Cart Total Items (0)

Cart

All Sports India

নরওয়ে ২(‌ হালান্ড-‌২)‌                                        ব্রাজিল ১(‌ নেইমার-‌পেনাল্টি)‌

মুনাল চট্টোপাধ্যায়:‌ বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চটা এমনই নিষ্ঠুর। সেখানে ভুলের কোনও ক্ষমা নেই। খেলার শুরুতে পেনাল্টি থেকে গোল করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েও, তা নষ্ট করে নিজেদের পায়ে কুড়ুল মেরেছিল ব্রাজিল। তারই খেসারত দিয়ে নিউজার্সি স্টেডিয়ামে নরওয়ের কাছে ১-‌২ গোলে প্রিকোয়ার্টারফাইনালেই ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। তারকা উজ্জ্বল হালান্ডের জোড়া গোলে ম্যাচ জিতে কোয়ার্টারফাইনালে মিয়ামিতে ১১ জুলাই ইংল্যান্ডের মুখোমুখি নরওয়ে, তখন শেষমুহূর্তে পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্যবধান কমিয়েও ব্রাজিলের বিষন্ন বিদায় ঠেকাতে পারেননি নেইমার। ১৯৯০ বিশ্বকাপে শেষবার এই পর্যায়ে আর্জেন্টিনার কাছে ০-‌১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। তারপর এত তাড়াতাড়ি আর ছিটকে যায়নি।

পর্তুগালের বিরুদ্ধে ক্রোয়েশিয়া হারের পর ফুটবলের এক কিংবদন্তী লুকা মদ্রিচের বিশ্বকাপের আসর থেকে শেষবারের মতো বিদায় ঘটে গিয়েছিল। আর নরওয়ের কাছে হারের পর বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চ থেকে আর এক তারকা ফুটবলার নেইমারের যাওয়া নিশ্চিত হয়ে গেল। নেইমারের ফিটনেস নিয়ে নানা সমস্যা আছে জেনেও তাঁকে বিশ্বকাপের দলে রেখেছিলেন ব্রাজিলের কোচ কার্লেস আনসেলোত্তি। চেয়েছিলেন নেইমারের বিদায় যেন মধুর হয়। না, সেটা হল না। পরিবর্ত হিসেবে নেমে নেইমার নরওয়ে ম্যাচে ব্রাজিলের হার ঠেকাতে পারেননি। দ্বিতীয়ার্ধে সংযুক্তি সময়ের ১০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে সান্ত্বনা গোল করে হারের ব্যবধান কমানো ছাড়া আর কোনও প্রাপ্তি তাঁর ঘটল না। মেসির বিশ্বকাপ জেতা হয়ে গেছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর সে আশা এখনও জিইয়ে আছে। কিন্তু নেইমারের বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন এজীবনে অধরাই থেকে গেল। আর সেকারণে ম্যাচ শেষে তাঁর চোখ ছিল জলে ভরা। এমন বিদায় তো তিনিও চাননি। শুধু এটুকুই প্রাপ্তি থেকে গেল, ব্রাজিলের জার্সিতে তাঁর সর্বাধিক গোল করার সংখ্যায় আরও একটা সংযোজন ঘটল। এতে কী আর মনের বেদনা কমে। ব্রাজিল বধের মূল নায়ক হালান্ডও সেটা বুঝেছিলেন বলেই, ম্যাচ শেষে নেইমারের হাত ধরে সান্ত্বনার পরশ দিয়ে গেলেন।

জোড়া গোল করে যেমন নায়ক হালান্ড, তেমন নরওয়ের এই জয়ের জন্য একজনের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি নরওয়ে গোলকিপার ওরিয়ান নিল্যান্ড। পেনাল্টি রোখা থেকে অসংখ্যবার নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে নরওয়েকে লড়াইয়ে রেখে জয়ের রাস্তা প্রশস্ত করেন তিনি। নইলে ম্যাচের ফল অন্যরকম হতে পারত। ১২ মিনিটে নরওয়ের ক্রিস্টোফার আয়ার বক্সের মাঝে ম্যাথিয়াস কুনহাকে ফাউল করলে প্রথমে রেফারি ইমসাইল এলফাত পেনাল্টি দেননি। ব্রাজিলের ফুটবলাররা জোরালো আবেদন করলে ভার প্রয়োগ করে পেনাল্টি দিতে বাধ্য হন রেফারি। কিন্তু গুইমারেসের নেওয়া পেনাল্টি সঠিকভাবে অনুমান করে ঝাঁপিয়ে তা রুখে দেন নরওয়ের সাহসী গোলকিপার নিল্যান্ড। এরপর মার্টিনেলির ক্রশে গুইমারেসের শট তৎপরতার সঙ্গে রোখেন তিনি। ভিনিসিয়াস জুনিয়ারের গোলের প্রচেষ্টা। গোটা ম্যাচে তিনি গোলের নীচে ছিলেন ভরসার প্রতিমূর্তি। নরওয়ে যদি বিশ্বকাপে আরও এগোয়, তাহলে শেষপর্যন্ত নিল্যান্ড গোল্ডেন গ্লাভসের দাবিদার হতে পারেন।

প্রথমার্ধে নরওয়ে গোলমেশিন হালান্ড বিশেষ দাগ কাটতে পারেননি। তার মূল কারণ, তিনি আক্রমণে অংশ নেওয়ার থেকে ব্রাজিলের আক্রমণের ঝাঁজ ঠেকাতে রক্ষণভাগকে সাহায্য করতে বেশি ব্যস্ত ছিলেন। নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের কাছে বিশেষভাবে শিক্ষণীয়।
বিরতির পর নরওয়ে কোচ স্টেল সোলবাক্কেন দু’‌টি বদলের পথে হাঁটেন। অন্যদিকে, ব্রাজিলের কোচ আনসেলোত্তি কুনহাকে তুলে নিয়ে নামান নবীন এন্ডরিককে। প্রথম টাচেই গোল করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। ভিনিসিয়াসের বাড়ানো থ্রু ধরে সামনে শুধু গোলকিপার নিল্যান্ডকে পেয়েও বল গোলে রাখতে পারেননি এন্ডরিক।

৬৭ মিনিটে শেষ অস্ত্র হিসেবে নেইমারকে নামান আনসেলোত্তি। কিন্তু তিনি কিছু করার আগে মোক্ষম আঘাত হানেন হালান্ড। ৭৯ মিনিটে শলড্রপের মাপা ক্রশ বক্সে পড়ার মুখে ব্রাজিলের গ্যাব্রিয়েলের মাথার ওপর লাফিয়ে উঠে হেডে গোল করে নরওয়েকে এগিয়ে দেন হালান্ড। পেশাদারিত্ব কাকে বলে দেখালেন হালান্ড। গোল করার পর এতটুকু বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখাননি। বরং সতীর্থরা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যখন গোল সেলিব্রেশনে ব্যস্ত, তখনও হালান্ডের মুখে একটা স্মিত তৃপ্তির হাসি। যেন বোঝাতে চাইলেন, কেন তাঁকে বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকার বলা হয়, সেটা সকলে দেখুন। একইসঙ্গে আপাদমস্তক পেশাদার বলেই সম্ভবত হালান্ড নিজেকে সংযত রেখেছিলেন, এটা বুঝে ম্যাচ তখনও শেষ হয়নি। এতটুক আত্মতুষ্টি আসা মানে ব্রাজিলকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ করে দেওয়া। সেটা প্রায় হয়ে যাচ্ছিল অন্তত দু’‌বার গোলকিপার নিল্যান্ড ব্রাজিলের গোল শোধের প্রচেষ্টায় জল ঢেলে না দিলে।

নরওয়ের পক্ষে শেষ হাসিটা হাসার সুযোগ করে দিলেন হালান্ডই। ৯০ মিনিটে বক্সের মাথায় বল পেয়ে মাটি ঘেঁষা শটে ব্রাজিল গোলকিপার অ্যালিসনের বাড়ানো হাতের নাগাল এড়িয়ে জালে জড়িয়ে দেন হালান্ড। বিশ্বকাপে তাঁর ঝুলিতে ৭ গোল। মেসি ও এমবাপের সঙ্গে গোল্ডন বুট জেতার দৌড়ে এখন তিনিও। ওই গোলের পর হালান্ডের অতি নির্লিপ্ত আচরণ দেখে বোঝার উপায় ছিল না, তিনি নিজের দেশের সমর্থকদের জন্য কী কান্ডটাই না করে ফেলেছেন। গ্রেট একেই বলে। আসলে গোল করাই যার অভ্যাস, তার কাছে এটা যেন অতি সাধারন একটা একটা ব্যাপার।

দ্বিতীয় গোল হজমে পর ব্রাজিলের কাছে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য অল্পই সময় ছিল। নরওয়েকে চেপেও ধরেছিল আনসেলোত্তির দল। সংযুক্তি সময়ের ৮ মিনিটের মাথায় বক্সের মাঝে নরওয়ের ফুটবলারের কনুইয়ের গুঁতোয় ক্যাশেমিরো পড়ে গেলে, রেফারির ব্রাজিলের অনুকূলে পেনাল্টি দেন। পেনাল্টি নেওয়ার আগে নরওয়ে গোলকিপার নিল্যান্ড ও নেইমারের মধ্যে একটা ট্রোলের মেজাজ নজরে এসেছি। তবে নেইমারের মনঃসংযোগ তাতে নষ্ট হয়নি। সংযুক্তি সময়ের শেষ মিনিটে নেইমার গোল করে ব্যবধান ঘটালেও নিজের ও দলের বিদায় ঠেকাতে পারেননি। আর তাতেই বেশি করে ভেঙে পড়েন নেইমার। সতীর্থদের সান্ত্বনাতেও সে বেদনা কমেনি।

আর ম্যাচ শেষে হালান্ড বলেন, ‘‌ চলতি বিশ্বকাপে আমি নিজের খেলা বেশ কয়েকবার তুলে ধরেছি। কিন্তু এটা একবারে অন্যপর্যায়ের চুড়ান্ত ফর্মে ওঠা ছিল। আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না ব্রাজিলকে হারিয়ে শেষ আটে পৌঁছেছি। আমি স্বপ্নেও এটা ভাবিনি। আমি নরওয়ের জার্সিতে বিশ্বকাপ খেলার কথা ভাবতাম। কিন্তু তাই বলে ব্রাজিলকে হারিয়ে দেব, এমন প্রত্যাসা কখনও মনেও আনিনি। আমি ভাবতাম এই ধরনের ভাবাটা অবাস্তব, এখন দেখছি, আমি ভুল ছিলাম। এটা সত্যি খুব স্পেশাল। অবাস্তব মনে হচ্ছে এখনও। তাই বলে বোঝাতে পারব না আমার অনুভূতিটা। হাতে জোরে জোরে মেরে দেখছি, এটা কি সত্যি, না এখনও স্বপ্নের মাঝেই আছি।’‌

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *