডের। দুই কোচই যখন ম্যাচের আগের দিন এই ম্যাচকে ফাইনাল বলে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, তার পরও তাঁদের দলের খেলায় জয়ের লড়াই খুঁজেই পাওয়া গেল না। প্রথমার্ধে দুই দলই গোলের কাছে পৌঁছেও বার বার খেই হারাল। দ্বিতীয়ার্ধে দুই পক্ষের তরফেই এল একটি করে গোল। তবে জঘন্য ফুটবলের মধ্যে দুটো গোলই ছিল দৃষ্টিনন্দন। সঙ্গে গোলকিপারদের অবদানও অনস্বীকার্য। ১-১ গোলে শেষ হল ডার্বি। এই ফলের সঙ্গেই চ্যাম্পিয়নশিপের আশা বেঁচে থাকল ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের।
প্রথমার্ধের শুরুর দিকে আক্রমণে এগিয়ে ছিল মোহনবাগানই। প্রথম থেকেই এই ম্যাচে আন্ডারডগ হিসেবেই দেখা হচ্ছিল মোহনবাগানকে। খেলা যত এগিয়েছে ততই দুই দলের কে আন্ডারডগ তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ এদিন সমানে সমানে গোল মিস থেকে পরিকল্পনাহীন ফুটবলের নজির রাখলেন দুই দলের ফুটবলাররা। ব্লু জিন্স আর ব্ল্যাক শার্ট, টিশার্টে দুই স্প্যানিশ কোচের টেনশনের বহিঃপ্রকাশ মাঝে মাঝেই দেখা যাচ্ছিল ডাগআউটে। ঠিক যেমন চার মিনিটের মাথায় সাহালের গোলমুখি শট ক্লিয়ার করেন আনোয়ার তেমনই আট মিনিটে আনোয়ারের ভুল ব্যাকহিল ধরে মনবীর প্রায় গোলের বল সাজিয়ে দিয়েছিলেন সাহালের জন্য কিন্তু সাহাল তার নাগাল পাওয়ার আগেই ক্লিয়ার করেন রাকিপ। কিন্তু ১৩ মিনিটে যেভাবে অ্যান্টনের শট পোস্টে লেগে ফিরল তাতে ইস্টবেঙ্গল শিবিরে হতাশা আসাটাই স্বাভাবিক।
শুধু তাই নয় যেভাবে গোলের সামনে গিয়ে দুই দলের ফুটবলাররা খেই হারালেন বার বার তাতে এদিন খেলা হল সমানে সমানে। ২২ মিনিটে জিকসনের থেকে বল পেয়ে যেভাবে হোল্ড করতে গিয়ে সময় নষ্ট করে অ্যালবার্তোর গায়ে মেরে সহজ সুযোগ নষ্ট করলেন বিপিন, তাতে নিজেই নিজের উপর রেগে যাওয়ার কথা। এর পর কখনও মোহনবাগানের থাপা, লিস্টন মনবীর, আবার কখনও ইস্টবেঙ্গলের মিগুয়েল, অ্যান্টনরা গোলের কাছে গিয়ে খেই হারালেন। এই ম্যাচে লেখা থাকবে মিসের বহর আর গোলকিপারদের সেভ। তবে শেষবেলায় দুটো গোল ৬২ হাজার সমর্থককে কিছুটা হলেও আনন্দ দিল।
৬২ মিনিটে জোড়া পরিবর্তন করলেন অস্কার ব্রুজোঁ। বিষ্ণু, অ্যান্টনকে তুলে এডমুন্ড, এজেজ্জারিকে নামিয়ে খেলায় গতি আনার চেষ্টা করলেন কোচ। আর তাতেই বাজিমাত। ৮৫ মিনিটে মিগুয়েলের পাস থেকে এডমুন্ডের অনবদ্য ফিনিশ, যা আটকানোর সুযোগ ছিল না বিশাল কাইথের কাছে। এডমুন্ডের গোল হতেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে পুরো রিজার্ভ বেঞ্চ। সঙ্গে অস্কারের প্রতিক্রিয়াও ছিল ছিল দেখার মতো। একদম ছুটে যান গোলের দিকে। জার্সি খুলে হলুদ কার্ডও দেখেন এডমুন্ড। তবে ইস্টবেঙ্গলের এই উচ্ছ্বাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কারণ পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সমতায় ফেরে মোহনবাগান কামিন্সের অসাধারণ গোলে। দিমিত্রির কর্নার থেকে কামিন্সের হেড গোলে যেতেই ম্যাচের ফল প্রায় নিশ্চিত হয়েই গিয়েছিল। শেষ বেলায় এডমুন্ডের লাল কার্ডটা ইস্টবেঙ্গলের জন্য বড় ধাক্কা। কারণ এখনও একটা ম্যাচ বাকি ইন্টার কাশীর বিরুদ্ধে। যে ইন্টার কাশী কয়েকদিন আগেই আটকে দিয়েছিল মোহনবাগানকে। তবে এদিন ম্যাচের সেরা দুই দলের দুই গোলকিপার বিশাল কাইথ ও প্রভসুখন সিং গিল।
মোহনবাগান: বিশাল কেইথ, অভিষেক সিং, টম আলড্রেড (রবসন), আলবার্তো রদ্রিগেস (জেসন কামিন্স), শুভাশিস বসু, লিস্টন কোলাসো, আপুইয়া (দীপক টাংরি), অনিরুদ্ধ থাপা, সাহাল আব্দুল সামাদ (দিমিত্রি পেত্রাতোস), মনবীর সিং (মেহতাব সিং) ও জেমি ম্যাকলারেন।
ইস্টবেঙ্গল: প্রভসুখন সিং গিল, মহম্মদ রাকিপ, আনোয়ার আলি, কেভিন সিবলে, জয় গুপ্ত, বিপিন সিং, জিকসন সিং, মহম্মদ রশিদ, পি ভি বিষ্ণু (এডমুন্ড লালরিনডিকা), মিগুয়েল ফিগুয়েরা ও অ্যান্টন সোজবার্গ (ইউসুফ এজেজ্জারি)।
